প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬
একটি জাতির শক্তি শুধু তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা অবকাঠামোগত উন্নয়নে পরিমাপ করা যায় না। প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে সেই জাতি তার মানুষকে কতটা দক্ষ, সচেতন ও সম্পৃক্ত করে তুলতে পারছে তার ওপর। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে জাতি গঠনের মূল আলোচনায় নারীর ভূমিকা প্রান্তিকই থেকে গেছে। অথচ জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বহু আগেই স্পষ্ট করে বলেছে নারীকে বাদ দিয়ে কোনো জাতির টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশের বাস্তবতা ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা আজ সেই কথাকেই নতুন করে সামনে এনে দিচ্ছে।
জাতিসংঘের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় ৪৯.৬ শতাংশ নারী। কিন্তু অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতার কাঠামোতে এই অনুপাতের প্রতিফলন এখনও দৃশ্যমান নয়। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি জানায়, বিশ্বজুড়ে নারী শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার গড়ে মাত্র ৪৭ শতাংশ, যেখানে পুরুষের অংশগ্রহণ ৭০ শতাংশের বেশি। একইভাবে ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ব সংসদগুলোতে নারীর প্রতিনিধিত্ব গড়ে মাত্র ২৬ শতাংশের কাছাকাছি।
এই বৈষম্য শুধু সংখ্যাগত নয়, এটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। এ কারণেই জাতিসংঘ ২০৩০ এজেন্ডায় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার পঞ্চম লক্ষ্যটি সম্পূর্ণভাবে নারী ও কন্যাশিশুর ক্ষমতায়নের জন্য নির্ধারণ করেছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যেসব দেশে নারী শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সমানভাবে অংশগ্রহণ করে, সেসব দেশেই দারিদ্র্য কমে, মানব উন্নয়ন সূচক বাড়ে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী হয়।
বাংলাদেশের দিকে তাকালে নারী উন্নয়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি চোখে পড়ে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। গত কয়েক দশকে নারী সাক্ষরতার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে কন্যাশিশুর ভর্তি ও উত্তীর্ণের হার অনেক ক্ষেত্রে ছেলেদের চেয়েও বেশি।
স্বাস্থ্য খাতেও বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। ইউনিসেফ ও ইউএনএফপিএর তথ্য অনুযায়ী, মাতৃমৃত্যুর হার গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এই সাফল্য প্রমাণ করে, নারীর স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বিনিয়োগ শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি কার্যকর উন্নয়ন কৌশল।
তবে এই অগ্রগতির আড়ালে একটি কঠিন বাস্তবতাও রয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে নারী শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার প্রায় ৪০ থেকে ৪২ শতাংশ, যেখানে পুরুষের অংশগ্রহণ প্রায় দ্বিগুণ। অর্থাৎ অর্থনীতির মূলধারায় নারীর বিশাল সম্ভাবনা এখনও পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। শিক্ষা জাতি গঠনের সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি, আর নারী শিক্ষা সেই ভিত্তিকে বহুগুণে শক্তিশালী করে। ইউনেস্কোর গবেষণায় দেখা গেছে, একজন শিক্ষিত নারী শুধু নিজেই স্বাবলম্বী হন না, বরং তার পরিবারে শিশুদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও শিক্ষার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়। শিক্ষিত মায়ের সন্তানদের স্কুলে যাওয়ার হার বেশি এবং ঝরে পড়ার হার কম।
বাংলাদেশে কন্যাশিক্ষায় অগ্রগতি হলেও উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ এখনো সীমিত। বাল্যবিবাহ, দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা এবং সামাজিক কুসংস্কার অনেক মেয়ের শিক্ষাজীবন মাঝপথে থামিয়ে দেয়। ফলে তারা দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, যা জাতি গঠনের জন্য একটি বড় ক্ষতি।
অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত নারী মানেই শক্তিশালী জাতীয় অর্থনীতি। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় বলা হয়েছে, নারী শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ বাড়লে একটি দেশের জিডিপি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পে নারীদের অবদান এই সত্যের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। এই খাত দেশের রপ্তানি আয়ের মেরুদণ্ড, যেখানে নারীরাই প্রধান শ্রমশক্তি। তবে জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী একই কাজের জন্য নারীরা গড়ে ২০ শতাংশ কম মজুরি পান। বাংলাদেশেও এই মজুরি বৈষম্য বিদ্যমান। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা ও পদোন্নতির সুযোগে সীমাবদ্ধতা নারীর অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। এই বৈষম্য দূর না হলে জাতি গঠনের পথে নারীর পূর্ণ অবদান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
রাজনীতি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। জাতিসংঘ মনে করে, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ছাড়া অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা সম্ভব নয়। বাংলাদেশে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে নারীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে এবং বর্তমানে সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় এই প্রতিনিধিত্ব কতোটা কার্যকর? বাস্তবে নীতি নির্ধারণ ও ক্ষমতার মূল কেন্দ্রে নারীর প্রভাব এখনও সীমিত। অথচ জাতিসংঘের গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব দেশে নারী নেতৃত্ব বেশি, সেসব দেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে বেশি হয়। অর্থাৎ নারী নেতৃত্ব মানেই আরও মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র। নীতিমালা, আইন ও পরিসংখ্যানের বাইরেও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো সামাজিক মানসিকতা। ইউএন উইমেনের মতে, পিতৃতান্ত্রিক চিন্তাধারাই নারীর ক্ষমতায়নের সবচেয়ে বড় বাধা। বাংলাদেশেও এখনও অনেক ক্ষেত্রে নারীর কাজ, নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়। ‘নারীর স্থান ঘরে’ এই ধারণা শুধু নারীর সম্ভাবনাকেই সংকুচিত করে না, জাতির সামগ্রিক অগ্রগতিকেও ধীর করে দেয়। জাতি গঠনের স্বার্থেই এই মানসিকতার পরিবর্তন অপরিহার্য।
ডিজিটাল যুগ নারীর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। অনলাইন শিক্ষা, ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। জাতিসংঘের তথ্য মতে, প্রযুক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লে অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি দ্রুত হয় এবং আয়ের নতুন পথ তৈরি হয়। তবে ডিজিটাল বৈষম্য এখনও বড় সমস্যা। গ্রাম ও শহরের নারীদের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহার ও প্রযুক্তিগত দক্ষতায় বড় পার্থক্য রয়েছে। এই ব্যবধান কমাতে হলে পরিকল্পিত প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
ভবিষ্যৎ জাতি গঠনের বীজ রোপিত হয় আজকের পরিবার ও শিক্ষাব্যবস্থায়। একজন মা, শিক্ষক ও অভিভাবক হিসেবে নারীরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নৈতিকতা, সহনশীলতা ও নাগরিক চেতনা গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। জাতিসংঘের গবেষণায় দেখা গেছে, সমতাভিত্তিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুরা পরবর্তীতে আরও দায়িত্বশীল ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে। জাতি গঠনে নারী কোনো সহায়ক শক্তি নন, তিনি মূল শক্তি। জাতিসংঘের বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা এক কথায় প্রমাণ করে নারীকে বাদ দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয়। নারীর সমান অধিকার, সমান সুযোগ ও সমান মর্যাদা নিশ্চিত করা কোনো দয়া নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের টিকে থাকার শর্ত। নারীকে কেন্দ্রে রেখেই একটি শক্তিশালী, ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ সম্ভব। আজ যদি আমরা এই সত্যকে নীতিতে, চর্চায় ও মানসিকতায় গ্রহণ করতে পারি, তবেই জাতি গঠনের পথ হবে সত্যিকার অর্থে অগ্রসর ও মানবিক।
মুহাম্মদ শাফায়াত হুসাইন
শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ