প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০২ মার্চ, ২০২৬
বাংলাদেশ মূলত পলিমাটি ও জলধারার এক অনন্য সংমিশ্রণ। হিমালয় থেকে নেমে আসা অজস্র নদ-নদী আর তাদের শাখা-প্রশাখা ও খালগুলো একসময় এ দেশের ধমনীর মতো প্রবাহিত হতো। কিন্তু কালের বিবর্তনে, দখলদারত্বের করাল গ্রাসে এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত অবহেলায় সেই ধমনীগুলো আজ সংকুচিত ও মৃতপ্রায়। জলবায়ু পরিবর্তনের এই কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে সম্প্রতি ২০২৬ সালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের মৃতপ্রায় খালগুলো নিয়ে যে মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন, তা শুধু একটি সাধারণ উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং এটি বাংলাদেশের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে এক নতুন প্রাণের স্পন্দন জোগানোর অঙ্গীকার। তিনি আগামী ৫ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখননের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ আমাদের হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ খাদ্য ও পানি নিরাপত্তার এক শক্তিশালী রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। আমাদের ভৌগোলিক বাস্তবতায় খালের গুরুত্ব অপরিসীম। এক সময় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথের জাল বিছিয়ে ছিল নদী ও খালের মাধ্যমে, যার সম্মিলিত দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ২৫,৯৭৫ কিলোমিটার (১৯৯৫-৯৬ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত)। হাজার কিলোমিটারের উপরে। কিন্তু সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। গত তিন দশকে আমাদের দেশের প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ জলাভূমি ও খাল হয় ভরাট হয়ে গেছে অথবা অস্তিত্ব হারিয়েছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের অবস্থা আরও বেশি উদ্বেগজনক। রাজধানী ঢাকার এক সময়ের প্রবাহমান ৫৪টি খালের একটি বড় অংশ আজ কংক্রিটের নিচে চাপা পড়ে আছে। পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকার প্রায় ১২০ কিলোমিটার খাল এখন রাস্তা বা বহুতল ভবনের নিচে বিলীন। একইভাবে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের অবস্থা আরও করুণ; সেখানে এক সময় ১০৪টি খালের অস্তিত্ব থাকলেও বর্তমানে মাত্র ৩৬টি খালের ভগ্নাবশেষ টিকে আছে। এই ধ্বংসলীলা শুধু পরিবেশগত বিপর্যয়ই ডেকে আনেনি, বরং সামান্য বৃষ্টিতেই শহরগুলোকে ডুবিয়ে দিচ্ছে অসহনীয় জলাবদ্ধতায়। প্রধানমন্ত্রী যখন ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের ঘোষণা দেন, তখন সেটি শুধু মাটি কাটার কাজ থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে একটি জনপদের জীবনপ্রবাহ পুনরুদ্ধারের সংকল্প। এই মহাপরিকল্পনার সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো এর দ্রুত বাস্তবায়ন ও টেকসই চিন্তা। সরকার এই প্রকল্পের একটি বড় অংশ আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে দৃশ্যমান করার যে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, তা প্রশাসনের সদিচ্ছারই বহিঃপ্রকাশ। আমাদের দেশে সাধারণত বড় প্রকল্পগুলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। কিন্তু এখানে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে বর্তমান সরকার বিষয়টিকে একটি জরুরি জাতীয় সংকট হিসেবে বিবেচনা করছে।
খালগুলো যদি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খনন করা যায়, তবে তা ভূ-উপরিস্থ পানির বিশাল আধার হিসেবে কাজ করবে। বর্তমানে আমরা সেচের জন্য মাত্রাতিরিক্ত ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি, যার ফলে পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। অনেক এলাকায় নলকূপে পানি পাওয়া যাচ্ছে না, যা মরুপ্রক্রিয়ার প্রাথমিক লক্ষণ। এই অবস্থায় খাল খনন সফল হলে কৃষকরা সরাসরি জোয়ার-ভাটার পানি বা বৃষ্টির জমানো পানি সেচ কাজে ব্যবহার করতে পারবেন। এতে একদিকে যেমন চাষাবাদ সাশ্রয়ী হবে, অন্যদিকে মাটির নিচের পানির ওপর চাপ কমবে।
তবে প্রধানমন্ত্রীর এই পরিকল্পনার সার্থকতা শুধু খননকাজের যান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশাল এক সবুজায়নের স্বপ্ন। পরিকল্পনায় খালের দুই পাড়ে আগামী ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তা এক অবিস্মরণীয় পরিবেশগত উদ্যোগ। প্রতি বছর গড়ে ৫ কোটি গাছ লাগানো হবে, যা দেশের বনভূমির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়ে দেবে। প্রতিটি খালের পাড় যখন সবুজে ঘেরা থাকবে, তখন সেই গাছের শিকড় মাটির ক্ষয় রোধ করবে এবং পাড় ভাঙন ঠেকাবে। একই সঙ্গে এই বনভূমি স্থানীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এবং কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনতে বিশাল ভূমিকা রাখবে। এটি মূলত শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সেই ঐতিহাসিক ‘খাল খনন কর্মসূচি’র এক আধুনিক ও প্রযুক্তিগত সংস্করণ। সত্তরের দশকের শেষের দিকে সেই কর্মসূচি যেভাবে দলমত নির্বিশেষে গণমানুষের অংশগ্রহণে এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছিল, বর্তমানের এই সমন্বিত উদ্যোগও ঠিক তেমনি জাতীয় ঐক্য ও উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
খাল পুনরুদ্ধারের পথে সবচেয়ে বড় এবং দৃশ্যমান চ্যালেঞ্জ হলো অবৈধ দখলদারিত্ব। দশকের পর দশক ধরে প্রভাবশালী মহলের মদতে খালের জমি দখল করে কলকারখানা, ঘরবাড়ি ও রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। অনেক জায়গায় খালের মানচিত্র পর্যন্ত বদলে ফেলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যে শূন্য সহনশীলতা বা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের কথা বলেছেন, তা বাস্তবায়ন করতে হলে স্থানীয় প্রশাসনকে যেমন সাহসী হতে হবে, তেমনি সাধারণ জনগণের সক্রিয় প্রতিরোধও প্রয়োজন। খালের সীমানা নির্ধারণে আধুনিক স্যাটেলাইট ইমেজারি এবং ডিজিটাল ল্যান্ড সার্ভে ব্যবহার করা এখন সময়ের দাবি। একবার খনন করার পর সেই খালগুলো যেন পুনরায় ময়লা-আবর্জনা ও পলি জমে ভরাট না হয়, সেদিকেও কড়া নজরদারি রাখতে হবে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের খালগুলোতে পয়ঃনিষ্কাশন লাইন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন ছাড়া খাল খননের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কারিগরি তদারকি। শুধু শ্রমিক বা স্কেভেটর দিয়ে মাটি কাটলেই হবে না, বরং খালের গভীরতা ও ঢাল এমনভাবে নিশ্চিত করতে হবে যেন পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকে। অনেক সময় দেখা যায়, অপরিকল্পিত খননের ফলে কয়েক মাস পরেই আবার পলি জমে খাল ভরাট হয়ে যায়। তাই এই প্রকল্পে অভিজ্ঞ হাইড্রোলজিস্ট এবং পানি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ করা অপরিহার্য। পাশাপাশি, খননকৃত মাটি যেন খালের পাড়েই স্তূপ করে রাখা না হয়, কারণ বর্ষায় সেই মাটি আবার ধুয়ে খালে গিয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। সেই মাটি পরিকল্পিতভাবে নিচু জমি ভরাট বা টেকসই বাঁধ নির্মাণে ব্যবহার করা যেতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, নদী ও খালের মৃত্যু মানে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সত্তার সংকট। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যখন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে এবং ঋতুবৈচিত্র্য বিঘ্নিত হচ্ছে, তখন বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং জলাবদ্ধতা দূর করা আমাদের জন্য অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই দূরদর্শী পরিকল্পনা যদি তৃণমূল পর্যায়ে স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশের মানচিত্রে আবার নীল জলরাশির রেখাগুলো স্বচ্ছ ও সজীব হয়ে উঠবে। কৃষকের মুখে হাসি ফুটবে, দেশীয় মাছের অভয়ারণ্য তৈরি হবে এবং মাছে-ভাতে বাঙালির সেই হারানো ঐতিহ্য আবার প্রাণ ফিরে পাবে। এটি শুধু একটি সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এটি আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, শীতল ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ রেখে যাওয়ার এক পবিত্র অঙ্গীকার। এই কর্মযজ্ঞে যদি ছাত্র-জনতা ও সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়, তবে তা হবে এ দেশের উন্নয়ন ইতিহাসে এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়, যা আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবে।
ওসমান গনি
সাংবাদিক ও কলামিস্ট