ঢাকা শনিবার, ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ২৬ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

বর্ষা মৌসুমে নগর ও ড্রেনেজ সমস্যা

আরশী আক্তার সানী
বর্ষা মৌসুমে নগর ও ড্রেনেজ সমস্যা

বর্ষা এলেই আমাদের শহরের দৃশ্য পাল্টে যায়। আকাশে মেঘের আনাগোনা, মাঝে মাঝে টিপটিপ বৃষ্টি, আবার কখনও একটানা ঝরনার মতো ঝরে পড়া-সব মিলিয়ে বর্ষার একটা আলাদা রোমান্টিক আবেদন আছে। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে শহরের বাসিন্দাদের জন্য লুকিয়ে থাকে এক বড় দুঃস্বপ্ন- পানি জমে থাকা আর ড্রেনেজের ভয়াবহ সমস্যা। বিশেষ করে ঢাকায় থাকলে বর্ষা মানেই সবার মনে প্রশ্ন আজ অফিস বা ক্লাসে যাওয়া যাবে তো? নাকি রাস্তা নদীতে পরিণত হবে?

ড্রেনেজ ব্যবস্থার বর্তমান চিত্র : আমাদের শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা বরাবরই দুর্বল। অনেক জায়গায় ড্রেন আছে ঠিকই, কিন্তু সেগুলোর মুখ বন্ধ হয়ে গেছে আবর্জনায়। কেউ হয়তো দোকানের প্যাকেট ফেলে দিল, কেউ বাসার ময়লা পানির সাথে ছেড়ে দিল- ফলাফল, ড্রেনের পানি বের হতে পারে না। যখন টানা এক-দুই ঘণ্টা বৃষ্টি হয়, তখন সেই বন্ধ হয়ে থাকা ড্রেন গিলতে না পেরে রাস্তার ওপর উগরে দেয় পানি। এই পানি শুধু বৃষ্টির না- ড্রেনের গন্ধ, ময়লা, প্লাস্টিক সব মিশে এমন এক অবস্থা হয় যে রাস্তা দিয়ে হাঁটা মানেই পায়ে চুলকানি, ত্বকে এলার্জি কিংবা আরও খারাপ রোগের ঝুঁকি।

ঢাকার নতুন এলাকা গুলোতে কিছুটা আধুনিক ড্রেনেজ সিস্টেম আছে, কিন্তু সেখানেও সমস্যা হয় কারণ বৃষ্টির পানি নামার খাল বা প্রাকৃতিক পথ প্রায় বন্ধ। বিল্ডিং তৈরি করতে গিয়ে আমরা খাল ভরেছি, জলাধার মুছে ফেলেছি। ফলে পানি জমে থাকে আর ক্রমে সেই জমা পানি নষ্ট হয়ে যায়।

বৃষ্টি নামলেই ‘ওয়াটারলগিং’ আতঙ্ক : ঢাকার মগবাজার, মালিবাগ, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, গাবতলী- এমন অনেক এলাকা আছে যেখানে বর্ষায় হাঁটু কিংবা কোমর সমান পানি জমে যায়। অফিসগামী মানুষের গাড়ি বা বাস পানি থেমে যাওয়ার কারণে আটকে থাকে ঘন্টার পর ঘন্টা। শিক্ষার্থীরা ক্লাস মিস করে, দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়, এমনকি এম্বুলেন্সও সঠিক সময়ে হাসপাতালে পৌঁছাতে পারে না। এই পরিস্থিতি শুধু অসুবিধা নয়, অর্থনৈতিক ক্ষতিও ডেকে আনে। প্রতিদিন এই পানিবন্দি অবস্থায় দেশের হাজার হাজার কর্মঘন্টা নষ্ট হয়।

বর্ষার সাথে স্বাস্থ্যঝুঁকি : বর্ষাকালে পানি জমে থাকা শুধু চলাচলের সমস্যাই নয়, বরং বড় এক স্বাস্থ্যঝুঁকি। মশাবাহিত রোগ যেমন ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া বর্ষার সময় বেড়ে যায়। ড্রেনের সাথে মিশে থাকা পানিতে হাঁটার ফলে পা ও ত্বকের রোগ, ডায়রিয়া, টাইফয়েড- এসবও বাড়ে। WHO -এর একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, পানি জমা ও নোংরা ড্রেন শহুরে স্বাস্থ্যঝুঁকির অন্যতম প্রধান কারণ।

কেন এই অবস্থা হয়? দুর্বল পরিকল্পনা : শহর বাড়ছে, কিন্তু ড্রেনেজ অবকাঠামো সেই হারে উন্নত হচ্ছে না।

প্রাকৃতিক জলাধার ধ্বংস : খাল, বিল, পুকুর ভরাট করে বিল্ডিং তৈরি হওয়ায় পানি নামার পথ হারিয়েছে। অপরিকল্পিত উন্নয়ন : রাস্তা উঁচু করা হলেও ড্রেন বা সাইড ওয়াক সমান উঁচু করা হয়নি। জনসচেতনতার অভাব : ময়লা-আবর্জনা সরাসরি ড্রেনে ফেলার অভ্যাস এখনও অনেকের আছে। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত : জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এখন হঠাৎ করেই অনেক বেশি বৃষ্টি হয়, যা বিদ্যমান সিস্টেম সামলাতে পারে না।

প্রতিদিনের ভোগান্তির চিত্র : একবার মনে আছে, গত বছরের জুলাই মাসে, সকাল ৮টা থেকে টানা এক ঘণ্টা বৃষ্টি হয়েছিল। আমি তখন গুলশান থেকে মিরপুর যাচ্ছিলাম। পথে এত পানি জমেছিল যে রিকশাওয়ালা মাঝপথে নেমে রিকশা ঠেলছিলেন। আশেপাশে বাস, প্রাইভেটকার, সিএনজি- সব দাঁড়িয়ে। ড্রেনের ঢাকনা খোলা থাকায় কয়েকজন হেঁটে যাওয়ার সময় হঠাৎ পড়ে গেলেন, যেটা ভয়াবহ বিপদজনক। এই দৃশ্য দেখে আমার মনে হয়েছিল আমরা কি সত্যিই রাজধানীর বাসিন্দা, নাকি বর্ষাকালে অস্থায়ী ভাসমান শহরে বাস করি?

অর্থনৈতিক প্রভাব : যাতায়াত খরচ বেড়ে যাওয়া- রিকশা-অটোর ভাড়া দ্বিগুণ হয়ে যায়। পণ্যের দাম বৃদ্ধি- বাজারে সরবরাহ ব্যাহত হয়। ব্যবসায়িক ক্ষতি- দোকানপাট ও গুদামে পানি ঢুকে নষ্ট হয় মালপত্র। চাকরির উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া- অফিসে দেরি করে পৌঁছানো বা অনুপস্থিতি বেড়ে যায়।

সম্ভাব্য সমাধান : ড্রেনেজ সিস্টেম সংস্কার ও সম্প্রসারণ- পুরনো ড্রেন প্রশস্ত ও গভীর করতে হবে। খাল পুনঃউদ্ধার- দখলমুক্ত করে খাল ও প্রাকৃতিক জলাধার ফিরিয়ে আনতে হবে। ময়লা ব্যবস্থাপনা- নিয়মিত আবর্জনা অপসারণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রযুক্তি- রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং ব্যবস্থার প্রচলন। স্মার্ট সিটি প্ল্যান- আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে পানি প্রবাহের মনিটরিং ও ব্যবস্থাপনা। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ পরিকল্পনা- যেমন উঁচু রাস্তা, সঠিক স্লোপ, পর্যাপ্ত ড্রেন।

জনসচেতনতার প্রয়োজন : সরকার যতই কাজ করুক, জনগণ যদি সচেতন না হয় তবে সমস্যার সমাধান হবে না। ড্রেনে আবর্জনা ফেলা বন্ধ করতে হবে, ময়লা সঠিকভাবে ডাস্টবিনে ফেলতে হবে। স্কুল-কলেজে এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে হবে। এমনকি স্থানীয় উদ্যোগে নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার করাও সম্ভব।

বর্ষা আমাদের প্রকৃতির অপরূপ রূপ উপহার দেয়, কিন্তু সেই সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে আমাদের শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত করা জরুরি। শুধু সরকারি প্রকল্প নয়, বরং জনগণের অংশগ্রহণ, সঠিক পরিকল্পনা, পরিবেশ রক্ষা- সব মিলিয়ে সমাধানের পথে এগোতে হবে। অন্যথায়, প্রতি বর্ষায় আমরা একই সমস্যায় পড়ব, একই খবর পড়ব, আর একই অভিযোগ করব- কোনো পরিবর্তন আসবে না।

আরশী আক্তার সানী

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত