প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১০ জানুয়ারি, ২০২৬
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক শুধু একটি সড়ক নয়, এটি দেশের অর্থনীতি, শিল্প, বন্দর, রপ্তানি ও মানুষের জীবনের প্রধান সঞ্চালনশক্তি। অথচ নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ, মোগরাপাড়া, পিরোজপুর, টিপরদী ও কাঁচপুর সংলগ্ন অংশে যা ঘটছে, তা দেখে আর বলা যায় না যে, এখানে রাষ্ট্র আছে। এখানে এখন আইন কাজ করে না, নিয়ম চলে না, নিরাপত্তা বলে কিছু নেই। এখানে চলছে এক ধরনের অঘোষিত অপরাধ শাসন।
দিনের পর দিন যেভাবে ছিনতাই ও পরিবহন ডাকাতি ঘটছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ, সুসংগঠিত, পরীক্ষিত অপরাধ ব্যবস্থা। যানজট হলেই অপরাধীরা নামে, অনেক সময় নিজেরাই যানজট তৈরি করে। ৮-১২ জনের সশস্ত্র দল পিস্তল, চাপাতি, রামদা হাতে গাড়িতে ঝাঁপিয়ে পড়ে, গ্লাস ভাঙে, যাত্রীদের মারাত্মকভাবে কুপিয়ে জখম করে, কয়েক মিনিটে সর্বস্ব লুটে নিয়ে স্থানীয় রাস্তা ও আবাসিক এলাকায় মিলিয়ে যায়। এই দৃশ্য একবার নয়, বারবার ঘটছে। এতবার ঘটছে যে, এটি এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আর কোনো অপরাধ যখন স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন সেটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতার সর্বোচ্চ পর্যায় নির্দেশ করে।
এই মহাসড়কে প্রবাসী নাগরিক এখন সবচেয়ে অসহায়। একজন মানুষ বিদেশে বছরের পর বছর শ্রম দিয়ে দেশে আসে, আবার কর্মস্থলে ফেরার প্রস্তুতি নেয়, আর এই সড়কে তার পাসপোর্ট, ভিসা, টিকিট ও সঞ্চিত অর্থ ছিনিয়ে নেওয়া হয়। তার জীবিকা থেমে যায়, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। অথচ রাষ্ট্র নির্বিকার। একইভাবে রাজনৈতিক কর্মীরাও প্রকাশ্য সড়কে হামলার শিকার হচ্ছেন। রক্ত ঝরছে, শরীর ভাঙছে; কিন্তু অপরাধীরা জানে- তাদের জন্য কোনো ভয় নেই। এই বার্তাটি ভয়াবহ: এই দেশে রাজনৈতিক পরিচয়ও আর নিরাপত্তা দেয় না।
সবচেয়ে বিপজ্জনক সত্য হলো- মানুষ এখন থানায় যেতে ভয় পায়। অভিযোগ মানেই হয়রানি, হুমকি, দীর্ঘসূত্রতা এবং শেষ পর্যন্ত কোনো ফল না পাওয়া। এই ভয়ের সংস্কৃতি হঠাৎ তৈরি হয়নি, এটি দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার ফল। যখন নাগরিক নিরাপত্তা চাইতে সাহস পায় না, তখন রাষ্ট্র শুধু নামমাত্র থাকে, বাস্তবে তার অস্তিত্ব থাকে না। এই নীরবতা অপরাধীদের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী ঢাল হয়ে উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্যে নিয়মিত শোনা যায়- টহল বাড়ানো হয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে, অপরাধ কমেছে। কিন্তু বাস্তবতা এসব বক্তব্যকে প্রতিদিন মিথ্যা প্রমাণ করছে। একই জায়গায়, একই কৌশলে, একই ধরনের হামলা বারবার ঘটছে। যদি সত্যিই নিয়ন্ত্রণ থাকত, তাহলে অপরাধীরা এত নিশ্চিন্তে একই এলাকায় একই অপরাধ চালাতে পারত না। এখানে সমস্যা জনবল নয়, সমস্যা কর্তৃত্বের অভাব। এখানে আইন প্রয়োগ নেই, আছে শুধু উপস্থিতির ভান।
যানজট ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা এই অপরাধের জন্য সবচেয়ে বড় সহায়ক শক্তি। বছরের পর বছর একই পয়েন্টে যানজট হয়, সবাই জানে কোথায় হবে, কখন হবে। তবু কার্যকর সমাধান নেই। এই যানজট অপরাধীদের জন্য নিরাপদ কর্মক্ষেত্র তৈরি করেছে। এটি আর অব্যবস্থা নয়, এটি দীর্ঘস্থায়ী দায়িত্বহীনতা। স্থানীয় অপরাধী চক্রগুলোর নাম এলাকাবাসীর কাছে অজানা নয়। তারা কোথায় থাকে, কীভাবে চলে, কার সঙ্গে ওঠাবসা- সবই জানা। তবু তারা অদম্য। কারণ তারা জানে, এই মহাসড়কে অপরাধ করলে ঝুঁকি কম, লাভ বেশি। এই বাস্তবতা নতুন অপরাধীকেও উৎসাহিত করছে। অপরাধ এখানে আর ভয়ংকর কিছু নয়, এটি একটি লাভজনক পেশা হয়ে উঠছে। এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে আর কোনো আশ্বাস, বিবৃতি বা পরিসংখ্যান গ্রহণযোগ্য নয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের এই অংশে যা ঘটছে, তা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের পতন। যত দিন এই সত্য স্বীকার করে বাস্তব, দৃশ্যমান এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা না করা হবে, ততদিন প্রতিটি যাত্রা হবে ঝুঁকিপূর্ণ, প্রতিটি যানজট হবে সম্ভাব্য অপরাধস্থল।
নাগরিক নিরাপত্তা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। এটি কোনো অনুগ্রহ নয়, কোনো রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয় নয়। এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে দায় শুধু অপরাধীর নয়, দায় রাষ্ট্রেরও। এই মহাসড়কে প্রতিটি ছিনতাই, প্রতিটি ডাকাতি, প্রতিটি আহত প্রবাসী, প্রতিটি রক্তাক্ত রাজনৈতিক কর্মী ইতিহাসে লিখে রাখবে- এক সময় ছিল, যখন রাষ্ট্র দেখেও না দেখার ভান করেছিল। এখন প্রশ্ন আর অপরাধীদের দিকে নয়।
প্রশ্ন রাষ্ট্রের দিকে- এই মহাসড়কে কি রাষ্ট্র আবার ফিরবে, নাকি নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তার মাধ্যমে অপরাধীদের শাসনকে স্থায়ী স্বীকৃতি দেবে? সময় শেষের পথে। ইতিহাস অপেক্ষা করে না।
সুমন মিয়া
সাংবাদিক ও কলামিস্ট