ঢাকা শনিবার, ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ২৬ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ভেনেজুয়েলার ওপর মার্কিন আগ্রাসন বৈশ্বিক সার্বভৌমত্বের ওপর কুঠারাঘাত

মো. তাহমিদ রহমান
ভেনেজুয়েলার ওপর মার্কিন আগ্রাসন বৈশ্বিক সার্বভৌমত্বের ওপর কুঠারাঘাত

প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর লাতিন আমেরিকার সমৃদ্ধ রাষ্ট্র ভেনিজুয়েলা আজ বৈশ্বিক রাজনীতির এক জটিল সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। লাতিন আমেরিকার ইতিহাসের পরতে পরতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের হস্তক্ষেপ একটি অতি পরিচিত বিষয়। কিন্তু সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রীকে মার্কিন সেনাবাহিনীর গ্রেপ্তারের ঘটনা বিশ্ববাসীর কাছে মার্কিন আগ্রাসনের অযৌক্তিক এবং বেপরোয়া আচরণ ফুটে উঠেছে। কূটনৈতিক শিষ্টাচারকে বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন করে ভেনিজুয়েলায় পরিচালিত মার্কিন আগ্রাসন একেবারেই সর্বোচ্চ মাত্রার নগ্ন উন্মত্ততা প্রদর্শন। বছরের শুরুতেই বিশ্বকে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর চিরাচরিত বিশৃঙ্খল ও উগ্র ভঙ্গি প্রদর্শন করল। ভেনিজুয়েলায় ট্রাম্পের এই আগ্রাসন আন্তর্জাতিক আইন ও নৈতিকতার সাথে সাংঘর্ষিক। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, ট্রাম্প নিজেই এক সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র বিদেশে যুদ্ধ বন্ধ করবে এবং অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সামরিক হস্তক্ষেপ কমাবে। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতির কোনো মূল্যই তিনি দিচ্ছেন না বরং উল্টোভাবে তিনি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি আগ্রাসী পথে হাঁটছেন। মার্কিন সেনাবাহিনী কর্তৃক ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রীকে গ্রেপ্তার কার্যত একটি শাসন পরিবর্তনের অভিযান বলেই মনে হচ্ছে। এর আগেও, বড়দিনের দিন ট্রাম্প নাইজেরিয়া ও সোমালিয়ায় বিমান হামলার অনুমোদন দিয়েছিলেন। একই দিনে ভেনেজুয়েলার ওপর একটি সিআইএ ড্রোন হামলাও চালানো হয়। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অপহরণের পর কলম্বিয়া, ইরান, কিউবা এবং মেক্সিকোকেও হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। সেই সঙ্গে সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে নিয়েও ব্যাঙ্গাত্মক মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। যা বিশ্বরাজনীতিকে দীর্ঘ ও ভয়াবহ পরিনতির ঈঙ্গিত বহন করছে। ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসনের মরিয়া প্রচেষ্টা নতুন কোনো ঘটনা নয়।

সেই ১৯৯৯ সালে হুগো শ্যাভেজ ক্ষমতায় আসার পর ভেনিজুয়েলার রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন ঘটে। শ্যাভেজ ‘বলিভিয়ান বিপ্লব’-এর মাধ্যমে তেল সম্পদের জাতীয়করণ, সামাজিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধি ও দারিদ্র্য হ্রাসের উদ্যোগ নেন। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বাসস্থানের মতো মৌলিক অধিকারকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে তিনি তেল আয়ের বড় অংশ জনগণের জন্য ব্যয় করেন। এই নীতিগুলো ভেনিজুয়েলার দরিদ্র জনগণের কাছে জনপ্রিয় হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোর কাছে ছিল অস্বস্তিকর। কারণ এতে তাদের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সুবিধা হুমকির মুখে পড়ে। ২০০২ সালে শ্যাভেজের বিরুদ্ধে সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থানে মার্কিন প্রশাসনের পরোক্ষ সমর্থনের অভিযোগ আজও ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে।

২০১৯ সালে ভেনিজুয়েলার রাজনৈতিক সংকট নতুন মোড় নেয়, যখন বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদো নিজেকে ‘অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট’ ঘোষণা করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি পশ্চিমা দেশ তাকে স্বীকৃতি দেয়। এটি ছিল আন্তর্জাতিক আইনের এক নজিরবিহীন লঙ্ঘন। একটি সার্বভৌম দেশের নির্বাচিত সরকারকে উপেক্ষা করে বিদেশি শক্তির মদদে বিকল্প নেতৃত্ব দাঁড় করানোর এই প্রচেষ্টা স্পষ্টভাবে আগ্রাসনের শামিল। গুয়াইদোকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার বিদেশে থাকা রাষ্ট্রীয় সম্পদ তার নিয়ন্ত্রণে দেওয়ার চেষ্টা করে। এর ফলে দেশের অর্থনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হয়। শেষ পর্যন্ত এই প্রকল্প ব্যর্থ হলেও এটি দেখিয়ে দেয় যে, মার্কিন নীতি কতটা প্রকাশ্যভাবে ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারের অভিযোগে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী। পরে তাকে মাদকপাচার ও ষড়যন্ত্রের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। মাদক পাচার ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে গত কয়েক মাসে ক্যারিবিয়ান সাগরে বিপুলসংখ্যক যুদ্ধজাহাজ এবং পরমাণুচালিত ডুবোজাহাজ নামিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মাদক পাচারের বিষয়ে ভেনেজুয়েলা একেবারে নির্দোষ ছিল না।

বিশ্বের শীর্ষ কোকেন উৎপাদনকারী দেশ কলম্বিয়াকে মাদক পাচারের জন্য ভেনেজুয়েলা নিজেদের আকাশ ও জলপথ ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল। অবশ্য ভেনেজুয়েলার চেয়েও মাদক পাচারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হোতা কলম্বিয়া এবং মেক্সিকোর মাদকচক্র। তবে সেদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ততটা নজর দেয়নি, যতটা নজর দিয়েছে ভেনেজুয়েলার ওপর। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে আসলেই কি মাদক চোরাচালান প্রতিরোধ করতেই ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী আক্রমণ, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো উদ্দেশ্য। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো অবশ্য বরাবরই মাদকসংশ্লিষ্টতার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে এসেছেন।

গ্রেপ্তার হওয়ার দিনেও তিনি বলেছেন, ওয়াশিংটন মূলত ভেনেজুয়েলার তেল চায়। এ জন্যই তারা হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র কখনোই চায় না পশ্চিম গোলার্ধের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ নিয়ে তাদের বাইরে কেউ মাথা ঘামাক। সেখানে চীনের বিনিয়োগ বর্তমান বৈশ্বিক ক্ষমতার কাঠামোতে যুক্তরাষ্ট্রের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান একটা বড় লক্ষ্য তেল। মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) হিসাব অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার খনিতে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেলের মজুদ। যার পরিমাণ ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল, যা বিশ্বজুড়ে খনিগুলোতে থাকা অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ। ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলের মজুদ থাকলেও উৎপাদন খুবই নগণ্য।

বর্তমানে দেশটি দিনে মাত্র ১০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করে। আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে প্রতিদিন যে পরিমাণ অপরিশোধিত তেল সরবরাহ আসে, তার মাত্র ০.৮ শতাংশ আসে ভেনেজুয়েলা থেকে। জ্বালানি তেলের বিশাল মজুদ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। তার পরও ভেনেজুয়েলার তেলে কেন তাদের আগ্রহ? এর কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের তেল হালকা, এ ধরনের অপরিশোধিত তেলকে বলা হয় ‘সুইট ক্রুড’। এ ধরনের তেল গ্যাসোলিন জাতীয় জ্বালানি তৈরির জন্য খুবই উপযোগী, তবে এর বেশি আর তেমন কোনো কাজে আসে না। অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল ভারী ও ঘন। যুক্তরাষ্ট্রের তেল উত্তোলন ও পরিশোধনের ক্ষেত্রেও অন্যান্য তেলের তুলনায় বেশি যত্নশীল হতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত অধিকাংশ হালকা অপরিশোধিত তেল বিদেশে রপ্তানি করা হয়। অথচ টেক্সাস ও লুইজিয়ানার পরিশোধনাগারগুলো চালু রাখতে তাদের প্রতিদিন ছয় হাজার ব্যারেলের বেশি ভারী তেল আমদানি করতে হয়। যা যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক আইন ও নৈতিকতা লঙ্ঘন করে অন্যায়ভাবে ভেনেজুয়েলার দিকে নিয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প সংস্কার করা হলে দেশটি আবারও জ্বালানি তেলের বড় উৎস হয়ে উঠতে পারে। এতে পশ্চিমা তেল কোম্পানিগুলোর জন্য বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হবে। বিশ্ববাজারে তেলের দামও নিয়ন্ত্রণে থাকবে। বছরের পর বছর বিনিয়োগ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেই ধুকছে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প। বিশ্ববাজারে বড় কোনো প্রভাব ফেলার মতো তেল এখন আর উৎপাদন করতে পারে না ভেনেজুয়েলা। ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল ও গ্যাস কোম্পানি পিডিভিএসএ জানিয়েছে, গত ৫০ বছরে তাদের পাইপলাইনগুলো সংস্কার করা হয়নি। তেলশিল্পকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে হলে অন্তত ৫ হাজার ৮০০ কোটি ডলার খরচ করতে হবে। ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের উভয় পক্ষ উত্তেজনা কমিয়ে কূটনৈতিক সংলাপ ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার মাধ্যমে তেলক্ষেত্রগুলো যদি পুরোপুরি খুলে দেয়, তবুও পুরোদমে উৎপাদন শুরু করতে কয়েক বছর লেগে যাবে, খরচ হবে বিপুল অর্থ। সবকিছুকে ছাপিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বকে জানান দিল যে, তারা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক খেয়ালখুশির ভিত্তিতে যাকে খুশি নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ব্যাপক ক্ষমতা রাখে।

প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাহী আদেশ, আইন ও বল প্রয়োগের মাধ্যমে ব্যক্তি, সংস্থা এবং করপোরেশন- সবকিছুকেই লক্ষ্যবস্তু করা যায়। অনেক রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকার প্রধান হয়তো ট্রাম্পের এই মোড়লগিরি নিয়ে এখন থেকে সতর্ক অবস্থায় থাকবেন। যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে বিশ্বের গণতন্ত্রের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরতে ভালোবাসে। কিন্তু ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান এই দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। নির্বাচনের ফল পছন্দ না হলে সেটিকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করা, পছন্দের নেতা না এলে নিষেধাজ্ঞা চাপানো, এটি গণতন্ত্র নয়, এটি ক্ষমতার রাজনীতি। ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক বিপর্যয়, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মানবিক সংকটের পেছনে বহু অভ্যন্তরীণ কারণ থাকলেও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের আগ্রাসী নীতি ও হস্তক্ষেপ এই সংকটকে বহুগুণে বাড়িয়ে তুলেছে, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। ভেনিজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসন আধুনিক বিশ্বব্যবস্থার একনগ্ন চিত্র তুলে ধরে, যেখানে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো নৈতিকতার মুখোশ পরে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করে। এই আগ্রাসনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী কোনো সরকার নয়, বরং সাধারণ ভেনিজুয়েলান মানুষ।

মো. তাহমিদ রহমান

শিক্ষক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত