প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬
আমাদের এই সমাজ বিচিত্র। এখানে নানা শ্রেণি, বর্ণ ও পেশার মানুষের বাস। সবার দেহ-মন একরকম নয়। কেউ শুনতে পান না, কেউ বলতে পারেন না; তাদের অনেকেই প্রতিদিন বেঁচে থাকেন এক নিঃশব্দ প্রতিবাদের ভেতর।
?একজন বাকপ্রতিবন্ধী মানুষের সামনে শব্দ ছুড়ে দেওয়া এটাই বোধ হয় তার প্রতি সবচেয়ে সহজ এবং নির্মম শাস্তি। আপনি যা-ই বলুন, তিনি তার অনুভূতি কণ্ঠে তুলে ধরতে পারবেন না। অনেক সময় তারা সব বুঝতে পারেন, কিন্তু প্রতিক্রিয়া জানানোর ভাষা তাদের নেই। ফলে উল্টো দিকের মানুষটি হয়তো ভেবে বসেন, ‘সে কিছু বোঝে না’। অথচ সে বোঝে, সবই বোঝে; শুধু বলতে পারে না।
একজন শব্দহীন মানুষের চোখে তখন কী থাকে? অসহায়তা? অপমান? নাকি বাকশক্তিহীন হয়ে জন্মানোর জন্য পৃথিবীর প্রতি একবুক ক্ষোভ? সে কথাগুলো শুনছে। বোঝার চেষ্টায় মন দিচ্ছে। কেউ কেউ হয়তো সহজ ইশারা-ইঙ্গিতে বোঝানোর চেষ্টা করেন। আবার কেউ অবিরত বলে চলেন ‘এই তো সহজ কথা, একটু বুঝতে চেষ্টা করো!’ কিন্তু বোঝা এবং প্রতিক্রিয়া জানানো এই দুইয়ের মাঝখানে যে হতাশার গভীর খাদ, বাচাল মানুষটি তা অনুভব করতে পারেন না। তিনি ভাবেন, সামনের মানুষটি বুঝল না।
অথচ সে সবই বোঝে, শুধু তার কণ্ঠরোধ করা। এই দৃশ্য শুধু একজন শারীরিক প্রতিবন্ধীর নয়, বরং এটি একটি নিঃশব্দ সমাজের প্রতীক। যেখানে আমরা প্রতিদিন অসংখ্য ‘বোবা’ মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলে চলি, ব্যাখ্যা দিই, চাপ প্রয়োগ করি; কিন্তু একবারও ভাবি না তারা আমাদের মতো প্রতিক্রিয়া জানাতে অক্ষম।
সমাজে এই ‘বোবা’ কারা? তারা সেই শিশু, যাদের ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে বলা হয়, ‘বড়রা কথা বলছে, তুই চুপ কর।’
তারা সেই নারী, যারা সংসার বা সমাজে অনেক কিছু জানলেও তথাকথিত ‘ভদ্রতার’ খাতিরে মুখ খোলেন না। তারা সেই খেটে খাওয়া মানুষ, যারা জানেন কীভাবে তাদের ঠকানো হচ্ছে, কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা তাদের নেই। ভয়, ক্ষুধা আর নির্যাতনের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে তারা আজ বাকশক্তিহীন।
আমাদের আশপাশে প্রতিদিন এমন হাজারো ‘বোবা’ তৈরি হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভীত ছাত্র, পরিবারে অবহেলিত কন্যাসন্তান, অফিসে পদচ্যুতির শঙ্কায় থাকা কর্মচারী সবাই বোবা, সবাই চুপ। কেউ মুখ খুললে চাকরি যাবে, কেউ বললে সংসার ভাঙবে, কেউ বললে মার খাবে। তাই তারা বোবা হয়েই শব্দহীন এক নীরব প্রতিবাদে বেঁচে থাকে। আর আমরা? আমাদের প্ল্যাটফর্ম আছে, ক্যামেরা আছে, মাইক্রোফোন আছে। আমরা উচ্চারণ করি, আমরা কণ্ঠ জাগাই।
কিন্তু যখন সেই সব মানুষগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে অহংকারের সঙ্গে বলি ‘তোমরা কিছুই বোঝো না’, ‘আমাদের মতো হও’ তখন আমরা শুধু কথাই বলি না; আমরা তাদের দহন করি। আমরা তাদের অসহায়ত্বের সামনে নিজেদের শব্দ দিয়ে আগুন ছড়িয়ে দিই। এটি একটি একতরফা যোগাযোগের থিয়েটার, যেখানে দর্শক আছে, কিন্তু প্রতিক্রিয়া নেই।
এই সমাজে এখন সবচেয়ে জরুরি হলো ‘শোনা’। সেই সব মানুষের কথা শোনা, যাদের মুখ বন্ধ কিন্তু চোখ খোলা। যারা কণ্ঠে নয়, হৃদয়ে কথা জমিয়ে রেখেছেন। আমরা যারা শব্দে লিখি বা কণ্ঠে বলি, তারা যদি এই নিঃশব্দকে বুঝতে না পারি, তবে একদিন আমাদের এই লেখাও অর্থহীন হয়ে যাবে।
একটি সভ্য সমাজ শুধু উচ্চারণে গড়ে ওঠে না; গড়ে ওঠে অনুভূতিতে। বোবার সামনে কথা না বলে যদি আমরা তার চোখের ভাষা বুঝি, যদি তার নীরবতার পাশে দাঁড়াই তবেই সভ্যতার প্রকৃত সংলাপ তৈরি হবে। কারণ কথা বলা সহজ, কিন্তু অন্যের নিঃশব্দতা বোঝা এটাই মানবতা।
তানজিদ শুভ্র
শিক্ষার্থী, ফিচার লেখক, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ