ঢাকা বুধবার, ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ৭ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

বেপরোয়া বাইকে জনদুর্ভোগ

বেপরোয়া বাইকে জনদুর্ভোগ

বাংলাদেশের সড়ক যোগাযোগব্যবস্থায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এক ভয়াবহ বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালনা এবং নিয়মবহির্ভূত ওভারটেকিং। একসময় মোটরসাইকেলকে যানজটমুক্ত দ্রুত যাতায়াতের আশীর্বাদ মনে করা হলেও, বর্তমানে এটি সাধারণ পথচারী ও যাত্রীসাধারণের জন্য চরম আতঙ্কের ও দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়কের শৃঙ্খলা এখন শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ; বাস্তবে রাজপথগুলো যেন একেকটি মৃত্যুপুরী, যেখানে গতির নেশা আর নিয়মহীনতার রাজত্ব চলছে।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, দেশে সংঘটিত সড়ক দুর্ঘটনার একটি বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে মোটরসাইকেল। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ‘স্পিড’ বা গতির যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা দেখা যায়, তা কেবল তাদের নিজেদের জীবনকেই বিপন্ন করছে না, বরং পুরো সড়ক ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। ফুটপাত দিয়ে বাইক চালানো, উল্টো পথে গমন এবং ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কিশোর ও তরুণরা লাইসেন্স ছাড়াই দ্রুতগতির বাইক নিয়ে সড়কে নেমে পড়ছে, যাদের মধ্যে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান বা শ্রদ্ধাবোধ নেই।

সড়কে বিশৃঙ্খলার আরেকটি প্রধান কারণ হলো অসম ও বিপদজনক ওভারটেকিং। বাস, ট্রাক থেকে শুরু করে ছোট যানবাহন- সবার মধ্যেই আগে যাওয়ার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা পরিলক্ষিত হয়। বাঁক কিংবা সরু রাস্তায় যেখানে ওভারটেকিং নিষিদ্ধ, সেখানেও চালকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অন্য যানবাহনকে অতিক্রম করার চেষ্টা করেন। বিশেষ করে মহাসড়কগুলোতে দুই বা ততধিক যানের এই ওভারটেকিং প্রতিযোগিতার কারণে মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে অহরহ। এতে প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ, আর পঙ্গুত্ব বরণ করে দুর্বিষহ জীবন পার করছে হাজারও পরিবার।

বেপরোয়া বাইক চালনা ও যত্রতত্র ওভারটেকিংয়ের ফলে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরা আজ চরমভাবে বিঘ্নিত। পথচারীরা ফুটপাতেও আজ নিরাপদ নয়। বাইকারদের হর্ন আর দ্রুতগতির সশব্দ উপস্থিতিতে বয়স্ক ও শিশুরা মানসিকভাবে আতঙ্কিত থাকে। এছাড়া, সড়কে ছোটখাটো দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রায়ই কথা কাটাকাটি ও মারামারির ঘটনা ঘটে, যা দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি করে সাধারণ মানুষের মূল্যবান সময় নষ্ট করে। সড়কের এই অরাজকতায় মানুষের মনে এক ধরনের স্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।

প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক- সড়কে এত আইন থাকতেও কেন এই বিশৃঙ্খলা? ট্রাফিক পুলিশের কড়াকড়ি থাকলেও তা যেন শুধু নির্দিষ্ট কিছু স্থানেই সীমাবদ্ধ। হেলমেট ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হলেও গতির নিয়ন্ত্রণ কিংবা লেনে চলাচলের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব স্পষ্ট। এছাড়া, রাজনৈতিক প্রভাব বা স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে ট্রাফিক আইন অমান্য করার সংস্কৃতিও এই বেপরোয়া মনোভাবকে উসকে দিচ্ছে। লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব এবং ভুয়া লাইসেন্সধারী চালকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় সড়ক আজ এক অনিরাপদ চত্বরে পরিণত হয়েছে। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, বরং সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন।

লাইসেন্সবিহীন চালক এবং নিয়ম ভঙ্গকারী বাইকারদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ছাড় না দিয়ে আইন প্রয়োগ করতে হবে। বিশেষ করে ফুটপাতে বাইক চালানো এবং উল্টো পথে চলার জন্য তাৎক্ষণিক জরিমানার পাশাপাশি লাইসেন্স বাতিলের বিধান কার্যকর করতে হবে। শহরের ভেতরে এবং জনাকীর্ণ এলাকায় মোটরসাইকেলের গতিসীমা নির্দিষ্ট করে দিতে হবে এবং সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কিশোর-তরুণদের নিরাপদ সড়ক ব্যবহারের শিক্ষা দিতে হবে। গতির নেশা যে বীরত্ব নয় বরং বোকামি, তা তাদের অনুধাবন করাতে হবে। মহাসড়কগুলোতে লেন বিভাজন এবং ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে ওভারটেকিংয়ের প্রয়োজন কমে আসে।

সড়ক কোনো মরণফাঁদ হতে পারে না। একটি স্বাধীন ও সভ্য দেশে মানুষের নিরাপদে চলাচলের অধিকার মৌলিক অধিকারের সমতুল্য। বেপরোয়া বাইক চালনা আর নিয়মবহির্ভূত ওভারটেকিংয়ের মাধ্যমে যারা সড়কের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে, তাদের কঠোর হাতে দমন করা এখন সময়ের দাবি। প্রশাসনের নজরদারি আর চালকদের দায়িত্বশীলতাই পারে আমাদের সড়কগুলোকে আবার নিরাপদ করে তুলতে। আমরা আর কোনো ‘সড়ক দুর্ঘটনা’ নয়, বরং ‘সড়ক নিরাপত্তা’ দেখতে চাই।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত