প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
দীর্ঘদিন ধরে কোনো কিছু থেকে বঞ্চিত হওয়ার পর পুনরায় তা ফিরে পেলে মানুষ আনন্দে মেতে ওঠে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠিক সেরকমই বঞ্চিত ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে বাংলাদেশের মানুষ। যার জন্য সারাদেশ থেকে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে গ্রামে ফিরছে শুধুমাত্র পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার জন্য। এর মধ্য দিয়ে সারা দেশের মানুষ ঈদের মতোই আমেজে মেতে উঠেছে। এই আনন্দ, এই আমেজ সারা বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের।
বাংলাদেশের আবেগপ্রবণ মানুষ নিজের জীবনের থেকে দেশকেই বেশি ভালোবাসে। তাই তো দেশমাতৃকা রক্ষার জন্য বারবার জীবন উৎসর্গ করেছে। তবুও থেমে থাকেনি মানুষ। দেশের স্বার্থে, জাতীয় স্বার্থে নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করতে সবসময়ই প্রস্তুত। ২০২৪ এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান তারই প্রমাণ। বাঙালি থেমে থাকার জাতি নয়। অন্যায়-অবিচার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শিখেছে।
১৯৪৭ সালে দেশভাগ হওয়ার পর ১৯৫২ সালে পাকিস্তানে বাঙালি জাতি মাতৃভাষা রক্ষার জন্য জীবন দিয়েছে। চেয়েছে মাতৃভাষায় কথা বলতে, মাতৃভাষা রক্ষা করতে, তা পেরেছে। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে বাঙালি জীবন দিয়েছে অন্যায়কে রুখে দেওয়ার জন্য। রুখে দিয়েছে। যার প্রমাণ ১৯৭০ এর নির্বাচনে বাঙালির ভূমিধস বিজয়। এরপর দেশ স্বাধীনের জন্য ১৯৭১ সঙ্গে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘ ৯ মাস লড়াই সংগ্রাম করে পৃথিবীর মানচিত্রে ‘বাংলাদেশ’ নামক স্বাধীন ভূখণ্ডের প্রতিষ্ঠা করেছে। এরপর শেখ মুজিব ক্ষমতার মসনদে বসে দেশে বাকশাল কায়েম করলে দেশপ্রেমিক বাহিনী তাকে হত্যা করে দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনে। এরপর ৯০ এ এরশাদ সরকার স্বৈরাচারী হয়ে উঠে এবং দেশের মানুষ তার বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম করে দেশকে স্বৈরাচারমুক্ত করেছে এবং গণতন্ত্র পুনরায় ফিরিয়ে এনেছে। সর্বশেষ দেশের ক্ষমতার মসনদে বসে ফ্যাসিস্ট হাসিনা। দীর্ঘ ১৬ বছর দেশের মানুষকে বিভিন্নভাবে অবরুদ্ধ করে পরিবারতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্র কায়েম করে। খুন-গুম, হত্যা, দূর্নীতি, ধর্ষণ, অপহরণ, অন্যায়, অবিচার, জুলুমণ্ড নির্যাতন ইত্যাদির মাধ্যমে দেশ ও দেশের মানুষকে অবরুদ্ধ করে। যার পরিণতি ২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান। ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে দেশের আপামর জনসাধারণের অংশগ্রহণে দেশকে স্বৈরাচার মুক্ত করা হয়। ফ্যাসিস্ট হাসিনা দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিল।
বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। কিন্তু ফ্যাসিস্ট হাসিনা দীর্ঘ ১৬ বছর এদেশ শাসন করে গণতন্ত্র থেকে একনায়কতন্ত্রে পরিণত করেছে। পরিবারতন্ত্রের মাধ্যম ক্ষমতা নিজের মধ্যে আবদ্ধ করেছিল। দেশের মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সকল অধিকার কেড়ে নিয়েছে। বিশেষ করে ভোট প্রদানের অধিকার। নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া এবং পছন্দের প্রার্থীকে ভোট প্রদান করা দু’য়ে ব্যক্তির রাজনৈতিক অধিকার। কিন্তু দীর্ঘ ১৬ বছর ফ্যাসিস্ট হাসিনা বারবার পাতানো নির্বাচনের আয়োজন করে রাতে ভোট চুরি করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করছে। এমনও জানা গেছে যে, মৃত্যু মানুষের ভোট পর্যন্ত দিয়েছে তারা।
দীর্ঘ ১৬ বছর দেশের মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয় এবং এরই নেতৃত্ব দেশের মানুষ পুনরায় ফিরিয়ে পায় তাদের অধিকার। এরই লক্ষ্যে এ বছর মানুষের বহুল প্রত্যাশিত আশা ভোটদান করে সরকার গঠন করা পূরণের পথে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ গ্রামে ফিরছে। নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট প্রদান করার জন্য। বাস-ট্রেন-লঞ্চ সবখানে মানুষের ভিড়। সরকার-বেসরকারি সকল চাকরিজীবী মানুষ এবং কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বাড়ি ফিরতেছে। সবাই আনন্দে বাড়ি ফিরতেছে। গার্মেন্টস কর্মীরাও আনন্দে ফিরছে। অনেক সময় দেখেছি বিভিন্ন বন্ধের সময়ও গার্মেন্টস কর্মীরা অর্থের সংকুলানের জন্য বাড়ি ফিরে না, কিন্তু এবার ভোটের জন্য ফিরতেছে। দীর্ঘ সময় পর হলেও দেশে নির্বাচনের আমেজ দেখা দিয়েছে। এ আনন্দের স্বাদ ভিন্ন, সুখকর। বৃদ্ধ মানুষ থেকে শুরু করে সকল পর্যায়ের মানুষের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে নির্বাচন। সকল মানুষের মুখে নির্বাচনের কথা। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও ভোট নিয়ে সচেতন। গ্রামে-গঞ্জে সবখানে নির্বাচনের আলোচনা। গ্রামের চায়ের দোকানে বিভিন্ন ধরনের মানুষ চা খেতে খেতে নির্বাচন সম্পর্কে আলোচনা করে। নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ, জাতি-ধর্ম-বর্ণ সবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু নির্বাচন। মানুষ সচেতন হয়েছে। গ্রামের ছোট বাচ্চারাও বিভিন্ন মার্কার কথা বলে, নির্বাচনের কথা বলে। নির্বাচনে এধরনের আমেজ এর আগে দেখা যায়নি। নির্বাচন যে উৎসবমুখর হতে পারে, এই নির্বাচনে উপলব্ধি করা যাচ্ছে। আমরা চাই এই ধারাবাহিকতা থাকুক।
তাই এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে। এর জন্য নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে সুশাসন ও জবাবদিহিমূলক সরকার গঠন নিশ্চিত করতে হবে। দেশীয় সংস্কৃতিরচর্চা বাড়াতে হবে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করে বেকারত্ব সমস্যা দূর এবং দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়তে হবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে। যেন আর কেউ ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠতে না পারে। চব্বিশের জুলাইসহ ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে যত হত্যা ও গণহত্যা হয়েছে সবকিছুর বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ভারতীয় আধিপত্য থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে। শহিদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে হবে। দেশের কাজে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। মানুষের মৌলিক অধিকারসহ সকল অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সর্বপরি ন্যায় এবং ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই দেশের প্রতিটি নির্বাচন উৎসবমুখর করা সম্ভব হবে।
মোজাহিদ হোসেন
শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া