ঢাকা বুধবার, ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ৭ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

প্লাস্টিকনির্ভর জীবনযাপন ও জনস্বাস্থ্য সংকট

আল শাহারিয়া
প্লাস্টিকনির্ভর জীবনযাপন ও জনস্বাস্থ্য সংকট

আধুনিক সভ্যতাকে যদি একটি মাত্র উপাদানে সংজ্ঞায়িত করতে বলা হয়, তবে সেটি নিঃসন্দেহে প্লাস্টিক। সকালের ঘুম থেকে ওঠার পর টুথব্রাশটি হাতে নেওয়া থেকে শুরু করে রাতে ঘুমানোর আগে পানির বোতলটি পর্যন্ত আমাদের দিনের প্রতিটি মুহূর্ত প্লাস্টিকের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। একসময় যা ছিল বিজ্ঞানের বিস্ময়কর আবিষ্কার আজ তা মানবসভ্যতার জন্য এক অস্তিত্বের সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা এমন এক জীবনব্যবস্থা গড়ে তুলেছি যেখানে প্লাস্টিক ছাড়া একটি দিন কল্পনা করাও কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু এই সহজলভ্য ও সস্তা উপাদানটি আমাদের অজান্তেই শরীরের ভেতর এক ভয়াবহ বিষক্রিয়া ছড়িয়ে দিচ্ছে। প্লাস্টিক দূষণকে আমরা এতদিন শুধু পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখে এসেছি। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞান ও সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো বলছে এটি এখন আর শুধু পরিবেশের ক্ষতি করছে না বরং সরাসরি জনস্বাস্থ্যের ওপর বড় ধরনের আঘাত হানছে।

প্লাস্টিকের ওপর আমাদের এই নির্ভরতা একদিনে তৈরি হয়নি। এর স্থায়িত্ব এবং কম খরচের কারণে এটি দ্রুতই কাচ বা মাটির মতো প্রাকৃতিক উপাদানগুলোকে বাজার থেকে সরিয়ে দিয়েছে। আমরা বাজার করতে গেলে পলিথিন চাই এবং পানি খেতে গেলে প্লাস্টিকের বোতল খুঁজি। এই স্বাচ্ছন্দ্য আমাদের অন্ধ করে রেখেছে। আমরা ভুলে গেছি যে প্লাস্টিক পচনশীল নয়। এটি প্রকৃতিতে মিশে যেতে শত শত বছর সময় নেয়। কিন্তু আসল ভয়ের কারণ দৃশ্যমান প্লাস্টিক বর্জ্য নয় বরং অদৃশ্য মাইক্রোপ্লাস্টিক। বড় প্লাস্টিক ভেঙে যখন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয় তখন তাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। এই কণাগুলো এতটাই ছোট যে তা খালি চোখে দেখা যায় না। বাতাসের মাধ্যমে বা পানির সঙ্গে মিশে এগুলো আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় মানুষের রক্তে এবং এমনকি মাতৃগর্ভে থাকা ভ্রূণের প্লাসেন্টাতেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এর অর্থ হলো জন্মের আগেই একটি শিশু প্লাস্টিক দূষণের শিকার হচ্ছে যা মানবজাতির ভবিষ্যতের জন্য এক অশনি সংকেত।

খাদ্যশৃঙ্খলে প্লাস্টিকের অনুপ্রবেশ এখন এক প্রমাণিত সত্য। আমরা যেসব সামুদ্রিক মাছ বা মিঠা পানির মাছ খাই সেগুলোর পেটে প্লাস্টিকের কণা পাওয়া যাচ্ছে। নদী ও সাগরে ফেলা প্লাস্টিক বর্জ্য মাছের শরীরে ঢুকছে এবং মাছের মাধ্যমে তা মানুষের শরীরে আসছে। এছাড়া লবণের দানা থেকে শুরু করে বোতলজাত পানীয় জলেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব মিলেছে। আমরা যখন প্লাস্টিকের পাত্রে গরম খাবার খাই বা প্লাস্টিকের কাপে চা পান করি তখন তাপের সংস্পর্শে এসে প্লাস্টিক থেকে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ খাবারের সঙ্গে মিশে যায়। বিসফেনল-এ বা বিপিএ এবং থ্যালেটস নামক রাসায়নিকগুলো হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। চিকিৎসকরা বলছেন বর্তমান সময়ে প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস এবং থাইরয়েডের সমস্যার পেছনে এই রাসায়নিকগুলোর বড় ভূমিকা রয়েছে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এসব রাসায়নিক ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

আমাদের দেশে প্লাস্টিক ব্যবহারের ধরনটি জনস্বাস্থ্যের জন্য আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। রেস্তোরাঁ থেকে গরম ঝোল বা তরকারি পলিথিনে করে বাড়িতে নিয়ে আসার দৃশ্য খুবই সাধারণ। নিম্নমানের পলিথিনে গরম খাবার রাখার ফলে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে যা খাবারকে বিষাক্ত করে তোলে। এছাড়া ওয়ান-টাইম প্লেট ও গ্লাসের ব্যবহার মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। এগুলো ব্যবহারের পর যত্রতত্র ফেলা হয়। শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ এই প্লাস্টিক বর্জ্য। যখনই একটু বৃষ্টি হয় তখনই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় এবং নোংরা পানি রাস্তায় উঠে আসে। এই জমা পানিতে মশা জন্মায় যা ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার মতো মশাবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ায়। অর্থাৎ প্লাস্টিক বর্জ্য পরোক্ষভাবে সংক্রামক ব্যাধি বিস্তারেও সহায়তা করছে। জলাবদ্ধতার কারণে পানির সঙ্গে পয়ঃবর্জ্য মিশে টাইফয়েড ও কলেরার মতো পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ে। শহরের মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে এই প্লাস্টিক জট বা বর্জ্য অব্যবস্থাপনা সরাসরি দায়ী।

প্লাস্টিক পোড়ানোর ফলে যে বায়ুদূষণ হয় তা জনস্বাস্থ্যের জন্য আরেক বড় হুমকি। অনেক সময় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে স্তূপ করে রাখা প্লাস্টিক পুড়িয়ে ফেলা হয়। প্লাস্টিক পোড়ালে ডাইঅক্সিন ও ফিউরানের মতো বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়।

এই গ্যাস ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি করে এবং শ্বাসকষ্টজনিত রোগ সৃষ্টি করে। যারা দীর্ঘসময় ধরে এই দূষিত বাতাসে শ্বাস নেন তাদের ফুসফুসের ক্যান্সার ও হৃদরোগের ঝুঁকি সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি থাকে। বিশেষ করে শিশুদের ওপর এর প্রভাব অত্যন্ত নেতিবাচক। তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং তারা ঘন ঘন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে ভোগে। আমাদের শহরের বাতাস এমনিতেই দূষিত তার ওপর প্লাস্টিক পোড়ানোর ধোঁয়া সেই দূষণকে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে।

অর্থনৈতিক সাশ্রয়ের কথা ভেবে আমরা প্লাস্টিক ব্যবহার করি; কিন্তু এর স্বাস্থ্যগত মূল্য অনেক বেশি। একজন ক্যান্সার বা কিডনি রোগীর চিকিৎসার খরচ বহন করতে গিয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়। প্লাস্টিক দূষণজনিত রোগের কারণে জাতীয় স্বাস্থ্য খাতে যে চাপ পড়ে তা অর্থনীতির জন্য এক বিশাল বোঝা। সস্তা প্লাস্টিকের খেসারত দিতে হচ্ছে আমাদের শরীর ও সম্পদ দিয়ে। অথচ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এই স্বাস্থ্যব্যয়ের বিষয়টি খুব একটা গুরুত্ব পায় না। প্লাস্টিক শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়িক স্বার্থ অনেক সময় জনস্বাস্থ্যের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে আমরা একটি অসুস্থ প্রজন্ম তৈরি করব যারা জন্মগতভাবেই নানা শারীরিক জটিলতা বহন করবে।

প্লাস্টিকের বিকল্প নিয়ে কথা বলা হলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ খুব একটা দেখা যায় না। পাটের সোনালি ব্যাগ বা কাপড়ের ব্যাগের কথা শোনা গেলেও বাজারে তার উপস্থিতি নগণ্য। এর প্রধান কারণ হলো প্লাস্টিকের সহজলভ্যতা এবং বিকল্প পণ্যের উচ্চমূল্য। সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়েই প্লাস্টিক ব্যবহার করছে। তবে এখানে সচেতনতার অভাবও প্রকট। অনেকেই মনে করেন তিনি একা পলিথিন বর্জন করলে কী বা লাভ হবে। এই মানসিকতা পরিবর্তন করা জরুরি। প্লাস্টিক সমস্যাটি শুধু সরকারের একার পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। এটি একটি সামাজিক ব্যাধি এবং এর নিরাময়ে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। বাজার করতে যাওয়ার সময় কাপড়ের ব্যাগ সঙ্গে নিয়ে যাওয়া বা প্লাস্টিকের বোতলের বদলে কাচ বা ধাতব বোতল ব্যবহার করার মতো ছোট ছোট অভ্যাস বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহারকে অনেকে সমাধান হিসেবে দেখেন; কিন্তু এটি আসলে সমস্যার খুব সামান্যই সমাধান করতে পারে। উৎপাদিত প্লাস্টিকের খুব কম অংশই আসলে রিসাইকেল করা হয়। বাকিটা প্রকৃতিতেই থেকে যায়। তাছাড়া প্লাস্টিক অনির্দিষ্টকাল ধরে রিসাইকেল করা যায় না। কয়েকবার রিসাইকেল করার পর তা ব্যবহারের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত বর্জ্য হিসেবেই জমা হয়। তাই সমাধানের মূল পথ হলো প্লাস্টিকের উৎপাদন ও ব্যবহার কমানো। সার্কুলার ইকোনমি বা বৃত্তাকার অর্থনীতির ধারণাকে কাজে লাগিয়ে এমন পণ্য তৈরি করতে হবে যা বারবার ব্যবহার করা যায় এবং পরিবেশের ক্ষতি করে না। সুপারমার্কেটগুলোতে প্লাস্টিক প্যাকেজিংয়ের ব্যবহার কমাতে কঠোর আইন প্রয়োগ করা প্রয়োজন। যেসব পণ্য সহজে পচনশীল উপাদানে প্যাকেট করা সম্ভব সেখানে প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করতে হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবার থেকে প্লাস্টিকবিরোধী সচেতনতা তৈরি করতে হবে। শিশুদের বোঝাতে হবে যে প্লাস্টিকের চিপসের প্যাকেট বা জুসের স্ট্র শুধু আবর্জনা নয় বরং এটি তাদের স্বাস্থ্যের শত্রু। আমাদের পাঠ্যপুস্তকে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর প্লাস্টিকের প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা থাকা উচিত। তরুণ প্রজন্ম যদি প্লাস্টিকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন হয়, তবে ভবিষ্যতে তারা পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনে অভ্যস্ত হবে। এছাড়া প্লাস্টিক দূষণের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। পাড়া বা মহল্লায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, যেখানে পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য আলাদা করা হবে।

সরকারের পক্ষ থেকেও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। ২০০২ সালে বাংলাদেশ পলিথিন নিষিদ্ধকারী প্রথম দেশগুলোর একটি ছিল। কিন্তু সেই আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকায় আজ পলিথিন সর্বত্র। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং নিষিদ্ধ পলিথিন উৎপাদন ও বিপণন বন্ধে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব পণ্য উৎপাদনকারীদের কর ছাড় ও ভর্তুকি দিতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ কম দামে বিকল্প পণ্য কিনতে পারে। প্লাস্টিক শিল্পের ওপর উচ্চ হারে কার্বন ট্যাক্স বা পরিবেশ কর আরোপ করা যেতে পারে যা দূষণ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে।

প্রকৃতি আমাদের যা দিয়েছে তার প্রতিটি উপাদানের একটি নির্দিষ্ট চক্র আছে। কিন্তু মানুষ ল্যাবরেটরিতে এমন এক উপাদান তৈরি করেছে, যা প্রকৃতির এই চক্রকে ভেঙে দিয়েছে। প্লাস্টিক এমন এক অতিথি যা একবার আসলে আর যেতে চায় না। আমাদের সুবিধাবাদী মানসিকতা আজ আমাদেরই গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখনই যদি আমরা প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারি তবে অদূর ভবিষ্যতে পৃথিবী একটি বিশাল প্লাস্টিকের ভাগাড়ে পরিণত হবে। তখন বিশুদ্ধ বাতাস বা নিরাপদ খাবার পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে। আমাদের নিজেদের স্বার্থেই এই আত্মঘাতী পথ থেকে সরে আসতে হবে। সাময়িক সুবিধার জন্য আমরা নিজেদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন বিপন্ন করতে পারি না।

এটি স্পষ্ট যে প্লাস্টিক সংকট এখন আর শুধু পরিবেশবাদীদের আলোচনার বিষয় নয়। এটি একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকট। আমাদের শরীর ও রক্তে প্লাস্টিকের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে আমরা বিপৎসীমা অতিক্রম করে ফেলেছি। এখন আর সতর্ক হওয়ার সময় নেই বরং এখন সময় প্রতিরোধের। জীবনযাত্রার ধরন পরিবর্তন করা কঠিন হতে পারে; কিন্তু অসম্ভব নয়। কাচ, মাটি, পাট ও ধাতব পণ্যের ব্যবহার ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে আমরা প্লাস্টিকের শিকল ভাঙতে পারি। একটি সুস্থ ও সুন্দর পৃথিবীর জন্য প্লাস্টিকমুক্ত জীবনযাপন শুধু একটি স্লোগান নয় বরং এটি বাঁচার একমাত্র উপায়। নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে আমাদের এই প্লাস্টিক মহামারি থেকে রক্ষা করতে। আসুন আমরা প্লাস্টিককে না বলি এবং জীবনের জয়গান গাই।

আল শাহারিয়া

শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত