প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬
বর্তমান বিশ্বের একটি ভয়াবহ ও নীরব অপরাধের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মানব পাচার, যা মানুষের মৌলিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদাকে চরমভাবে লঙ্ঘন করে। এই অপরাধের প্রধান শিকার হন আমাদের সমাজের নারী শিশু ও দারিদ্র্য জনগোষ্ঠী। এই ভয়াবহ অপরাধ সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা, প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতি বছর ১১ জানুয়ারি জাতীয় মানব পাচার সচেতনতা দিবস পালন করা হয়। এটি শুধু আইনগত অপরাধই নয়, এটি একটি গুরুতর সামাজিক ব্যাধি, যার বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ ও সচেতনতা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
২০২৩ সালে, যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস এবং ইউএস ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিসের ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেটিভ ট্রেনিং অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম (ICITAP) এবং ওভারসিজ প্রসিকিউটরিয়াল ডেভেলপমেন্ট, অ্যাসিসট্যান্স অ্যান্ড ট্রেনিং (OPDAT) সারা বাংলাদেশে ২০০ জনেরও বেশি তদন্তকারী, অর্থনীতি বিশ্লেষক, আইনজীবী ও বিচারকদের জন্য মানব পাচাররোধে প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেছে। এসব সক্ষমতাণ্ডনির্মাণ কর্মসূচি বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত।
এতে বাংলাদেশের সহযোগীদের বিশেষজ্ঞ সহায়তা, ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক দক্ষতা বিকাশ এবং ঘটনাভিত্তিক পরামর্শ দেয়া হয়।
মানবপাচার রোধ শুধু সরকারের কাজ নয়, সাধারণ মানুষের সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। আমরা চাইলে দৈনন্দিন জীবনেই কিছু সচেতন পদক্ষেপের মাধ্যমে এই ভয়াবহ অপরাধ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারি। সাধারণ মানুষ হিসেবে আমরা যেভাবে মানব পাচার রোধ করতে পারি-
সচেতনতা বৃদ্ধি করা : মানব পাচার কী, কীভাবে ঘটে, কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকে, এসব বিষয়ে নিজে জানা এবং পরিবার, প্রতিবেশী ও বন্ধুদের জানানো খুব গুরুত্বপূর্ণ।
অসৎ প্রস্তাবে সতর্ক থাকা : সহজ চাকরি, বিদেশে উচ্চ বেতনের কাজ, মডেলিং বা বিয়ের প্রলোভনে অনেকেই পাচারের শিকার হয়। এমন প্রস্তাব পেলে যাচাই না করে বিশ্বাস না করা এবং অন্যদেরও সতর্ক করা দরকার।
সন্দেহজনক ঘটনা দেখলে জানানো : কেউ জোরপূর্বক কোথাও নেওয়া হচ্ছে, ভুয়া কাগজে বিদেশ পাঠানোর চেষ্টা, বা অস্বাভাবিক আচরণ দেখলে দেরি না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় সরকারি হেল্পলাইন নম্বর ব্যবহার করা- ৯৯৯ (জরুরি), ১০৯ (নারী ও শিশু সহায়তা হেল্পলাইন), ১০৯৮ (শিশু সহায়তা হেল্পলাইন)।
শিশু ও নারীদের প্রতি নজর রাখা : পথশিশু, গৃহকর্মী শিশু, দরিদ্র নারী ও কিশোরীরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তাদের হঠাৎ নিখোঁজ হওয়া বা আচরণে পরিবর্তন হলে গুরুত্ব দিতে হবে।
অনলাইনে চাকরির বিজ্ঞপ্তি সম্পর্কে সচেতনতা : ফেসবুক বা অনলাইনে ভুয়া চাকরি, বিদেশ পাঠানোর বিজ্ঞাপন শেয়ার না করা এবং সন্দেহজনক পেজ বা পোস্ট রিপোর্ট করা জরুরি।
মানবপাচারের শিকার কেউ ফিরে এলে তাদের অবহেলা বা লজ্জা না দিয়ে সহানুভূতি, সহায়তা ও আইনি সহযোগিতার পথে নিয়ে যেতে হবে। সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে মানবপাচার বিরোধী সংগঠন, সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন বা স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করলেও বড় ভূমিকা রাখা যায় এই পাচার প্রতিরোধে।
সচেতনতা, সাহস ও মানবিক দায়িত্ববোধই পারে এটি রোধ করতে এবং একটি সমৃদ্ধ দেশ গড়তে। এই জাতীয় মানবপাচার সচেতনতা দিবসে আসুন, আমরা সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করি- নিজে সচেতন থাকব, অন্যকেও সচেতন করব এবং মানবপাচারমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে ভূমিকা রাখব।
নাজিয়াত আক্তার
ফিচার, কলাম অ্যান্ড কনটেন্ট রাইটার্স