প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০২ মার্চ, ২০২৬
মার্চ মাসের শুরুতেই দেশের ওপর দিয়ে বইছে তীব্র দাবদাহ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের উত্তাপ যেন অগ্নিগোলকের মতো নিচে নেমে আসছে। জনজীবনে হাঁসফাঁস অবস্থা। এমন পরিস্থিতিতে মানুষের স্বস্তির বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অনিয়ন্ত্রিত ও দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং। তীব্র গরমে বিদ্যুৎহীন থাকা শুধু অস্বস্তিকরই নয়, বরং এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য এই পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, প্রতি বছর একই সময়ে কেন এই সংকট পুনরাবৃত্তি ঘটে এবং উত্তরণে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ কেন দৃশ্যমান হচ্ছে না?
তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আধুনিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় এই বর্ধিত চাহিদা মোকাবিলার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশে গ্রীষ্মকাল এলেই বিদ্যুৎ বিভাগের ‘প্রস্তুতির অভাব’ বা ‘জ্বালানি সংকট’-এর পুরোনো অজুহাত সামনে আসে। এই অজুহাত দিয়ে ভুক্তভোগী জনগণের ক্ষোভ প্রশমিত করা সম্ভব নয়।
বিদ্যুৎ সংকট মূলত দুটি প্রধান কারণে তৈরি হচ্ছে- জ্বালানি ঘাটতি এবং বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য এবং ডলার সংকটের কারণে সময়মতো কয়লা বা গ্যাস আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে। অন্যদিকে, দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণ সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনগুলো অতিরিক্ত লোড নিতে পারছে না। ফলে কোথাও লোডশেডিং প্রয়োজন না থাকলেও কারিগরি ত্রুটির কারণে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকছে।
এই সংকট থেকে উত্তরণে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি এবং স্বল্পমেয়াদি- উভয় ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রথমত, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এর জন্য অর্থ বরাদ্দ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। শুধু আমদানিনির্ভর না হয়ে নিজস্ব গ্যাস উত্তোলনে গতি আনতে হবে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি যেমন সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধিতে বাস্তবমুখী প্রকল্প হাতে নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সচেতনতা ও কঠোর নজরদারি। এখনও দেখা যায়, দিনের বেলায় সরকারি-বেসরকারি অফিস ও শপিং মলগুলোতে বিদ্যুতের অপচয় হচ্ছে। বাণিজ্যিক এলাকা ও বিলাসবহুল ভবনগুলোতে এসির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর তদারকি প্রয়োজন। সরকার এ বিষয়ে বারবার আহ্বান জানালেও তার প্রয়োগ দৃশ্যমান নয়। এলাকাভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিকল্পনা বা ‘লোড ম্যানেজমেন্ট’ করা যেতে পারে, যাতে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় টানা কয়েক ঘণ্টা লোডশেডিং না হয়।
তৃতীয়ত, অবকাঠামোগত উন্নয়ন। বিতরণ ব্যবস্থার ত্রুটি নিরসনে গ্রিড লাইন আধুনিকায়ন করা জরুরি। স্মার্ট প্রি-পেইড মিটারিং ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সিস্টেম লস কমিয়ে বিদ্যুতের অপচয় রোধ করা সম্ভব।
চতুর্থত, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। লোডশেডিংয়ের সময়সূচি নিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে লুকোচুরি খেলা বন্ধ করতে হবে। বিদ্যুৎ বিভাগ যে সময়সূচি দেয়, তা অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর হয় না। মানুষের জানার অধিকার আছে কেন বিদ্যুৎ নেই এবং কখন আসবে। এই যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে মানুষের বিরক্তি ও ক্ষোভ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। তীব্র গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত। মানুষের উৎপাদনশীলতা কমছে, হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে শুধু সান্ত¡না নয়, বরং মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান সমাধান প্রয়োজন। বিদ্যুৎ খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সাহসী ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। পরিশেষে বলা যায়, বিদ্যুৎ এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি বেঁচে থাকার ন্যূনতম নাগরিক অধিকার। উন্নয়নের স্লোগান তখনই সার্থক হবে, যখন সাধারণ মানুষ দাবদাহের দিনে অন্তত ফ্যান বা এসি চালিয়ে স্বস্তিতে থাকতে পারবে। সরকারের কাছে প্রত্যাশা, তারা দ্রুত জ্বালানি সংকট সমাধান এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে জনজীবনে কিছুটা হলেও স্বস্তি বয়ে আনবে।