ঢাকা রোববার, ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৮ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

মাসের শেষে মধ্যবিত্তের টিকে থাকার লড়াই

সুমাইয়া সিরাজ সিমি, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
মাসের শেষে মধ্যবিত্তের টিকে থাকার লড়াই

মাসের শুরুতে মধ্যবিত্ত একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। বেতন এসেছে, কিছু বিল পরিশোধ করা গেছে, বাজারের থলেটা সামান্য ভারী। কিন্তু এই স্বস্তি ক্ষণস্থায়ী। মাস যত এগোয়, ততই হিসাবের খাতা ভারী হয়, আর জীবন হালকা হতে থাকে। মাসের শেষে এসে প্রশ্নটা আর রাজনৈতিক থাকে না- তা হয়ে ওঠে অস্তিত্বে এই মাসটা কীভাবে শেষ করব?

এই দেশে মধ্যবিত্ত কোনো আনুষ্ঠানিক শ্রেণি নয়, কিন্তু সবচেয়ে বড় সামাজিক বাস্তবতা। তারা ভর্তুকি পায় না, আবার বিলাসও করতে পারে না। রাষ্ট্রের নীতিতে তারা প্রায় অদৃশ্য, অথচ অর্থনীতির চাকা ঘোরে তাদের ঘামেই। কর দেয়, নিয়ম মানে, আশা রাখে। কিন্তু বিনিময়ে পায় অনিশ্চয়তা। আজ মধ্যবিত্তের রাজনীতি কোনো দলের পোস্টার বা মিছিলে সীমাবদ্ধ নয়। এটি প্রতিদিনের বাজারে, বাসা ভাড়ার চুক্তিতে, স্কুলের ফি-নোটিশে, হাসপাতালের বিলের লাইনে লেখা হচ্ছে। এই রাজনীতিতে স্লোগান নেই, আছে টিকে থাকার লড়াই।

বাজারে গেলে বোঝা যায়- দামের ভাষা কোনো যুক্তি মানে না। চাল, ডাল, তেল, সবজির দাম বাড়ে; কিন্তু আয় বাড়ে না। মাসিক বেতন নির্দিষ্ট, অথচ খরচ প্রতিদিন নতুন করে চুক্তি ভাঙে। বাজারের থলেতে জিনিস কমে, কিন্তু দুশ্চিন্তা বাড়ে। এই দুশ্চিন্তা কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি কাঠামোগত। মধ্যবিত্ত সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ে শিক্ষা ও চিকিৎসায়। সন্তানের ভালো ভবিষ্যতের জন্য তারা সরকারি ব্যবস্থার ওপর ভরসা করতে পারে না, আবার বেসরকারি খরচ বহন করাও কঠিন। স্কুলের বেতন, কোচিং, বই- সব মিলিয়ে শিক্ষা এখন বিনিয়োগ নয়, ঝুঁকি। আর চিকিৎসা? অসুস্থ হওয়াটাই যেন মধ্যবিত্তের জন্য শাস্তি। একবার হাসপাতালে ঢুকলে সঞ্চয় ভেঙে যায়, ধার শুরু হয়।

এই বাস্তবতায় রাজনীতি কোথায়? রাজনীতি আছে- কিন্তু তা বক্তৃতায়। উন্নয়নের গল্প শোনা যায়, কিন্তু মধ্যবিত্তের দৈনন্দিন ব্যয়-চাপ নিয়ে সুস্পষ্ট নীতি দেখা যায় না। ন্যায্য বাজার নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ব্যয় কমানো- এসব প্রতিশ্রুতি নির্বাচনের সময় উচ্চারিত হয়, পরে হারিয়ে যায় ফাইলে। মধ্যবিত্ত তাই দ্বিধায় থাকে। তারা প্রতিবাদ করতে চায়, কিন্তু সময় নেই। তারা রাস্তায় নামতে চায়, কিন্তু চাকরি হারানোর ভয় আছে। তারা সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে, তারপর আবার কাজে ফেরে- কারণ মাস থামে না।

এই শ্রেণির সবচেয়ে বড় সংকট হলো- তারা নিজের কষ্টকে বৈধ মনে করতে শেখেনি। গরিব হলে সহানুভূতি আছে, ধনী হলে প্রভাব আছে; মধ্যবিত্ত হলে আছে শুধু ‘ম্যানেজ করার’ চাপ। পরিবার, সমাজ, এমনকি রাষ্ট্রও ধরে নেয়- মধ্যবিত্ত মানেই মানিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু কতদিন?

বেতন স্থির রেখে যখন ভাড়া বাড়ে, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি বিল বাড়ে, বাজার বাড়ে- তখন প্রশ্ন ওঠে: এই চাপের দায় কে নেবে? মধ্যবিত্ত কি শুধু সহ্য করার জন্যই জন্মেছে? নির্বাচন আসে। প্রতিশ্রুতি আসে। উন্নয়নের গ্রাফ ওঠে। কিন্তু মধ্যবিত্তের জীবনে তার প্রতিফলন কম। তারা দেখে- রাস্তা হয়েছে, ভবন হয়েছে; কিন্তু নিজেদের জীবন সহজ হয়নি। তারা দেখে- সংখ্যা ভালো, কিন্তু অনুভূতি খারাপ। এ কারণেই মধ্যবিত্তের রাজনীতি আজ নীরব। তারা কোনো দলে পুরোপুরি নেই, আবার কোনো দলের বাইরে থেকেও নেই। তারা ভোট দেয়, কিন্তু বিশ্বাস করে কম। তারা আশা রাখে, কিন্তু প্রস্তুত থাকে হতাশার জন্য। এই নীরবতা বিপজ্জনক। কারণ দীর্ঘদিন অবহেলিত শ্রেণি একসময় হয় বিস্ফোরিত হয়, নয়তো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দুটোই রাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

মধ্যবিত্তের জন্য টিকে থাকার রাজনীতি মানে এখন- খরচ কমানো, স্বপ্ন ছোট করা, ভবিষ্যৎ স্থগিত রাখা। বিদেশে যাওয়ার চিন্তা, ঋণের ওপর নির্ভরতা, মানসিক চাপ- সব মিলিয়ে এই শ্রেণি ধীরে ধীরে ক্লান্ত।

প্রশ্নটা তাই খুব সহজ: রাষ্ট্র কি মধ্যবিত্তকে শুধু করদাতা হিসেবে দেখবে, নাকি নাগরিক হিসেবে ভাববে? বাজার নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বাস্তব সংস্কার, কর্মসংস্থানে স্থিতিশীলতা- এসব কি সত্যিকারের অগ্রাধিকার হবে? মধ্যবিত্ত কোনো বিশেষ সুবিধা চায় না।

তারা চায় পূর্বানুমেয় জীবন- যেখানে মাসের শেষে এসে বাঁচার হিসাব করতে না হয়। তারা চায় এমন রাজনীতি, যা পোস্টারে নয়, রান্নাঘরের টেবিলে এসে দাঁড়ায়। মাসের শেষে টিকে থাকার এই রাজনীতি কোনো দলের একক দায় নয়। কিন্তু দায় এড়ানোর সুযোগও নেই। কারণ মধ্যবিত্ত ভেঙে পড়লে সমাজের ভারসাম্য ভাঙে। আজ মধ্যবিত্ত কোনো দলে নেই। তারা আছে শুধু হিসাবের খাতায়। যেখানে প্রতিটি মাস নতুন করে বাঁচার অঙ্ক শেখায়।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত