ঢাকা সোমবার, ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ২৮ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

সরকারি হাসপাতালের বেহাল দশা

সরকারি হাসপাতালের বেহাল দশা

একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো নাগরিকের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। আমাদের সংবিধানেও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নকে রাষ্ট্রের প্রাথমিক কর্তব্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর যে চিত্র প্রতিনিয়ত সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং সাধারণ মানুষের জন্য চরম হতাশার। সিংহভাগ সরকারি হাসপাতালে সেবার চেয়ে ভোগান্তিই এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসার খোঁজে আসা অসহায় মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠছে হাসপাতালের করিডোরগুলো, অথচ এর প্রতিকার যেন কোথাও নেই।

সরকারি হাসপাতালের এই দুরবস্থার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় অব্যবস্থাপনা এবং শেকড় গেড়ে বসা দুর্নীতিকে। দেশের বড় বড় বিশেষায়িত হাসপাতাল থেকে শুরু করে জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স- সর্বত্রই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। রোগীদের শয্যা পাওয়া থেকে শুরু করে ট্রলি বা স্ট্রেচার পাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে বকশিশ বা ঘুসের লেনদেন এখন ‘ওপেন সিক্রেট’। হাসপাতালের একশ্রেণির অসাধু কর্মচারী এবং বাইরের দালালের যোগসাজশে সাধারণ রোগীরা প্রতিনিয়ত জিম্মি হয়ে পড়ছে।

আরেকটি ভয়াবহ চিত্র হলো সরকারি কোটি কোটি টাকা খরচ করে কেনা জীবনরক্ষাকারী যন্ত্রপাতির অচল অবস্থা। দেশের অনেক হাসপাতালেই এক্স-রে, সিটি স্ক্যান বা এমআরআই মেশিন মাসের পর মাস বিকল হয়ে পড়ে থাকে। অভিযোগ আছে, বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর সাথে কমিশন বাণিজ্যের স্বার্থে হাসপাতালের ভেতরের যন্ত্রপাতিগুলোকে কৃত্রিমভাবে অচল করে রাখা হয়। ফলে নিরুপায় হয়ে দরিদ্র রোগীদের চড়া দামে বাইরে থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়, যা অনেকের সামর্থ্যরে বাইরে।

বাংলাদেশের জনসংখ্যা অনুপাতে চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা এমনিতেই অপ্রতুল। তার ওপর সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডাক্তারদের উপস্থিতির হার নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদে চিকিৎসকদের কর্মস্থলে না থাকা এক নিয়মিত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। অনেক সময় দেখা যায়, ইন্টার্ন চিকিৎসক বা নার্সদের ওপর ভরসা করেই চলে বড় বড় ইউনিটের চিকিৎসা। এতে করে চিকিৎসার মান যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, তেমনি ভুল চিকিৎসার ঝুঁকিও বাড়ছে।

হাসপাতালগুলোর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। ওয়ার্ডগুলোর মেঝেতে ময়লা-আবর্জনা, শৌচাগারগুলোর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং ওয়ার্ডে দুর্গন্ধের কারণে সুস্থ মানুষেরও অসুস্থ হয়ে পড়ার উপক্রম হয়। শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় মেঝেতে, বারান্দায় এমনকি সিঁড়ির নিচেও রোগীদের শুয়ে থাকতে দেখা যায়। ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি যেখানে উপেক্ষিত, সেখানে উন্নত চিকিৎসাসেবা পাওয়া এক প্রকার অলীক কল্পনা।

সরকারি হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে ওষুধ পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ওষুধ সংকটের অজুহাতে রোগীদের প্রেসক্রিপশনের সিংহভাগই বাইরে থেকে কিনতে হয়। অথচ প্রায়ই খবর পাওয়া যায়, সরকারি গুদাম থেকে বিপুল পরিমাণ ওষুধ কালোবাজারে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি সাধারণ মানুষের কোনো কাজেই আসছে না। শুধু ওষুধ নয়, অনেক সময় সিরিঞ্জ, স্যালাইন বা গজ-ব্যান্ডেজের মতো প্রাথমিক সরঞ্জামও রোগীদের নিজ খরচায় সংগ্রহ করতে হয়।

উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও বিশেষজ্ঞ ডাক্তার না থাকায় সাধারণ সর্দি-জ্বরেও রোগীরা জেলা বা বিভাগীয় হাসপাতালে ভিড় জমায়। একটি কার্যকর ‘রেফারেল সিস্টেম’ না থাকায় বড় হাসপাতালগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে, যার ফলে চিকিৎসকরা মানসম্মত সময় দিতে পারছেন না। অন্যদিকে, বিত্তবানরা সামান্য অসুস্থতায় বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন কিংবা ব্যয়বহুল বেসরকারি হাসপাতালে যাচ্ছেন। মাঝখানে পিষ্ট হচ্ছে- দেশের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষ, যাদের শেষ আশ্রয়স্থল এই সরকারি হাসপাতালগুলো।

সরকারি হাসপাতালের এই দুরবস্থা রাতারাতি পরিবর্তন সম্ভব নয়, তবে সদিচ্ছা থাকলে সংস্কার অসম্ভবও নয়। সরকারকে প্রথমেই স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করে হাসপাতালের কেনাকাটা ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে হবে।

জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সারপ্রাইজ ভিজিট বা আকস্মিক পরিদর্শনের মাধ্যমে চিকিৎসকদের উপস্থিতি ও যন্ত্রপাতির সচলতা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা শুধু রাজধানীমুখী না রেখে বিভাগীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে যাতে ঢাকার ওপর চাপ কমে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে সিরিয়াল ও শয্যা বরাদ্দ নিশ্চিত করে দালালের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে। হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। রোগীদের অভিযোগ জানানোর জন্য কার্যকর একটি সেল গঠন করা জরুরি।

একটি দেশের উন্নতির মাপকাঠি শুধু তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, বরং তার সাধারণ মানুষের গড় আয়ু ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার মান।

সাধারণ মানুষ ট্যাক্স দেয় এই আশায় যে, বিপদের সময় রাষ্ট্র তাদের পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু সরকারি হাসপাতালের বর্তমান চিত্র সেই বিশ্বাসের পরিপন্থি। স্বাস্থ্যসেবা কোনো করুণা নয়, এটি নাগরিকের অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করতে হলে স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। সময় এসেছে নীতিনির্ধারকদের এই জরাজীর্ণ স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করার, নতুবা সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আর দীর্ঘশ্বাস একসময় বড় ধরনের সামাজিক সংকটের সৃষ্টি করতে পারে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত