ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ভলান্টিয়ারিজমের সমীকরণ : কেমন হবে আগামীর যুব নেতৃত্ব

মুহিবুল হাসান রাফি
ভলান্টিয়ারিজমের সমীকরণ : কেমন হবে আগামীর যুব নেতৃত্ব

ভলান্টিয়ারের অর্থ স্বেচ্ছায় কাজ করা। ভলান্টিয়ার বা স্বেচ্ছাসেবক হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি নিঃস্বার্থভাবে সমাজ, এলাকা বা রাষ্ট্রের কল্যাণে কাজ করেন। বর্তমান সময়ে একটা ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে ভলান্টিয়ারিজম। যে কেউ ভলান্টিয়ার হিসেবে নিজেকে দাবি করে বসে। অথচ প্রায় ৮৮ শতাংশ ভলান্টিয়ার জানে না ভলান্টিয়ার কি, কারা ভলান্টিয়ার, ভলান্টিয়ার কাকে বলে। এখানেই কি শেষ! এখনকার সময়ে ভলান্টিয়ার পাওয়া যায় দরপত্রে। যাতায়াত খরচ কিংবা উৎসাহ খরচ পেলে নিজেকে দাবি করে থাকে ভলান্টিয়ার হিসেবে। অথচ তাদের বিক্রি করে খাচ্ছে একদল শোষকশ্রেণির ভলান্টিয়ারগোষ্ঠী। যাতায়াত খরচ কিংবা উৎসাহ খরচের মাধ্যমে তাদের বশ করে নিচ্ছে নোংরা ভলান্টিয়ারিজমের সমীকরণে। সমাজে সত্যিকারের পরিবর্তন আসে নিজের উদ্যোগ, মানবিক চেতনা ও একতার মাধ্যমে। আর এগুলোর সত্যিকার পরিচয় বহন করে একজন প্রকৃত ভলান্টিয়ার। ভলান্টিয়াররা শুধু কাজ করে না, তারা পরিবর্তনের অন্যতম দূত। তাদের ক্ষুদ্র উদ্যোগে সমাজে জন্ম নেয় বড় রূপান্তর।

রিপোর্ট করলে দেখা যায়, চট্টগ্রাম এ মোট সংগঠন রয়েছে ৪৬৮টি। তন্মধ্যে সচল আছে ২৮৮টির মতো। সচলের মধ্যে থেকে সক্রিয়ভাবে কাজ করতেছে ১০৯টি সংগঠন।

সক্রিয় থাকলেও নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ার উপক্রম ৬৪টি সংগঠন। আর ৪৫টি সংগঠন চট্টগ্রামে কাজ করে যাচ্ছে আনাচে-কানাচে। তন্মেধ্যে, সুষ্ঠুভাবে কাজ করছে মাত্র ২২টি সংগঠন। যদি পুরো বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনা করা হয়, সেক্ষেত্রে রিপোর্ট দাঁড়ায় যা খুবই দুঃখজনক। পুরো বাংলাদেশে ভলান্টিয়ার সংগঠন রয়েছে ৯৬০টির ঊর্ধ্বে। যেখানে পরিপূর্ণ ভলান্টিয়ারিজম ধর্ম মেনে কাজ করে ১১৫টির মতো সংগঠন, যা মোট সংগঠনের ১২ শতাংশ। যদি নিখুঁতভাবে ভলান্টিয়ারিজম ধর্ম মেনে চলে সেক্ষেত্রে দাঁড়াই মোট সংগঠনের ৫ শতাংশ। বেশিরভাগ সংগঠন কাজ করে লোক দেখানোর জন্য, ব্র্যান্ড ভ্যালুর জন্য, প্রচারণার জন্য। এতেই কি শেষ? অনেকে তো রীতিমতো ভলান্টিয়ার সংগঠন থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা।

স্বেচ্ছাসেবকতা বা ভলান্টিয়ারিজম কোনো নতুন ধারণা নয়, মানুষের মানবিক প্রবণতা থেকে উদ্ভূত এই চর্চা সময়ের সঙ্গে ভিন্ন রূপে বিকশিত হয়েছে। তরুণদের মধ্যে সত্যিকারের মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা, সংগঠনগুলোর মধ্যে নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এবং পরিবার-সমাজের পক্ষ থেকে স্বেচ্ছাসেবার গুণাবলিকে সম্মান জানানো। একালের উন্নত দক্ষতা, প্রযুক্তি ও কাঠামো যদি সেকালের পবিত্র মানবিকতার সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে স্বেচ্ছাসেবকতা শুধু কাজের নাম হয়ে থাকবে না, এটি হয়ে উঠবে মানবিক মানুষ তৈরি করার শক্তিশালী মাধ্যম, যা সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবে আরও আলোকিত ভবিষ্যতের দিকে। ভলান্টিয়ারিজমের উন্নতির পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে। কোভিড-পরবর্তী সময়ে পেইড ভলান্টিয়ারিজমের প্রবণতা এবং সার্টিফিকেটকেন্দ্রিক দৌড় বেশি সংখ্যক সংগঠনে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা কখনও কখনও স্বেচ্ছাসেবার মানবিক উদ্দেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সুবিধা বা আর্থিক প্রত্যাশার কারণে তরুণদের একটি অংশ মূল মানবিকতার পথ থেকে কিছুটা বিচ্যুত হয়েছে, যা স্বেচ্ছাসেবকতার নৈতিক শক্তিকে দুর্বল করে।

ভলান্টিয়ারিজমে ডুকে পড়েছে নোংরা রাজনীতি। যার জন্য তৈরি হচ্ছে প্রতিনিয়ত অগণিত হলুদ নেতৃত্ব। দক্ষতা অনুযায়ী নেতৃত্ব যাচাই বাচাই করলে অনেক সংগঠন বিলুপ্তি হয়ে যাবে নিমিষেই। একদল শোষকশ্রেণির ভলান্টিয়ার গোষ্ঠী ভলান্টিয়ার সংগঠনগুলোকে পুঁজি করে রীতিমতো ব্যবসা খোলে বসেছে। অনেকেই কোনো স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমে যোগদানের আগে জানতে চান, কী ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে, খাবার বা ভাতা মিলবে কি না, কিংবা ভবিষ্যতে চাকরি বা অন্য কোনো সুযোগ পাওয়া যাবে কি না। এই মানসিকতা স্বেচ্ছাসেবার প্রকৃত উদ্দেশকে বিকৃত করছে। এছাড়া কিছু সংগঠন ‘ভলান্টিয়ার প্রোগ্রাম’ করার নামে তরুণদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে হাতিয়ে নিচ্ছে নগদ অর্থ। এতে শুধু অংশগ্রহণকারীরা প্রতারিত হচ্ছেন না, বরং স্বেচ্ছাসেবার মান ও বিশ্বাসযোগ্যতাও নষ্ট হচ্ছে। রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, দলীয় নিয়ন্ত্রণ, ব্যক্তিগত স্বার্থ অর্জন এবং প্রচারণার মাধ্যম হিসেবে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো ব্যবহার করার প্রবণতা বাড়লে সৎ ও নিবেদিত স্বেচ্ছাসেবকদের হতাশা তৈরি হয়। এর ফলে গড়ে ওঠে অবিশ্বাস, সংগঠনের সুনাম নষ্ট হয় এবং সমাজসেবামূলক কাজের প্রকৃত উদ্দেশ বাধাগ্রস্ত হয়। প্রতিকারের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

একজনে অনেকগুলো সংগঠন নিয়ন্ত্রণ করা,ফলে যেমন সিভি পূর্ণ হচ্ছে ঠিক তেমনি দক্ষতা ছাড়া নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে। পুঁজিবাদী সমাজে মানুষ খুব বেশি পেশাদার (Professional) চিন্তা করে, যেখানে এসব কাজকে তারা খুব একটা প্রাধান্য দিতে চান না। ভিন্ন চিত্র নেই এমনটিও নয়। কিন্তু অনেকের কাছে এসব কাজ বিনা লাভে ওয়েস্ট অব টাইম, ওয়েস্ট অব মানি।

প্রকল্প বাস্তবায়ন, প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং সমাজ বোঝার মাধ্যমে সত্যিকারের নেতৃত্ব বিকাশ সম্ভব। তরুণরা যদি অপ্রস্তুত অবস্থায় নেতৃত্ব দেই তবে এটি শুধু বিভ্রান্তি নয়, সমাজে ক্ষতিও ঘটায়। বিভিন্ন সময় কাজ করতে গিয়ে স্বেচ্ছাসেবকদের নতুন এবং ভিন্ন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, ফলে অনেক বিপন্ন অবস্থায় তারা মানসিক চাপেরও সম্মুখীন হন। এই সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও, স্বেচ্ছাসেবকরা তাদের কাজ করে যান। তরুণদের এখনই সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। নিঃস্বার্থ সেবা ও সচেতন তরুণরাই আগামীর সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলবে।

মুহিবুল হাসান রাফি

শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত