প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৭ জানুয়ারি, ২০২৬
বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় রেলপথ একসময় ছিল মানুষের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভরসা। নদীমাতৃক এই দেশে সড়কপথের সীমাবদ্ধতা, যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকির বিপরীতে রেলকে দেখা হতো নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও সময়নিষ্ঠ যোগাযোগমাধ্যম হিসেবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বিশ্বাসে ধরেছে গভীর ফাটল। আজ ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় যেন একটি নিয়মিত জাতীয় দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। নির্ধারিত সময়সূচি কাগজে- কলমে থাকলেও বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। ফলশ্রুতিতে প্রতিদিন লাখ লাখ যাত্রীকে সীমাহীন দুর্ভোগ, অনিশ্চয়তা ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে।
এই বিপর্যয় শুধু দেরিতে ট্রেন পৌঁছানোর গল্প নয়; এটি একটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অদূরদর্শী পরিকল্পনা ও দায়িত্বহীনতার ফল। রেলওয়ের সময়সূচি ভেঙে পড়ার অর্থ হলো মানুষের জীবনের ছন্দ ভেঙে পড়া। অফিসগামী কর্মজীবী মানুষ, পরীক্ষার্থী শিক্ষার্থী, অসুস্থ রোগী, শ্রমজীবী মানুষ, এমনকি প্রবাসফেরত যাত্রীরা, কেউই এই দুর্ভোগের বাইরে নন। ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা, নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব। সব মিলিয়ে যাত্রা শুরু হওয়ার আগেই যাত্রী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন।
ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়ের পেছনে একক কোনো কারণ নেই; বরং এটি বহুমাত্রিক সমস্যার সম্মিলিত ফল। প্রথম ও প্রধান কারণ হলো অবকাঠামোগত দুর্বলতা। দেশের রেললাইনগুলোর বড় একটি অংশ ব্রিটিশ আমলে নির্মিত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যাত্রী ও পণ্যের চাপ বহুগুণে বাড়লেও লাইনের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন সেই হারে হয়নি। একক লাইনে বিপরীতমুখী ট্রেন চলাচল, লুপ লাইনের অপ্রতুলতা এবং পুরোনো রেলপথের সীমিত গতি ট্রেন চলাচলকে স্বাভাবিকভাবেই ব্যাহত করে।
দ্বিতীয়ত, সিগন্যালিং ও ট্রাফিক কন্ট্রোল ব্যবস্থার দুর্বলতা। আধুনিক রেল ব্যবস্থায় স্বয়ংক্রিয় ও কেন্দ্রীয় সিগন্যালিং ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের দেশে এখনও বহু রুটে পুরোনো ও ম্যানুয়াল সিগন্যালিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়। সামান্য ত্রুটি বা মানবিক ভুল পুরো রুটে ট্রেন চলাচল থামিয়ে দিতে পারে। একটি ট্রেন দেরি করলে তার প্রভাব পড়ে পরবর্তী কয়েকটি ট্রেনের ওপর। ফলে তৈরি হয় শিডিউল বিপর্যয়ের চেইন রিঅ্যাকশন।
তৃতীয় কারণ হলো, পরিকল্পনাহীনভাবে ট্রেন সংখ্যা বৃদ্ধি। যাত্রী চাপের কথা বিবেচনা করে নতুন ট্রেন চালু করা প্রয়োজন হলেও, তার আগে লাইনের সক্ষমতা, ইঞ্জিন ও কোচের প্রাপ্যতা, জনবল এবং রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা যাচাই করা জরুরি। বাস্তবে দেখা যায়, রাজনৈতিক বা তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তার কারণে অনেক সময় সক্ষমতার বাইরে গিয়ে ট্রেন চালু করা হয়। এর ফল হিসেবে পুরো নেটওয়ার্কে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।
চতুর্থত, লোকবল সংকট ও দক্ষতার অভাব। রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে দীর্ঘদিন ধরে জনবল সংকট রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অপ্রশিক্ষিত বা অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মীদের দিয়ে সংবেদনশীল কাজ করানো হয়। ট্রেন চালক, গার্ড, সিগন্যাল অপারেটর ও রক্ষণাবেক্ষণ কর্মীদের ঘাটতি সরাসরি নিরাপত্তা ও সময়নিষ্ঠতার ওপর প্রভাব ফেলে।
পঞ্চমত, রক্ষণাবেক্ষণের দুরবস্থা। ইঞ্জিন, কোচ ও লাইনের নিয়মিত ও মানসম্মত রক্ষণাবেক্ষণ না হলে যান্ত্রিক ত্রুটি বাড়ে। হঠাৎ ইঞ্জিন বিকল, লাইনে ফাটল কিংবা যান্ত্রিক সমস্যার কারণে ট্রেন থেমে যায় মাঝপথে। এসব ঘটনা শুধু একটি ট্রেন নয়, পুরো রুটের শিডিউল ভেঙে দেয়। এ ছাড়া লেভেল ক্রসিংয়ে অব্যবস্থাপনা, অবৈধ স্থাপনা, লাইনের ওপর মানুষ ও পশুর চলাচল, চুরি ও নাশকতার ঘটনাও ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন ঘটায়। এসব সমস্যার অনেকগুলোই দীর্ঘদিন ধরে জানা থাকলেও কার্যকর সমাধাণ দৃশ্যমান নয়।
শিডিউল বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ যাত্রীরা। ট্রেন নির্ধারিত সময়ে না এলে স্টেশনে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের ভোগান্তির শেষ থাকে না। বিশেষ করে রাতে দূরপাল্লার ট্রেন দেরি হলে নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। অনেক স্টেশনে পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা, শৌচাগার কিংবা বিশুদ্ধ পানির সুবিধা নেই। ফলে দীর্ঘ অপেক্ষা শারীরিক ও মানসিক উভয় দিক থেকেই কষ্টকর হয়ে ওঠে।
অফিসগামী মানুষ সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পারায় চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়েন বা কর্তৃপক্ষের ভর্ৎসনার শিকার হন।
শিক্ষার্থীরা পরীক্ষাকেন্দ্রে দেরিতে পৌঁছে পরীক্ষায় অংশ নিতে ব্যর্থ হন। রোগীরা চিকিৎসা নিতে গিয়ে দেরি হওয়ায় অনেক সময় মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েন। এসব ঘটনা ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিতে রূপ নেয়, যার দায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই বহন করতে হয়।
ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় শুধু ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয়; এর সুদূরপ্রসারী সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। নিয়মিত বিলম্বের কারণে মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, উৎপাদনশীলতা কমে যায়। পণ্য পরিবহন ব্যাহত হলে বাজারে সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়, যার প্রভাব পড়ে দ্রব্যমূল্যের ওপর। শিল্পকারখানার কাঁচামাল ও পণ্য সময়মতো পৌঁছাতে না পারলে উৎপাদন চক্র বাধাগ্রস্ত হয়।
পর্যটন খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ট্রেন ভ্রমণকে কেন্দ্র করে দেশীয় পর্যটনের সম্ভাবনা থাকলেও অনিয়ম ও অনিশ্চয়তার কারণে অনেকেই ট্রেন এড়িয়ে চলেন। দীর্ঘমেয়াদে এতে রেলওয়ের রাজস্ব কমে যায় এবং মানুষ সড়কপথে ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণে বাধ্য হন।
এই বিপর্যয়ের জন্য দায় কার? এই প্রশ্নটি বারবার উঠে আসে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ প্রায়ই যান্ত্রিক ত্রুটি, আবহাওয়া বা অনিবার্য কারণের কথা বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু নিয়মিত ও কাঠামোগত সমস্যাকে আর ‘অনিবার্য’ বলা যায় না। এখানে স্পষ্টভাবে পরিকল্পনার ঘাটতি, দুর্বল তদারকি ও জবাবদিহির অভাব রয়েছে। কোনো শিডিউল ভেঙে পড়লে তার দায় নির্ধারণ ও সমাধানের পরিবর্তে বিষয়টি যেন স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবেই মেনে নেওয়া হয়েছে।
এই সংকট থেকে উত্তরণে প্রথমেই প্রয়োজন বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। অবকাঠামো উন্নয়ন, বিশেষ করে ডাবল লাইন সম্প্রসারণ, আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা এবং ট্র্যাক নবায়ন, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে ট্রেন সংখ্যা বাড়ানোর আগে লাইনের সক্ষমতা ও রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, জনবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণে গুরুত্ব দিতে হবে। দক্ষ চালক, গার্ড, প্রকৌশলী ও ট্রাফিক কন্ট্রোলার ছাড়া আধুনিক রেলব্যবস্থা কল্পনাই করা যায় না। তৃতীয়ত, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে যাত্রীদের কাছে নির্ভরযোগ্য ও তাৎক্ষণিক তথ্য পৌঁছে দিতে হবে। ট্রেন দেরি হলে তা গোপন না রেখে স্বচ্ছভাবে জানানো হলে যাত্রীরা বিকল্প পরিকল্পনা করতে পারবেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা। রেলপথকে শুধু প্রকল্প নয়, জনসেবার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। যাত্রীদের সময় ও সম্মানকে মূল্য না দিলে উন্নয়নের সব দাবি অর্থহীন হয়ে পড়ে।
ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় আজ আর বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়; এটি আমাদের অব্যবস্থাপনার প্রতীক। যতদিন পর্যন্ত যাত্রীদের দুর্ভোগকে গুরুত্ব দিয়ে সমাধানের পথে না যাওয়া হবে, ততদিন রেলপথ মানুষের আস্থা হারাতেই থাকবে। সময় এসেছে কথার উন্নয়ন নয়, সময়নিষ্ঠ ও মানবিক রেলব্যবস্থা গড়ে তোলার।
আরিফুল ইসলাম রাফি
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়