ঢাকা শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৮ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ঋণের ভারে জর্জরিত অর্থনীতি একটি অশনিসংকেত

ঋণের ভারে জর্জরিত অর্থনীতি একটি অশনিসংকেত

বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে ‘ঋণ’ শব্দটির গুরুত্ব ও আতঙ্ক- উভয়ই সমান্তরালে বৃদ্ধি পাচ্ছে। একটি রাষ্ট্রের উন্নয়নের চাকা সচল রাখতে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। কিন্তু সেই ঋণ যখন আয়ের সীমা ছাড়িয়ে যায় এবং পরিশোধের সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে, তখন তা আর আশীর্বাদ থাকে না; বরং অর্থনীতির গলায় ফাঁস হয়ে দাঁড়ায়। সাম্প্রতিক সময়ে অনেক উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশে ঋণের এই বোঝা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে, যা দীর্ঘমেয়াদি সংকটের অশনিসংকেত দিচ্ছে।

একটি দেশ কেন ঋণের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়ে, তার পেছনে বেশ কিছু কাঠামোগত ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক কারণ কাজ করে। অনেক সময় রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা বা দ্রুত উন্নয়নের মোহে এমন কিছু মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়, যার ব্যয় অত্যধিক; কিন্তু অর্থনৈতিক রিটার্ন বা লাভের হার অত্যন্ত ধীর। এসব প্রকল্পের জন্য নেওয়া চড়া সুদের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে জাতীয় রিজার্ভে টান পড়ে। জিডিপির তুলনায় কর আদায়ের হার কম থাকা ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ায়। রাষ্ট্র যখন নিজস্ব উৎস থেকে অর্থ সংস্থান করতে পারে না, তখন ঘাটতি বাজেট মেটাতে তাকে দেশি-বিদেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার মান কমে গেলে ঋণের দায় বহুগুণ বেড়ে যায়। অর্থাৎ, ঋণের পরিমাণ না বাড়লেও ডলারের দাম বাড়ার কারণে শুধু সুদ ও কিস্তি পরিশোধেই বাজেটের বড় একটা অংশ ব্যয় হয়ে যায়। ঋণের মাধ্যমে নেওয়া অর্থের সঠিক ব্যবহার না হওয়া এবং দুর্নীতির মাধ্যমে সেই অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া অর্থনীতির রক্তক্ষরণের প্রধান কারণ। এতে ঋণ ঠিকই থেকে যায়, কিন্তু দেশের ভেতরে কোনো সম্পদ বা কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় না।

ঋণের বোঝা যখন অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন তার প্রভাব সাধারণ মানুষের রান্নাঘর থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। সরকার যখন ঋণ পরিশোধের চাপে পড়ে, তখন অনেক সময় বাজারে মুদ্রার সরবরাহ বাড়িয়ে দেয় বা পরোক্ষ কর বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে।

বাজেটের একটি বিশাল অংশ যখন ঋণের সুদ পরিশোধে চলে যায়, তখন শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতের বরাদ্দ কমিয়ে দিতে হয়। এতে দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। কিস্তি পরিশোধের জন্য ডলারের টানাটানি শুরু হলে আমদানি ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। এতে জ্বালানি ও কাঁচামাল আমদানিতে বিঘ্ন ঘটে, যা শিল্প উৎপাদনকে স্থবির করে দেয়। ঋণের চাপে জর্জরিত অর্থনীতিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারিয়ে ফেলেন। রেটিং এজেন্সিগুলো দেশের ক্রেডিট রেটিং কমিয়ে দিলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ঋণ পাওয়া আরও কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে।

ঋণের এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসা সহজ নয়, তবে অসম্ভবও নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কঠোর অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা। অপরিহার্য নয় এমন বিলাসদ্রব্য আমদানি এবং অনুৎপাদনশীল প্রকল্প সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে হবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক খাতে বিনিয়োগ বজায় রেখে প্রশাসনিক খরচ কমাতে হবে। করের জাল বিস্তৃত করতে হবে। শুধু ধনীদের ওপর করের বোঝা না চাপিয়ে কর প্রশাসনকে আধুনিক ও দুর্নীতিমুক্ত করার মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। কেবল একটি বা দুটি খাতের ওপর নির্ভর না করে রপ্তানি ঝুড়ি বড় করতে হবে। পাশাপাশি বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে প্রবাসীদের উৎসাহ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যেসব ঋণের সুদের হার বেশি বা পরিশোধের সময়সীমা সংক্ষিপ্ত, সেসব ক্ষেত্রে দাতা দেশ বা সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ঋণের মেয়াদ বাড়ানো (জবংঃৎঁপঃঁৎরহম) বা সুদের হার কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

ঋণ কোনো মন্দ বিষয় নয় যদি তা উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু যখন ঋণের অর্থে অনুৎপাদনশীল খাত পুষ্ট হয় এবং ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা দেখা দেয়, তখন তা জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাঁধে এক বিশাল বোঝার নামান্তর হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানের এই সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের টেকসই এবং স্বনির্ভর অর্থনীতির পথে হাঁটতে হবে। মনে রাখতে হবে, সাময়িক স্বস্তির জন্য নেওয়া চড়া সুদের ঋণ দীর্ঘমেয়াদি দাসত্বের নামান্তর। তাই স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সঠিক পরিকল্পনা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই শুধু এই ঋণের পাহাড় ধসানো সম্ভব।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত