ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ২৪ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ ২০২৬ সালের চ্যালেঞ্জ

লোটাস জাহাঙ্গীর
পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ ২০২৬ সালের চ্যালেঞ্জ

২০২৬ সাল বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। একদিকে যেমন অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত, অন্যদিকে তেমনি বহুমুখী সংকটের বাস্তবতা। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরে দেশ উন্নয়নশীল রাষ্ট্র থেকে উত্তরণে এক ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে আছি। ২০২৫ সালটি অনেক চ্যালেঞ্জ ও সংকটের মধ্যে দিয়ে পেরিয়ে ২০২৬ সালে একাধিক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। একের পর এক নতুন সমস্যা দেশের স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরিতে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ কী এসব সংকট দূর করে নতুন দিগন্তের মুখ দেখবে? বিশ্বব্যাপী ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক মন্দা সরাসরি বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত দেশকে অস্তিত্বগত সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আগামী মাসে জাতীয় নির্বাচন ও দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশের উপর নির্ভর করছে দেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাময় না সংকটাপন্ন। ২০২৬ এর শুরু থেকেই জনগণ রাজনৈতিক আস্থার সংকটে ভুগছেন। এছাড়াও যেসব সমস্যা মোকাবেলা করতে হতে পারে মূল্যস্ফীতির চাপ, মুদ্রাস্ফিতি, জ্বালানি সংকট, খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি, কৃষি উৎপাদন হ্রাস পাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন, রেমিট্যান্স কমে যাওয়ায় রাজস্ব খাতে দুর্বলতা, দক্ষ জনসম্পদের অভাব, ডিজিটাল নিরাপত্তা সমস্যা ও শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতের চ্যালেঞ্জ। বছরের শুরুতেই রাষ্ট্র ও জনগণকে একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে দেশ কোন পথে এগোবে। দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটির তিনদিকে ক্ষমতাধর ভারতের অবস্থান হওয়ায় দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতি অনেকটাই তাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। নতুন বছরে বাংলাদেশ কী পারবে ভারতের যাঁতাকল থেকে বেরিয়ে স্বাধীনভাবে দেশ বিনির্মাণ করতে। দেশের যত সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে তার অধিকাংশই পার্শ্ববর্তী দেশের প্রভাবে। বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হলেও নেই গণতন্ত্রের সুশাসন, সামাজিক ন্যায় বিচার, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা। যা সবসময় উন্নয়নের অন্তরায় বাধা হয়ে থাকে। ২৬ এর সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জগুলো বিশ্লেষণ পূর্বক উপস্থাপন করা হলো।

রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ : জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ টালমাটাল অবস্থার মধ্যে দিয়ে এগোচ্ছে। বর্তমান রাজনীতিতে জনগণের আস্থার সংকট স্পষ্ট। এবছর ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন ১১ ডিসেম্বর, ২০২৫। তফসিল ঘোষণার পর দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ আরও ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে। তফসিল ঘোষণার পরদিন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ উসমান হাদী আততায়ীর হাতে গুলিবিদ্ধ হন এবং ১৮ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যুর হলে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ বিরাজ করছে। হাদি হত্যা বাংলাদেশের রাজনীতি ও জাতীয় নির্বাচনের জন্য নিঃসন্দেহে অশনি সংকেত। দলীয় রাজনীতির অতিরিক্ত মেরুকরণ রাজনৈতিক সহনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে। বর্তমানে দেশে ৫৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল রয়েছে। এদের মধ্যে খুব কম দলই আছে যারা জনগণের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। তারা কী দেশ ও জনগণের কল্যাণে রাজনীতি করেন? না একমাত্র নিজেদের স্বার্থে করেন এই প্রশ্ন অনেক আগের। যারা নিজের প্রভাব বিস্তারের জন্য ক্ষমতায় আসতে বা থাকতে চায়, তাদের দ্বারা আদৌও দেশ ও জনগণের উন্নয়ন সম্ভব? নিজের মতের বাইরে সবকিছুকে শত্রুতা মনে করা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে দুর্বল করছে। আজকে দেশের দলীয় নেতাগণ একে অপরের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়িতে লিপ্ত। অথচ উন্নয়নের চাবিকাঠি হচ্ছে সম্মিলিত প্রয়াস। জনগণ সুষ্ঠু বিচার পাচ্ছেন না। গত দুই মাসে অনেকগুলো খুন হলেও অপরাধীদের এখনো শাস্তির আওতায় আনতে সক্ষম হননি। যা অন্তর্বর্তী সরকারের ওযুহাত আর ব্যর্থতা ছাড়া কিছুই নয়। স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের মতো পরিবেশ বাংলাদেশে এখনো তৈরি হয়নি। যেটি জনগণকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে অনীহা তৈরি করছে। দলীয় সংঘাত ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সংঘাত মুক্ত না হলে, সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ কখনোই আশা করা যায় না। নিরপেক্ষ প্রশাসন- যে দল ক্ষমতায় থাকে প্রশাসন সে দলের কথায় নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় জনগণ যথাযথ প্রশাসনিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য এটি দুর্ভাগ্যজনক।

অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ : অর্থনীতি হচ্ছে একটি দেশের মূল চালিকাশক্তি। গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে যাচ্ছে। বৈশ্বিক মন্দা, ভূ-রাজনৈতিক সমস্যা, জ্বালানি সংকট, মুদ্রাস্ফিতির চাপ, রেমিট্যান্সের হার কমে যাওয়া, রপ্তানি আয় হ্রাস পাওয়া ও বেকারত্বের হার বেড়ে যাওয়া দেশের অর্থনীতিকে নতুনভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। দেশের মানুষজনের আয় না বাড়লেও ব্যয় বাড়ছে— যা অসামঞ্জস্য সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। দেশে আইটি, ফ্রিল্যান্সিং, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশলে বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। ফলে প্রবৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রায় রিজার্ভ ধরে রাখা চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে অন্যতম ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা (খেলাপি ঋণ)। ২০২৬ সালে জ্বালানি স্বল্পতা শিল্প ও উৎপাদন খাতে প্রভাব ফেলতে পারে এবং সামগ্রিক ব্যয় বেড়ে যাবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। কর আদায়ে দুর্বলতা সরকারের রাজস্বের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। বর্তমানে দেশের রপ্তানি আয় ৮০% পোশাক শিল্পের উপর নির্ভরশীল। চলতি বছরে রপ্তানি বহুমুখী করণের বিকল্প নেই। দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করায় সরকারের প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু নতুন বছরে দেশের অর্থনীতি ঠিক রাখতে সরকার কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন কিনা প্রশ্ন থেকে যায়। সামনে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পরিবেশ স্থিতিশীল হলে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন। ফলে দেশের অর্থনীতিতে আস্থা ফিরতে পারে বলে আশা করা যায়। ঢাকা মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, এখন সবার নজর নির্বাচনের দিকে। নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হলে এবং একটি গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এলে তারা অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো সমাধানে কাজ করবেন।

লোটাস জাহাঙ্গীর

ইতিহাস বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত