প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৯ নভেম্বর, ২০২৫
বাংলাদেশের ভোরের আলো যেন কৃষকের কাঁধে জমে থাকা একটি দীর্ঘশ্বাস। বহু প্রজন্ম ধরে এ দেশের মাটি, নদী, ঋতু সবকিছুই ধানকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। ধানের গন্ধ মানেই বাঙালির ঘরে স্বস্তি, উৎসব, জীবনযাপন। কিন্তু এই ঐতিহ্যের আড়ালেই এখন লুকিয়ে আছে এক কঠিন বাস্তবতা ধান আজ আর কৃষকের জন্য ততটা নিরাপদ বা লাভজনক ফসল নয়। জলবায়ুর অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি এবং জমি-মানুষের চাহিদার পরিবর্তনে ধান যেন আর আগের মতো কৃষকের স্থিতিশীল ভরসা হয়ে উঠতে পারছে না। বন্যা আসে আগেভাগে, খরা আসে অচিরেই, কখনও অস্বাভাবিক বৃষ্টি ধানের স্বপ্ন ভাসিয়ে নিয়ে যায়, কখনও আবার অতিরিক্ত সেচ আর রাসায়নিকের বোঝা কৃষকের কাঁধে চাপিয়ে দেয় অতিরিক্ত ঋণ। ফলে ধান-নির্ভর জীবনধারা আজ বাংলাদেশের কৃষকের জন্য উদ্বেগের আরেক নাম।
এমন পরিস্থিতিতে গ্রামীণ বাংলায় এখন নিরবে বদলে যাচ্ছে কৃষির চিত্র। কৃষক নিজেই বুঝতে শুরু করেছেন প্রকৃতি যেভাবে বদলাচ্ছে, ধানও তেমনি অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। তাই নতুন একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে : কৃষকেরা ঝুঁকছে বিকল্প ফসল, নতুন কৃষি-পদ্ধতি এবং বাজারমুখী উৎপাদনের দিকে। আগে যে কৃষক ধান ছাড়া অন্য ফসল চিন্তাই করতেন না, এখন তিনি একই জমিতে সবজি চাষ করছেন, শীত ও গ্রীষ্ম মৌসুমে ভিন্ন ভিন্ন ফসল নিচ্ছেন, কম পানিতে হয় এমন ফসলকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। সবজি চাষে প্রয়োজন কম সেচ, শ্রম ও রাসায়নিক, অথচ আয়ের পরিমাণ অনেক বেশি। আগাম শসা, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন এগুলো গ্রাম থেকে শহরে দ্রুত পৌঁছায়, আর কৃষক হাতে পায় নগদ অর্থ।
ফলের বাগানও এ সময়ে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। মাল্টা, কমলা, ড্রাগনফল, পেয়ারার উন্নত জাত, এমনকি অ্যাভোকাডোর মতো উচ্চমূল্যের ফসল দেশের নানা অঞ্চলে সফলভাবে জন্মাচ্ছে। এসব বাগান একদিকে কৃষকের নিয়মিত আয় নিশ্চিত করছে, অন্যদিকে কার্যত তার জমিকে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা দিচ্ছে। বিশেষ করে যেসব জমিতে বারবার ধান করা কঠিন সেসব জায়গায় বাগান এখন নতুন যুগের কৃষি-সম্ভাবনা।
এদিকে দেশের মসলা উৎপাদনেও চলছে বিপ্লব। আদা, রসুন, হলুদ, মরিচ, সরিষা এসব ফসল বাংলাদেশ এখনও বিদেশ থেকে আমদানি করে। অথচ দেশের মাটি অত্যন্ত উপযোগী হওয়া সত্ত্বেও কৃষক ধানের কারণে মসলা চাষে মন দিতে পারেননি দীর্ঘদিন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে। মসলার দাম সারা বছরই তুলনামূলক ভালো থাকে, বাজার নিশ্চিত থাকে, আর খরচও কম। ফলে কৃষকরা ধানের পাশাপাশি মসলা তুলে বার্ষিক আয় বাড়াতে শুরু করেছেন।
ধানখেতে মাছ চাষ দেশের কৃষিতে এক বিপ্লব এনেছে। একই জমিতে একই মৌসুমে ধান ও মাছ এ যেন কৃষকের জন্য দ্বিগুণ আয়ের দ্বার খুলে দিয়েছে। মাছের জন্য বাঁধ দেওয়া, পাশেই ধান রোপণ, মাঝে মধ্যে খাবার দেওয়া এই পুরো ব্যবস্থাটিই কৃষকের কাছে এখন খুব লাভজনক। দেশের অনেক জায়গায় এই ধান-ফিশ ইন্টিগ্রেশন পদ্ধতি কৃষকের আয়ের নতুন মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। জলবায়ুর চাপ মোকাবিলা করার পাশাপাশি জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোরও এটি কার্যকর উপায়।
এখন কৃষি শুধু ফসল চাষেই সীমাবদ্ধ নেই। প্রযুক্তির সাহায্যে কৃষি হয়ে উঠেছে বহুমাত্রিক। সৌরচালিত সেচপাম্প পানির ব্যয় কমাচ্ছে, ড্রিপ সেচ পানি অপচয় কমিয়ে উৎপাদন বাড়াচ্ছে, উচ্চফলনশীল সবজি ও ফলের জাত কৃষিকে আরও শক্তিশালী করছে।
তহমিনা ইয়াসমিন
শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ