প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
বাংলাদেশের মানচিত্রে সবুজের যে বিস্তৃত ছায়া দূর থেকে চোখে পড়ে, তার নাম সুন্দরবন। পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য এ শুধু ভৌগোলিক পরিচয় নয়, এটি আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং অস্তিত্বের এক অনন্য অংশ। অথচ আজ প্রশ্ন উঠছে, যে বনকে আমরা গর্ব করে ‘বিশ্বঐতিহ্য’ বলি, সেই সুন্দরবনকে কি সত্যিই আমরা সুন্দর রাখছি?
সুন্দরবন আমাদের কাছে শুধু পর্যটনকেন্দ্র নয়; এটি একটি প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ। উপকূলীয় অঞ্চলে যখন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা প্রলয়ঙ্করী ঝড় আঘাত হানে, তখন প্রথম আঘাতটি নিজের বুকে ধারণ করে এই বনই মানুষকে রক্ষা করে। সিডর, আইলা, আম্পান, প্রতিটি দুর্যোগে আমরা দেখেছি সুন্দরবনের অবদান। অর্থাৎ সুন্দরবন ধ্বংস হলে শুধু গাছ হারাব না, হারাব মানুষের নিরাপত্তার এক অদৃশ্য প্রাচীর।
কিন্তু বাস্তবতা বলছে, আমরা নিজেরাই সেই প্রাচীর দুর্বল করছি। অবৈধভাবে গাছ কাটা, নদীতে তেলবাহী জাহাজ চলাচল, কয়লাভিত্তিক শিল্পায়ন, প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা, সব মিলিয়ে সুন্দরবনের প্রাণপ্রকৃতি প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মাঝেমধ্যে নদীতে তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা আমরা খবরের কাগজে পড়ি, কয়েকদিন আলোচনা করি, তারপর আবার ভুলে যাই। অথচ সেই তেলের স্তর নদীর পানি, মাছ, কাঁকড়া, ডলফিন এমনকি মাটির গুণাগুণ পর্যন্ত নষ্ট করে দেয়। একটি দুর্ঘটনার প্রভাব অনেক বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়, এ কথাটি আমরা খুব কমই ভাবি।
আরও বড় বিপদ হলো জলবায়ু পরিবর্তন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, লবণাক্ততা বাড়ছে, ফলে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, নানা প্রজাতির পাখি ও সরীসৃপ তাদের বাসস্থান হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। অর্থাৎ সুন্দরবন ধ্বংস মানে শুধু একটি বন হারানো নয়, একটি জীববৈচিত্র্যের পৃথিবী হারানো।
আমাদের আচরণেও রয়েছে অসচেতনতা। পর্যটনের নামে আমরা প্রায়ই প্লাস্টিক বোতল, প্যাকেট, খাবারের উচ্ছিষ্ট ফেলে আসি। আমরা ছবি তুলি, আনন্দ করি, কিন্তু খুব কম মানুষই ভাবি, এই ছোট ছোট কাজগুলোই ধীরে ধীরে বনের পরিবেশকে বিষিয়ে তুলছে। প্রকৃতি কখনও হঠাৎ ধ্বংস হয় না; মানুষের অসতর্ক অভ্যাসের ছোট ছোট আঘাতেই বড় বিপর্যয় তৈরি হয়।
সরকার নানা উদ্যোগ নিচ্ছে, সংরক্ষিত এলাকা বৃদ্ধি, নজরদারি, বিকল্প জীবিকা কর্মসূচি, এসব অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু শুধু নীতিমালা দিয়ে সুন্দরবন রক্ষা সম্ভব নয়, প্রয়োজন মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন। উপকূলের মানুষ যদি জীবিকার জন্য বননির্ভরতা কমাতে না পারে, আর শহরের মানুষ যদি ভোগবাদী জীবনধারা না বদলায়, তবে কাগজে-কলমে সংরক্ষণ বাস্তবে ফল দেবে না।
সুন্দরবন আমাদের সম্পদ নয়, আমাদের দায়িত্ব। আমরা প্রায়ই বলি ‘বন বাঁচলে দেশ বাঁচবে।’ কথাটি আসলে অলংকার নয়, বাস্তব সত্য। কারণ সুন্দরবন টিকে থাকলে উপকূল টিকে থাকবে, কৃষি টিকে থাকবে, মানুষ টিকে থাকবে। তাই প্রয়োজন সচেতনতা, দায়িত্ববোধ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা।
আজ প্রশ্নটা আমাদের নিজেদের কাছেই, আমরা কি সত্যিই সুন্দরবনকে সুন্দর রাখছি, নাকি উন্নয়নের নামে ধীরে ধীরে তাকে অসুন্দর করে তুলছি? যদি উত্তরটি অস্বস্তিকর হয়, তবে এখনই সময় বদলানোর। কারণ সুন্দরবন একদিনে ধ্বংস হবে না, কিন্তু একদিন হঠাৎ আমরা বুঝব, রক্ষাকবচটি আর নেই।
সুন্দরবন আমাদের রক্ষা করে নিঃশব্দে। এবার তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের। তাই ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘সুন্দর বন দিবস’-এর প্রতিপাদ্য হোক সুন্দর বনকে সুন্দর রাখার।
মিজানুর রহমান
শিক্ষার্থী, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়