ঢাকা বুধবার, ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ৭ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ডিজিটাল জুয়ার মরণনেশা ও মধ্যবিত্তের নিঃশব্দ সর্বনাশ

জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন
ডিজিটাল জুয়ার মরণনেশা ও মধ্যবিত্তের নিঃশব্দ সর্বনাশ

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের ধরন বদলেছে। এক সময় জুয়া মানেই ছিল নির্দিষ্ট কোনো আস্তানায় তাসের আড্ডা, কিন্তু এখন তা হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোনের অ্যাপে বন্দি। এই ‘ডিজিটাল জুয়া’ বর্তমানে মধ্যবিত্ত সমাজের জন্য এক ক্যান্সার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে অনলাইন বেটিং সাইট এবং ক্যাসিনো অ্যাপগুলোর সহজলভ্যতা মধ্যবিত্ত পরিবারের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। এই প্রতিবেদনে মধ্যবিত্তের সর্বনাশের পেছনের অন্ধকার চিত্রটি তুলে ধরা হলো।

নগরায়ন ও প্রযুক্তিগত ফাঁদ : মধ্যবিত্তের জীবনের স্বপ্ন থাকে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ, সন্তানদের সুশিক্ষা এবং সামাজিক মর্যাদা। কিন্তু দ্রুত বড়লোক হওয়ার নেশা আর চটকদার বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়ে অসংখ্য শিক্ষিত যুবক ও মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী অনলাইন জুয়ায় জড়িয়ে পড়ছে। অ্যাপগুলোর ইন্টারফেস এমনভাবে ডিজাইন করা হয়, যা শুরুতে সামান্য কিছু জয়ের স্বাদ দেয়। এই প্রাথমিক জয়ই মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয় এবং ব্যক্তিকে আসক্ত করে তোলে। এরপর শুরু হয় হারানোর পালা। জমানো সঞ্চয়, স্ত্রীর গয়না, এমনকি পৈত্রিক ভিটেমাটি পর্যন্ত বন্ধক রেখে জুয়ার টাকা যোগাড় করতে দেখা যাচ্ছে অনেককে।

অর্থনৈতিক চোরাবালি ও মুদ্রাস্ফীতি : বর্তমান বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মধ্যবিত্ত এমনিতেই দিশেহারা। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য রাখতে হিমশিম খাওয়া এই শ্রেণির মানুষ যখন জুয়ায় সব হারায়, তখন তারা বেছে নেয় সুদের টাকা বা ঋণের পথ। ব্যাংক লোন বা উচ্চ সুদে এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি শোধ করতে না পেরে অনেক পরিবার আজ পথে বসেছে। জুয়ার এই অর্থ দেশের বাইরে পাচার হয়ে যাচ্ছে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্যও একটি বড় হুমকি। মধ্যবিত্তের পকেট থেকে খসে যাওয়া প্রতিটি টাকা আসলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান ফেলছে।

সামাজিক মর্যাদা ও মানসিক বিপর্যয় : মধ্যবিত্তের প্রধান পুঁজি হলো তার সম্মান। জুয়ায় নিঃস্ব হওয়ার খবর যখন জানাজানি হয়, তখন আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন এই মানুষগুলো চরম মানসিক অবসাদে ভোগে। পারিবারিক কলহ, বিচ্ছেদ এমনকি আত্মহত্যার মতো ঘটনাও এখন নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, মধ্যবিত্ত সমাজ যখন নৈতিকভাবে স্খলিত হয়, তখন পুরো রাষ্ট্রের কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। জুয়া শুধু টাকা কেড়ে নিচ্ছে না, এটি একটি প্রজন্মের কর্মস্পৃহা এবং নীতিবোধকেও ধ্বংস করে দিচ্ছে।

প্রতিরোধের আবশ্যকতা : এই সর্বনাশ রুখতে শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যথেষ্ট নয়। ইন্টারনেটে জুয়ার সাইটগুলো ব্লক করার পাশাপাশি ব্যাপক জনসচেতনতা প্রয়োজন। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সুস্থ যোগাযোগ এবং ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। বিশেষ করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের স্মার্টফোন ব্যবহারের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে। মধ্যবিত্ত যদি এই মরণনেশা থেকে বের হতে না পারে, তবে আগামী দিনে দেশের সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন

শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত