ঢাকা রোববার, ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ২৭ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

লাল শাপলার নীরব সৌন্দর্য

লুৎফুন্নাহার
লাল শাপলার নীরব সৌন্দর্য

বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। এখানে অসংখ্য নদী, খাল, বিল, হাওর ও পুকুর রয়েছে। এই জলাশয়গুলোতে নানা ধরনের জলজ উদ্ভিদ ও ফুল জন্মায়। তার মধ্যে শাপলা অন্যতম। শাপলা আমাদের দেশের খুব পরিচিত একটি ফুল। সাদা শাপলা আমাদের জাতীয় ফুল হলেও লাল শাপলার সৌন্দর্য আলাদা করে চোখে পড়ে। লাল শাপলা শুধু একটি ফুল নয়, এটি প্রকৃতির এক নীরব অথচ গভীর সৌন্দর্যের প্রতীক।

শাপলা হলো জলজ ফুল। এটি সাধারণত স্থির পানিতে জন্মায়। পুকুর, ডোবা, বিল কিংবা হাওরের জলে শাপলা বেশি দেখা যায়। শাপলার পাতা বড় ও গোলাকার হয়, যা পানির ওপর ভেসে থাকে। পাতার মাঝখান থেকে একটি লম্বা ডাঁটা উঠে আসে এবং তার মাথায় ফুটে ওঠে সুন্দর শাপলা ফুল। শাপলা সাদা, লাল, গোলাপি ও নীল রঙের হয়ে থাকে। তবে লাল শাপলা দেখতে সবচেয়ে আকর্ষণীয়।

লাল রঙ সাধারণত ভালোবাসা, শক্তি ও সাহসের প্রতীক। লাল শাপলার রঙও তেমনই গভীর ও উজ্জ্বল। কাদা আর পানির মাঝখানে ফুটে থাকা লাল শাপলা যেন প্রকৃতির বুকে আঁকা একটি সুন্দর ছবি। চারপাশে নীরবতা, শুধু হালকা পানির ঢেউ, তার মাঝখানে লাল শাপলা খুব শান্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। এই শান্ত ও নিরব সৌন্দর্যই লাল শাপলার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য।

লাল শাপলা কখনও শব্দ করে না, কাউকে ডাকেও না। তবুও মানুষ থেমে দাঁড়িয়ে এর দিকে তাকায়। এর সৌন্দর্য খুব শান্ত ও স্বাভাবিক। এটি আমাদের শেখায় যে সব সৌন্দর্য চিৎকার করে প্রকাশ পায় না। কিছু সৌন্দর্য নীরব হয়, কিন্তু অনেক গভীরভাবে মানুষের মনে দাগ কাটে। লাল শাপলা সেই নীরব সৌন্দর্যেরই উদাহরণ।

গ্রামবাংলার সঙ্গে লাল শাপলার সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ। গ্রামের পুকুরে, বিলে বা ডোবায় প্রায়ই লাল শাপলা দেখা যায়। ভোরবেলা কুয়াশার মধ্যে পুকুরের জলে ভাসতে থাকা লাল শাপলা খুব সুন্দর দৃশ্য তৈরি করে। গ্রামের মানুষ পানি আনতে গিয়ে, গোসল করতে গিয়ে বা মাছ ধরতে গিয়ে এই ফুল দেখে মুগ্ধ হয়। অনেক সময় শিশুরা শাপলা তুলে খেলাধুলা করে। এই ফুল গ্রামবাংলার প্রকৃতির সঙ্গে মিশে আছে।

অনেকের শৈশবের স্মৃতির সঙ্গে শাপলা জড়িয়ে আছে। গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গেলে পুকুরে নেমে শাপলা তোলা, সেই শাপলা হাতে নিয়ে বাড়ি ফেরা, এসব স্মৃতি খুব আনন্দের। শাপলার ডাঁটা দিয়ে খেলনা বানানো বা বন্ধুদের সঙ্গে মজা করাও ছিল শৈশবের অংশ। লাল শাপলা তাই শুধু ফুল নয়, অনেকের কাছে এটি স্মৃতির প্রতীক।

বাংলা সাহিত্য ও গানে শাপলার কথা অনেকবার এসেছে। কবিরা শাপলাকে প্রকৃতির সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। লাল শাপলা অনেক সময় ভালোবাসা, আবেগ কিংবা মনের গভীর অনুভূতির প্রকাশ হিসেবে এসেছে। কারণ এই ফুল দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি এর মধ্যে এক ধরনের শান্ত ভাব আছে।

শাপলা শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, পরিবেশের জন্যও খুব গুরুত্বপূর্ণ। শাপলা জলাশয়ের পানিকে পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। এটি মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর আশ্রয়স্থল হিসেবেও কাজ করে। শাপলা থাকা মানে সেই জলাশয় এখনও জীবিত ও সুস্থ। তাই শাপলা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বর্তমান সময়ে নগরায়ণ ও আধুনিকতার কারণে অনেক জলাশয় ভরাট হয়ে যাচ্ছে। পুকুর, বিল ও ডোবা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পানিদূষণের কারণেও শাপলার সংখ্যা কমে যাচ্ছে। একসময় যেখানে সহজেই লাল শাপলা দেখা যেত, এখন সেখানে অনেক জায়গায় আর দেখা যায় না। এটি আমাদের জন্য চিন্তার বিষয়।

শহরের মানুষেরা প্রকৃতির সঙ্গে খুব কম সময় কাটানোর সুযোগ পায়। তারা শাপলা দেখে বইয়ের ছবিতে বা মোবাইলের স্ক্রিনে। বাস্তবে শাপলা দেখার অভিজ্ঞতা তাদের কম। ফলে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসাও ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। লাল শাপলার মতো ফুল প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের সংযোগ তৈরি করে, যা শহুরে জীবনে হারিয়ে যাচ্ছে।

লাল শাপলা শেখায় কষ্টের মধ্যেও সুন্দর হয়ে বেঁচে থাকতে। কাদা আর পানির মধ্যেও লাল শাপলা নিজের সৌন্দর্য হারায় না। তেমনি আমাদের জীবনেও অনেক সমস্যা থাকে, কিন্তু সেগুলোর মধ্যেও ভালো মানুষ হয়ে থাকা জরুরি।

লাল শাপলা খুব নীরব। সে কারও দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য চেষ্টা করে না। তবুও সবাই তার দিকে তাকায়। এটি আমাদের শেখায় যে নিজের কাজ ও আচরণ দিয়েই মানুষকে প্রভাবিত করা যায়। বেশি কথা না বলেও ভালো কাজ করা সম্ভব।

প্রকৃতি সংরক্ষণের প্রয়োজন

যদি আমরা চাই ভবিষ্যতেও লাল শাপলা দেখতে, তাহলে এখন থেকেই প্রকৃতি রক্ষা করতে হবে। জলাশয় পরিষ্কার রাখতে হবে, পুকুর ভরাট বন্ধ করতে হবে এবং পানিদূষণ কমাতে হবে।

লাল শাপলা শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়, এটি আমাদের দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দেয়। প্রকৃতিকে ভালোবাসা মানেই তাকে রক্ষা করা। আমরা যদি প্রকৃতিকে নষ্ট করি, তাহলে একদিন এই সুন্দর ফুলগুলো শুধু গল্পে আর বইয়ে থেকে যাবে।

লাল শাপলার নীরব সৌন্দর্য আমাদের মনকে শান্ত করে।

এটি আমাদের প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ ঘটায় এবং জীবন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। কাদা-পানির মধ্যেও মাথা উঁচু করে থাকা লাল শাপলা আমাদের শেখায় সাহস, ধৈর্য ও আত্মসম্মান। তাই লাল শাপলা শুধু একটি ফুল নয়, এটি আমাদের জীবনের এক সুন্দর শিক্ষা।

লুৎফুন্নাহার

শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত