প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬
বাংলাদেশের কৃষি মানচিত্রে আলু আজ আর শুধু একটি সাধারণ শীতকালীন সবজি নয়, বরং এটি জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির জীবনীশক্তি। বিগত কয়েক দশকে দেশে আলুর উৎপাদনে যে নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে, তা বিশ্বের কৃষি ইতিহাসে এক বিস্ময়কর উদাহরণ। এক সময় যে দেশে আলুর সংকট ছিল, আজ সেই বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ দশটি আলু উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় সগৌরবে নিজের স্থান করে নিয়েছে। প্রতি বছর আমাদের কৃষকরা হাড়ভাঙা খাটুনি আর মেধা দিয়ে মাটির নিচ থেকে যে ‘সাদা সোনা’ উত্তোলন করছেন, তা দেশের মানুষের পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি কৃষি খাতের এক নতুন সম্ভাবনা উন্মোচন করেছে। তবে এই উৎপাদনের মহোৎসবের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর আর্তনাদ এবং বিপণন ব্যবস্থার চরম দুর্বলতা। প্রতি বছর বাম্পার ফলনের পরও আলু চাষির চোখের জল মুছছে না। আর এখানেই প্রশ্ন জাগে, এই বিশাল উৎপাদন কি আমাদের জন্য সম্পদ নাকি বোঝা? বর্তমান বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এটি পরিষ্কার যে, শুধু উৎপাদন বাড়িয়ে আলু চাষের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। যদি আমরা এই সেক্টর থেকে প্রকৃত অর্থনৈতিক সুবিধা এবং কৃষকের মুখে হাসি দেখতে চাই, তবে প্রথাগত বিপণন থেকে বেরিয়ে এসে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি এবং আধুনিক কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের দিকে এখনই পূর্ণ শক্তিতে নজর দিতে হবে।
বাংলাদেশ কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে আলুর বার্ষিক উৎপাদন ১ কোটি ১০ লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে গেছে। যেখানে আমাদের অভ্যন্তরীণ বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ লাখ টন।
অর্থাৎ প্রতি বছর আমাদের হাতে ২০ থেকে ২৫ লক্ষ মেট্রিক টন উদ্বৃত্ত আলু থেকে যাচ্ছে। এই উদ্বৃত্ত উৎপাদন যখন যথাযথভাবে সংরক্ষণ বা বাজারজাত করা যায় না, তখনই বাজারে ধস নামে। আমরা প্রায়শই সংবাদপত্রে দেখি, আলু বিক্রি করে হিমাগারের ভাড়াই পরিশোধ করতে পারছেন না কৃষক। অনেক ক্ষেত্রে রাস্তায় আলু ফেলে দিয়ে প্রতিবাদ জানানো হয়। এই ট্র্যাজেডির মূল কারণ হলো একটি সমন্বিত ও আধুনিক বিপণন কাঠামোর অভাব। আমরা উৎপাদন করতে শিখেছি, কিন্তু সেই উৎপাদনকে সম্পদে রূপান্তরের যে ব্যবসায়িক ও শিল্পায়ন প্রক্রিয়া, তাতে অনেক পিছিয়ে আছি। আলুর এই বাম্পার ফলনকে যদি একটি আশীর্বাদে রূপান্তর করতে হয়, তবে রপ্তানিকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের আলুর বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও আমাদের রপ্তানি আয় এখনো প্রত্যাশার তুলনায় নগণ্য। মধ্যপ্রাচ্য, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোতে আমাদের আলুর চাহিদা রয়েছে। এমনকি রাশিয়ার মতো বিশাল বাজারেও বাংলাদেশের আলু প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এখানে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ফাইটোস্যানিটারি বা উদ্ভিদ সংগনিরোধ সনদ এবং আলুর গুণগত মান। বৈশ্বিক বাজারে আলু রপ্তানির জন্য নির্দিষ্ট কিছু মানদ- অনুসরণ করতে হয়। আমাদের দেশে উৎপাদিত বেশিরভাগ আলুর জাত মূলত রান্নায় ব্যবহারের জন্য বা টেবিল পটেটো হিসেবে জনপ্রিয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির জন্য রোগমুক্ত, সুষম আকৃতির এবং দীর্ঘসময় সতেজ থাকে এমন আলুর প্রয়োজন। এছাড়া চিপস বা ফ্রেঞ্চ ফ্রাই তৈরির জন্য যেসব জাত দরকার, আমাদের দেশে তার চাষ এখনো পর্যাপ্ত নয়। এ জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন। কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমন জাত উদ্ভাবন ও কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে হবে যা সরাসরি বিশ্ববাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এছাড়া ‘গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস’ (জিএপি) বা উত্তম কৃষিচর্চা নিশ্চিত করা জরুরি। চাষের প্রতিটি ধাপে রাসায়নিক সারের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা গেলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো কঠোর মানদ-ের বাজারেও আমাদের আলুর জয়জয়কার শুরু হবে।
রপ্তানির পাশাপাশি আলুর বহুমুখী ব্যবহার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পস্থাপন হবে এই খাতের গেম চেঞ্জার। উন্নত বিশ্বে উৎপাদিত আলুর একটি বড় অংশ প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি করা হয়। আমরা যদি আলুকে কেবল তরকারির উপাদান হিসেবে দেখি, তবে এর বাণিজ্যিক মূল্য সীমাবদ্ধ থাকবেই। কিন্তু আলুকে যখন ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, পটেটো ফ্ল্যাক্স, স্টার্চ বা চিপস-এ রূপান্তর করা হয়, তখন এর আর্থিক মূল্য কয়েক গুণ বেড়ে যায়। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান শহরায়ন এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে প্রক্রিয়াজাত খাবারের বাজার দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে আমরা চিপস বা পটেটো স্টার্চের জন্য অনেক ক্ষেত্রে আমদানির ওপর নির্ভরশীল। অথচ দেশে প্রচুর পরিমাণে আলু উৎপাদিত হচ্ছে। দেশে যদি ছোট ও মাঝারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত স্টার্চ ফ্যাক্টরি এবং চিপস তৈরির প্ল্যান্ট গড়ে তোলা যায়, তবে একদিকে যেমন আমদানি ব্যয় কমবে, অন্যদিকে পচনশীল এই পণ্যের অপচয় শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। এটি শুধু কৃষকের দাম নিশ্চিত করবে না, বরং গ্রামীণ জনপদে হাজার হাজার বেকার তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার এটাই সবচেয়ে বড় সুযোগ।
আলু চাষের আরেকটি বড় সংকট হলো সংরক্ষণ ব্যবস্থা বা হিমাগার সমস্যা। দেশে যে পরিমাণ হিমাগার রয়েছে, তা শুধু পরিমাণের দিক থেকেই অপর্যাপ্ত নয়, বরং গুণগত দিক থেকেও সেকেলে। বেশিরভাগ হিমাগার শুধুমাত্র খাওয়ার আলুর জন্য উপযোগী। কিন্তু বীজ আলু বা প্রক্রিয়াজাতকরণের উপযোগী আলু সংরক্ষণের জন্য যে বিশেষায়িত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রয়োজন, তার অভাব প্রকট। এছাড়া হিমাগারের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ মূলত বড় বড় ব্যবসায়ীদের হাতে। ফলে মৌসুমের সময় যখন আলুর দাম কম থাকে, তখন প্রান্তিক কৃষকরা বাধ্য হয়ে কম দামে ফড়িয়াদের কাছে আলু বিক্রি করে দেন। সরকার যদি সমবায় ভিত্তিতে বা উপজেলা পর্যায়ে কৃষিবান্ধব সরকারি হিমাগার স্থাপন করতে পারে, তবে কৃষক সরাসরি সেখানে পণ্য রেখে সময়মতো বাজারে ছাড়তে পারত। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমত এবং কৃষক তার ফসলের ন্যায্য ভাগ পেত। আধুনিক ‘মাল্টিপারপাস কোল্ড স্টোরেজ’ নির্মাণে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কর রেয়াত বা সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে এই অবকাঠামোগত সংকট দূর করা সম্ভব।
বীজ আলুর সংকট ও উচ্চমূল্য আলু চাষিদের জন্য একটি বড় মাথাব্যথার কারণ। প্রতি বছর রোপণ মৌসুমে মানসম্মত বীজের জন্য কৃষকদের হাহাকার করতে দেখা যায়। বিএডিসি চাহিদার একটি অংশ পূরণ করলেও বড় একটি অংশ বেসরকারি আমদানিকারক ও স্থানীয় বীজের ওপর নির্ভর করে। অনেক সময় অসাধু সিন্ডিকেট বীজের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কৃষকদের পকেট কাটে। নিম্নমানের বীজের কারণে ফলন বিপর্যয়ের ঘটনাও বিরল নয়। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে বীজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। টিস্যু কালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে উন্নত মানের ভাইরাসযুক্ত বীজ উৎপাদন করে তা ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষকদের কাছে সুলভে পৌঁছে দিতে হবে। বীজ উৎপাদনে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা দিলে তারা নিজেরাই নিজেদের বীজের জোগান দিতে পারবে, যা উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনবে।
আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের খাদ্যতালিকায় আলুর অবস্থান মূলত সবজি হিসেবেই। কিন্তু দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও ধানের ওপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ কমাতে আলুকে ভাতের বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় করা প্রয়োজন। চালের তুলনায় আলু অনেক বেশি পুষ্টিকর এবং এতে কার্বোহাইড্রেটের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ রয়েছে। সরকারিভাবে প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে যদি আলুর বহুমুখী ব্যবহার খাদ্যাভ্যাসে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তবে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়বে এবং খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে। তবে সব পরিকল্পনার মূলে থাকতে হবে কৃষকের স্বার্থ রক্ষা। কৃষিবান্ধব ঋণ সহজলভ্য করা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় কৃষকদের বিমা সুবিধার আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি। আধুনিক প্রযুক্তি যেমন- ড্রোন দিয়ে বালাই দমন, মাটি পরীক্ষা এবং ডিজিটাল বিপণন ব্যবস্থার প্রয়োগ আলু চাষকে আরও স্মার্ট ও লাভজনক করে তুলবে।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের আলুচাষি তার সামর্থ্যরে সর্বোচ্চ প্রমাণ দিয়েছে মাঠের ফলনে। এখন বল নীতিনির্ধারক ও বিনিয়োগকারীদের কোর্টে। আলুকে শুধু একটি পচনশীল কৃষি পণ্য হিসেবে না দেখে একে একটি শক্তিশালী ‘শিল্প কাঁচামাল’ এবং ‘রপ্তানি পণ্য’ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আমাদের পাশের দেশগুলো যেখানে আলু রপ্তানি করে বিলিয়ন ডলার আয় করছে, সেখানে আমাদের পিছিয়ে থাকার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। সঠিক পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিকাশ ঘটাতে পারলে আলু হবে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ‘গার্মেন্টস সেক্টর’।
সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং বেসরকারি খাতের সৃজনশীল উদ্যোগের সমন্বয়ে আলু চাষের এই বিপ্লবকে টেকসই সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি। মাঠের কৃষকের ঘাম আর শ্রম তখনই সার্থক হবে, যখন বাংলাদেশের আলু বিশ্ববাজারের সুপারশপগুলোতে গর্বের সঙ্গে জায়গা করে নেবে। আলুর সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে একটি সমৃদ্ধ কৃষিনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার এখনই মাহেন্দ্রক্ষণ।
ওসমান গনি
লেখক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট