ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

রাজপথের শিক্ষক : নীরব অশ্রু আর প্রতিবাদের ভাষা

ওসমান গনি
রাজপথের শিক্ষক : নীরব অশ্রু আর প্রতিবাদের ভাষা

শিক্ষক। এই শব্দটির সঙ্গে মিশে আছে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সম্মান আর ভবিষ্যতের ভিত্তি গড়ার এক মহৎ অঙ্গীকার। সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারিগর হিসেবে তারা একটি জাতিকে মনন ও মেধা দিয়ে গড়ে তোলেন। তাদের হাতেই নির্মিত হয় আগামীর নাগরিক সমাজ, যারা একদিন রাষ্ট্র ও সমাজের নেতৃত্ব দেবে। প্লেটোর সেই অমর উক্তি, ‘যেখানে শিক্ষকদের সম্মান নেই, সেখানে ভালো শিক্ষা নেই,’ বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে শিক্ষকের মর্যাদা একটি জাতির প্রগতির মাপকাঠি। অথচ, এই সম্মানিত শিক্ষক সমাজকে প্রায়শই দেখা যায় রাজপথে, নিজেদের শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে দিনের পর দিন আন্দোলন করতে। জাতির মেরুদণ্ড সোজা রাখার কারিগরদের এমন করুণ পরিণতি আমাদের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের দিকে আঙুল তোলে। কেন শিক্ষকরা বারবার এমন কঠিন পথ বেছে নিতে বাধ্য হন, এই প্রশ্নটির উত্তর অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং বহুমাত্রিক।

শিক্ষকদের রাজপথে নামার প্রধান কারণগুলো নিছক ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া নয়, বরং এটি শিক্ষাব্যবস্থার গভীরে জমে থাকা কাঠামোগত সমস্যা ও বৈষম্যের এক তিক্ত ফল। এর মূলে রয়েছে নিম্ন বেতন ও সামাজিক মর্যাদার সংকট। একটি পরিবার পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম বেতনটুকুও অনেক শিক্ষক পান না। বিশেষ করে বেসরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা বছরের পর বছর ধরে বেতন বৈষম্যের শিকার। একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক যখন দেখেন একই শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পরিশ্রমের তুলনায় অন্যান্য সরকারি দপ্তরের কর্মচারীরা অধিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন, তখন হতাশা জন্ম নেয়। দেশের সর্বোচ্চ মেধা যাদের শিক্ষকতা পেশায় আসার কথা, তারা যখন দেখেন অন্যান্য পেশার তুলনায় তাদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা একেবারেই নগণ্য, তখন স্বাভাবিকভাবেই এই পেশা মেধাবীদের জন্য আকর্ষণ হারাতে থাকে।

একজন শিক্ষককে যখন পরিবারের মৌলিক চাহিদা যেমন, সন্তানের ভালো শিক্ষা বা চিকিৎসার খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার পক্ষে শ্রেণিকক্ষে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এটি শুধু শিক্ষকের ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং এটি পুরো শিক্ষার মানের উপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শিক্ষকের মন যদি অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তায় ভারাক্রান্ত থাকে, তবে তিনি কখনোই শতভাগ মনোযোগ দিয়ে পাঠদান করতে পারেন না।

বেতন বৈষম্যের পাশাপাশি শিক্ষকদের জীবনে আর একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো চাকরিবিধির জটিলতা ও পদোন্নতির অভাব। বিশেষ করে সরকারি ও জাতীয়করণকৃত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের জন্য পদোন্নতির সুযোগ সীমিত এবং জটিল। পুরো চাকরি জীবনে একটি মাত্র পদোন্নতির সুযোগ অথবা বছরের পর বছর একই পদে থাকাটা তাদের পেশাগত জীবনে স্থবিরতা ও হতাশা নিয়ে আসে। যোগ্যতা, দক্ষতা এবং উচ্চতর শিক্ষার যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়াটা তাদের কর্মস্পৃহা কমিয়ে দেয়। শিক্ষকদের জন্য উচ্চতর গ্রেডপ্রাপ্তির জটিলতা নিরসন এবং প্রধান শিক্ষক পদে শতভাগ পদোন্নতিসহ দ্রুত পদোন্নতির দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এই বিষয়টিকে বারবার বিলম্বিত করেছে। যখন আলোচনা বা আবেদন-নিবেদনে কাজ হয় না, তখন নিজেদের অধিকার আদায়ের শেষ আশ্রয় হিসেবে তারা রাজপথকেই বেছে নিতে বাধ্য হন। বেসরকারি শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও প্রকট। তাদের চাকরি বদলি বা জাতীয়করণের নিশ্চয়তা না থাকা এক অনিশ্চয়তার জন্ম দেয়।

শিক্ষা ক্ষেত্রে বহুমুখী বৈষম্য ও সমন্বয়হীনতা শিক্ষকদের আন্দোলনের আরেকটি মূল কারণ। দেশে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত নানা ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে, সরকারি, বেসরকারি, এমপিওভুক্ত, নন-এমপিও, কারিগরি, মাদরাসা। এই বহুমুখী ধারার ফলে শিক্ষকদের মধ্যেও সৃষ্টি হয়েছে বিভক্তি ও বৈষম্য। উদাহরণস্বরূপ, স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষকদের জাতীয়করণের দাবি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে, যেখানে একই পরিপত্রের অধীনে রেজিস্টার্ড প্রাথমিক স্কুল জাতীয়করণ করা হয়েছে। একই দেশে, একই পেশায় থাকা সত্ত্বেও সুযোগ-সুবিধার এই আকাশ-পাতাল পার্থক্য শিক্ষকদের মনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করে। তাদের মনে প্রশ্ন জাগে, কেন একটি পেশার মানুষ হিসেবে তাদের প্রতি দুই ধরনের নীতি গ্রহণ করা হচ্ছে? এই বৈষম্যের বেড়াজাল ভাঙার জন্য একটি সুসংগঠিত, সমন্বিত ও জাতীয় শিক্ষানীতির বাস্তবায়নের দাবি নিয়ে তারা রাজপথে নামতে বাধ্য হন। তারা চান, ‘শিক্ষা’ নামক একক পেশাটির সকল কারিগররা একই বেতন স্কেল ও মর্যাদার অধিকারী হোক।

তাছাড়া, শিক্ষকদের কাজের পরিবেশেও রয়েছে নানা অসঙ্গতি। শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের বাইরেও তাদের অতিরিক্ত প্রশাসনিক ও অ-শিক্ষা সংক্রান্ত কাজ করতে হয়। ভোটার তালিকা তৈরি থেকে শুরু করে আদমশুমারি, বিভিন্ন সরকারি জরিপ, টিকা কর্মসূচিতে তথ্য সংগ্রহ, এমন বহু অশিক্ষা সংক্রান্ত কাজে তাদের যুক্ত করা হয়, যার ফলে তারা মূল দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হন। এর উপর রয়েছে শিক্ষা বিভাগীয় অফিসগুলোতে শিক্ষকদের যথাযোগ্য সম্মানের অভাব। জাতির পথপ্রদর্শক হিসেবে যাদের সম্মান পাওয়ার কথা, তারা যখন আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর নিচে গিয়ে অবহেলিত হন, তখন তারা মানসিক ও সামাজিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বা দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ ও বদলির মতো ঘটনা ঘটে, যা শিক্ষাব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। এসব অনিয়ম ও অব্যবস্থার প্রতিবাদেও তারা রাজপথে দাঁড়ান।

শিক্ষকদের রাজপথে নামাটা আসলে জাতির নীরব ব্যর্থতারই প্রতিচ্ছবি। এটি কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকারের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত।

ওসমান গনি

সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত