প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২০ নভেম্বর, ২০২৫
‘শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড’ কিন্তু দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভগ্নদশা, নড়বড়ে, লক্ষ্যহীন, দিকভ্রান্ত ও দিশাহারা অবস্থা গভীর উদ্বেগ ও হতাশার। এই সিস্টেমের আমূল পরিবর্তনে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর প্রয়াস চোখে পড়ে না কস্মিনকালেও! একসময় পাড়াগাঁয়ে কারও এসএসএসি পরীক্ষা দেওয়ার খবরে ধুম পড়ে যেত, পাস করলে তাকে এক নজর দেখার জন্য উৎসুক মানুষ ভিড় করত, খুশির বন্যা বয়ে যেত পাড়া-মহল্লায়, মানুষের মুখে মুখে ধ্বনি হতো সেই পরীক্ষার্থীর নাম! সেসব এখন অতীত। সময়ের চোরাস্রোত এ গৌরবপ্রথা গিলে খেয়েছে। জিপিএ-৫ ও পাস করা হয়ে গেছে এখন মামুলি। লাখ লাখ ছেলে-মেয়ে জিপিএ-৫ পায়, লাপিয়ে লাপিয়ে বাড়ে এর সংখ্যা। এ জিপিএ-৫ কে ‘গোল্ডেন’ নামে আখ্যা দিতে প্রবল স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন অভিভাবক।
যদিও কালের হাওয়া অবিশ্বাস্য বেঁকে বিগত ২০ বছরের মধ্যে এ বছরের এইচএসসি ফলাফলে ধস, দেশে গড় পাসের হার মাত্র ৫৮.৮৩ শতাংশ! ২০২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শূন্য শিক্ষার্থী পাস করেছে! এটি ব্যতিক্রম নয় প্রকৃত ফলাফল। ৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে এটি অনুমেয় ছিল, তবে পরবর্তী সময়গুলো সেই মামুলি পাস আর জিপিএ-৫ এর দৌড় চলতেই থাকবে বলাটা অত্যুক্তি হবে না।
শিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিত না করে শুধু লোক দেখানো ফলাফল জাতিকে অনিশ্চিত অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে বিগত সময়। জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অনেকগুলো সংস্কার কমিশন গঠন করলেও, শিক্ষার সংস্কারে কোনো কমিশন গঠিত হয়নি! অপ্রিয় সত্য, এদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর জন্য যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া হয় না! ফলে, জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়ার পথে লাফিয়ে লাফিয়ে এগিয়েছে।
সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন-
প্রথমত, জুতসই নীতি ও কার্যকর দিকনির্দেশনার অভাব। শিক্ষানীতির সংস্কার ও বিদ্যমান শিক্ষানীতির প্রয়োগে স্থবিরতা, এর পরিবর্তন কিংবা নতুন সংযোজন, পরিমার্জন বা পরিবর্ধন হলেও ধারাবাহিকতা ও গতি নেই ৫ এর, রাজনৈতিক ও অদৃশ্য হাতের প্রভাব এবং ‘লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে’ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের অংশগ্রহণের সুযোগ কম।
দ্বিতীয়ত, মানহীন পাঠ্যবই ও অপ্রাচুর্যতা। প্রতি বছরই দেখা যায় বইয়ের সংকট, তড়িঘড়ি ছাপায় গুণগতমান ঠিক থাকে না, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য প্রকট। শিক্ষার্থীর হাতে বই পৌঁছাতে বিলম্ব হয়। পাঠ্যক্রমে অভিজ্ঞতা, ধারণা ও প্রায়োগিক শেখার লক্ষ্য ফাঁকা বুলি মাত্র, বাস্তবতা অসার। জ্ঞান অর্জনের জন্য নয়, শিক্ষার্থীদের মধ্যে চাপিয়ে দেওয়া হয় পরীক্ষা! ফলে, শিক্ষার্থী সংখ্যাশূন্য, পরীক্ষার্থী শতভাগ। এতে ‘গভীর শেখা’ ও নিজের অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে পর্যবেক্ষণ ও নীরিক্ষার ব্যাপারটি গৌণ হয়ে যায়। পাঠ্যবইয়ে ভুল, বিতর্কিত বিষয়বস্তু, রাজনৈতিক সরকারের বদল হলেই হঠাৎ পরিবর্তন, সংযোজন-বিয়োজন ও পরিবর্ধন শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে। যে যার মতাদর্শকে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ে অতিরঞ্জন করে চাপিয়ে দিতে চায়। ফলে, একটা শিক্ষার্থী বিভ্রান্তির মধ্যেই বেড়ে ওঠে, বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসের অভাবে সংশয় ও বিভ্রান্তে ঘুলিয়ে যায় দেশপ্রেম ও চেতনা।
তৃতীয়ত, শিক্ষা খাতে অপ্রতুল বরাদ্দ ও দুর্নীতি। দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন, জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ আমাদের শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। দুর্নীতির আখড়া জাতির শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সব! শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভয়াবহ দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়ন ওপেন সিক্রেট। দেশের এমপিওভুক্ত স্কুল ও কলেজগুলোতে এনটিআরসির নিয়োগের আগে জাল সনদ ও টাকার বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগের উদাহরণ আছে! কেঁচো খুঁড়তে গেলে আস্ত বড় বড় অজগর বেরিয়ে আসবে! একসময় এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ হলে এ অসাধুরাও সরকারি গেজেটেড শিক্ষক বনে যায়! অনেক শিক্ষক শিক্ষকতা পেশাকে ‘পার্ট টাইম জব’ হিসেবে বিবেচনা করেন। এছাড়াও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট অনেক কিছুতে সীমাহীন দুর্নীতি ও তদবিরের ফলে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ এবং প্রকল্পের অর্থ অপচয় হয়। কমিশন বাণিজ্য, ঠিকাদারি অনিয়মে স্থাপনাগুলোতে যার ছাপ স্পষ্ট, অবকাঠামোগত ভঙ্গুরতা যার দৃশ্যমান বাস্তবতা!
চতুর্থত, শিক্ষকসংকট ও ঘটনাচক্রে বা বাধ্য হয়ে শিক্ষকতা। গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চরম পরম শিক্ষক স্বল্পতা, বিশেষত ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞানের শিক্ষক কম। শিক্ষকতায় বহুমাত্রিক সংকট ও সীমাবদ্ধতার কারণে দিনদিন এ পেশার মর্যাদা হ্রাস পাচ্ছে, ফলে যোগ্য তরুণরা এতে আকৃষ্ট হয় না। অন্য কোনো গত্যন্তর না পেয়ে শিক্ষক, এটাই কার্যত অপ্রিয় সত্য। ব্যতিক্রমও আছে। শিক্ষকতাও অন্য সাধারণ পেশা, যারা এতে আনন্দ পান, সৎ প্রবৃত্তির অনুশীলন করেন, তারা হয়ে যান মহান। অনুকরণীয়, অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব।
পঞ্চমত, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় মানের সংকট। আমাদের ছাত্রজীবন মোটাদাগে ৪টি স্তরে বিভক্ত। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক বা কলেজ ও উচ্চতর শিক্ষা বা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়। প্রত্যেকটি পর্যায়ে বহুমুখী সংকট ও সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান। গুণগতমানের শিক্ষা নেই বললেই চলে।
প্রাথমিক শিক্ষা হলো শিক্ষার প্রারম্ভিক পাঠ। এখানে অঙ্কুর হয় ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালক ও নীতিনির্ধারকদের বীজ। এই ভিত্তি যত শক্তিশালী, একজন শিক্ষার্থীর মগজ ও মনন ততই পরিপক্ব। কেননা, সবারই শিক্ষাজীবনের প্রথম সঞ্চয় প্রাথমিক শিক্ষা। অথচ, বর্তমান চিত্র হতাশার। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পেরিয়েও অনেক শিক্ষার্থী সঠিকভাবে পড়তে ও লিখতে পারে না! বেসরকারি ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মান ও পদ্ধতিগত বিরাট বৈষম্য চোখে পড়ে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধর্মীয় বা কোরআন শিক্ষার যথোপযুক্ত সুযোগ না থাকায় যত্রতত্রে নিয়মের তোয়াক্কা না করে গড়ে ওঠা নুরানী মাদ্রাসাগুলোতে ও বেসরকারি স্কুলে শিক্ষার্থীদের ঢল, এদিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংকট।
মাধ্যমিক শিক্ষায়ও সংকট ও সীমাবদ্ধতা অগণিত। দক্ষ শিক্ষক ও প্রশিক্ষণের অভাব, ম্যানেজিং কমিটিতে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, শিক্ষকদের মধ্যে গ্রুপিং ও মনোমালিন্য পাঠদানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অসাদু শিক্ষকদের কারণে যোগ্য ও মেধাবীরা ক্ষতির সম্মুখীন হন।
সরকারি স্কুলগুলো বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষা ও বোর্ড পরীক্ষার হল হিসেবে ব্যবহৃত হওয়াসহ নানা কারণে স্কুল বন্ধ থাকে, ক্লাস নিয়মিত হয় না। আবার উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়েও আছে সংকট। দেশের সরকারি কলেজগুলোতে ক্লাসের পাঠ ক্লাসে শেষ হয় বলা মুশকিল। শিক্ষার্থী অনুপাতে শিক্ষক ও অবকাঠামো অপ্রতুল, শিক্ষকের একাংশ কোচিং বাণিজ্য করেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রাইভেট নির্ভরতা প্রকট।
প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজ স্তর শেষে একজন শিক্ষার্থী তুমুল প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠের সুযোগ পায়। একাংশ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। সবচেয়ে বিরাট অংশ ভর্তি হয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু জ্ঞান অর্জন নেই শুধু সনদ নামক কাগজের জন্যই উচ্চতর শিক্ষার এত রাখঢাক!
উচ্চ শিক্ষায় নেই গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ ও জুতসই পরিবেশ। শিক্ষার্থী অনুপাতে শিক্ষক নেই। একাডেমিক ক্লাসরুমের স্বল্পতা, ল্যাব, পরিবহন, আবাসন সুবিধার প্রকট সংকট। আন্তর্জাতিক গুণগতমানে ব্যবধান আকাশ পাতাল! দিনশেষে ভুরিভুরি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস শিক্ষিত বেকার রাষ্ট্রের ও পরিবারের জন্য বোঝা! পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লেজুড়বৃত্তিক শিক্ষক ও ছাত্ররাজনীতির ভয়ংকর নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ্যণীয়।
যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে টেকনিক্যাল ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব নেই। যুগযুগ ধরে চলা পুরোনো সিলেবাস, শিট নির্ভর পড়াশোনা করেই স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ হয়ে যায়! দক্ষ শিক্ষকের অভাব, তথাকথিত এটেনডেন্সের নম্বর পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের বাধ্য করা হয় বিরক্তিকর অপ্রয়োজনীয় ক্লাস করতে। শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি, স্বায়ত্তশাসনের নামে কিছু ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারিতা দৃশ্যমান, কখনও কখনও শিক্ষার্থীদের জিম্মি করা হয়। তথাকথিত র্যাগিং, গেস্টরুম প্রথা নিত্য-নৈমিত্তিক চিত্র! এগুলো তেতো কথা, তবে ধ্রুবতারার মতো সত্য। এ পচনগুলো সমূলে উৎপাটন না করলে সময়ের অনেক পেছনে চলে যেতে হবে সামগ্রিক জাতি ও রাষ্ট্রকে। সমাধান রাতারাতি সম্ভবপর নয়, তবে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে সরকারের সদিচ্ছা ও রাজনৈতিক ঐক্য থাকলে সম্ভব।
মোদ্দাকথা, দুনিয়া বদলে গেছে। ইন্টারন্যাশনালাইজেশন ও গ্লোবালাইজেশনের এ যুগটা আধুনিক তথ্য ও প্রযুক্তি নির্ভর। এআই হয়ে উঠেছে অপ্রতিদ্বন্দ্বী, জীবনের সর্বান্তকরণে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এখন বহুল প্রাসঙ্গিক যার ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। অথচ, আমাদের শিক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি এখনও খাতাণ্ডকলমনির্ভর, প্রযুক্তিতে দক্ষ ও কৌতূহলী শিক্ষার্থীদের জন্য এমন ঘুণে ধরা শিক্ষাব্যবস্থা বিরাট দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ডেকে আনবে। কিছু বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ এখন সময়ের অযাচিত খরচ বলা চলে।
পরিশেষে, শিক্ষা হবে জাতি বিনির্মাণের কারখানা, সনদ-ক্রয়ের দোকান নয়।
শিক্ষাব্যবস্থার উৎকর্ষ সাধনে যুগোপযোগী ও আন্তর্জাতিক গুণগতমান অনুযায়ী শিক্ষানীতি প্রণয়ন, ধারাবাহিকতা রক্ষা জরুরি। এজন্য রাজনৈতিক ঐক্য ও সরকারের সদিচ্ছা প্রয়োজন। গোড়ার সমস্যা সমাধান না করতে পারলে আরও করুণ বাস্তবতা খুব নিকটে! এসব সংকট ও সীমাবদ্ধতার শেকড় অনেক গভীরে চলে গেছে, সমূলে উৎপাটন যতদিন হবে না, ততদিন শিক্ষার এই ভগ্নদশা, মামুলি জিপিএ-৫ চলতেই থাকবে! জাতির মেরুদণ্ড ‘শিক্ষার’ ট্রেন চলবে এক অনিশ্চিত গন্তব্যে, ভুল পথে!
মো. কামরুল হাসান
ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগ