ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬, ২০ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ : বাংলাদেশের ওপর এর বহুমুখী প্রভাব

মো. সাইদুর রহমান
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ : বাংলাদেশের ওপর এর বহুমুখী প্রভাব

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান সামরিক সংঘাত বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ (Operation Epic Fury) নামে যে বৃহৎ আকারের সামরিক অভিযান শুরু হয়, তাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের অন্তত নয়টি শহরে সামরিক স্থাপনা, পারমাণবিক কেন্দ্র এবং সরকারি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে হামলা চালায়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি এবং মিত্র দেশগুলোর ওপর পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে, যার ফলে কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত সরাসরি যুদ্ধের কবলে পড়ে। এই যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য কোনো সুদূর ভূ-রাজনৈতিক ঘটনা না হলেও এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শিল্প খাতের জন্য একটি অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা চালানোর পর। তেহরান ঘোষণা করে যে আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তাদের কাছে কোনো ‘রেড লাইন’ বা সীমারেখা নেই। ইরানের পাল্টা আঘাতে কুয়েতে একজন বাংলাদেশি শ্রমিক আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। এছাড়া বাহারাইনেও একজনের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া গেছে। এই সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা এবং বিমান পথগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। গত তিন দিনে ঢাকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যগামী ১০২টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। যা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুতর পরিবহন সংকট তৈরি করে। বিশেষ করে যাদের ভিসার মেয়াদ কম, তাঁরা চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের মূল ক্ষমতা আইআরজিসি’র হাতে ন্যস্ত থাকায় শাসন পরিবর্তনের যে স্বপ্ন ট্রাম্প দেখছেন তা অর্জন করা সহজ হবে না। আইআরজিসি ইরানের অর্থনীতি ও পেশী শক্তির মূল উৎস এবং তারা সহজে পরাজয় স্বীকার করবে না। এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা বিশ্বজুরে পরিবহন ব্যবস্থাকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

এদিকে বিশ্বের খনিজ তেল ও গ্যাসের প্রধান সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormyu) এই যুদ্ধের ফলে সরাসরি অবরুদ্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কর্পস (IRGC) কৌশলগত এই জলপথ দিয়ে সব বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেয়। হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এবং বিশ্বের মোট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) সরবরাহের ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। গোল্ডম্যান স্যাকস এবং ভারতের ইক্যুইরাস সিকিউরিটিজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১০ থেকে ১৩০ ডলারে উঠে যেতে পারে। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা করছেন যে এটি ১৫০ থেকে ১৮০ ডলার পর্যন্তও পৌঁছাতে পারে। এই উচ্চমূল্য বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিতে পারে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ, সার উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় জ্যামিতিক হারে বাড়বে, যা সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাবে। বাংলাদেশের জন্য হরমুজ প্রণালী শুধু একটি সুদূর ভূ-রাজনৈতিক বিন্দু নয়, এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার মূল ধমনী। বাংলাদেশের প্রাথমিক জ্বালানি আমদানির প্রায় ৯০ শতাংশ এই জলপথের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। এদিকে, প্রায় ৯৪.৬ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন যেখানে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল, সেখানে হরমুজ প্রণালীর সামান্যতম অস্থিরতা বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডকে বিপর্যস্ত করতে পারে। জ্বালানি আমদানিতে সামান্য ব্যাঘাত ঘটলে শিল্প কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং লোডশেডিং বৃদ্ধি পাবে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে রপ্তানি আয়ে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ৫ ডলার বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের বার্ষিক আমদানি ব্যয় প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কোটি ডলার বেড়ে যায়।

এই যুদ্ধ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি বাংলাদেশে মুদ্রাস্ফীতির প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়, যা বাজারের প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। চলমান যুদ্ধের ফলে জ্বালানি আমদানির জন্য অতিরিক্ত কয়েক বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন হলে রিজার্ভের স্থিতি বজায় রাখাও অসম্ভব হয়ে পড়বে। এদিকে পোশাক শিল্পও (RMG) এই যুদ্ধের ফলে বহুমুখী সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে। পোশাক রপ্তানি বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দেয়, কিন্তু যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ বন্ধ হওয়া এবং হরমুজ প্রণালীর ঝুঁকির ফলে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজের মতো বড় বড় এয়ারলাইন্সগুলোর ফ্লাইট স্থগিত হওয়ায় ইউরোপ ও আমেরিকায় জরুরি পণ্য পাঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাছাড়া, হরমুজ প্রণালী বা সুয়েজ খালে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে জাহাজগুলোকে দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ (Cape of Good Hope) ঘুরে যেতে হবে, যাতে সময় ও খরচ ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে। এছাড়া কাঁচামাল আমদানির খরচ বাড়লে পোশাকের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, যা বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে দুর্বল করে দেবে।

এছাড়া, বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম খুঁটি রেমিট্যান্স প্রবাহ এই যুদ্ধের ফলে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পরেছে। মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক সরাসরি যুদ্ধের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। রেমিট্যান্সের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে। ড্রোন হামলায় বাংলাদেশী শ্রমিকের আহত এবং মৃত্যু হওয়ার ঘটনা প্রবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিকে সংকুচিত করতে পারে, যার ফলে নতুন শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এরইমধ্যে বিমান যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় অনেক নতুন কর্মী বিদেশ যেতে পারছেন না। তাছাড়া যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে শ্রমিকদের সঞ্চয়ও কমে যাবে এবং দেশে পাঠানো অর্থের পরিমাণও হ্রাস পাবে। একইসঙ্গে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও একটি হুমকি তৈরি করেছে। বাংলাদেশ চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার দাবি করলেও গম, ভোজ্যতেল এবং ডালের জন্য আমদানির ওপর ব্যাপক নির্ভরশীল। বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় সারের বড় অংশ সৌদি আরব, কাতার ও রাশিয়া থেকে আমদানি করে। তাছারা বাংলাদেশ বার্ষিক ৬০ থেকে ৭০ লাখ টন গম আমদানি করে, যার সিংহভাগ আসে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে। এসবের দাম ও সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়লে। স্বল্প আয়ের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে।

যুদ্ধের এই অর্থনৈতিক প্রভাব বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। নতুন সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ (Bangladesh First) পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেছে, যা ভারত, চীন এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে চায়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত নতুন বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশকে পশ্চিমা বলয়ের দিকে আরও ঝুঁকে পড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন সহযোগিতা বজায় থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের মতো গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বর্তমান সরকারের অন্যতম কৌশল। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এই কৌশলগত অবস্থানকে আরও জটিল করে তুলবে, কারণ চীন ও রাশিয়া ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং বাংলাদেশ তাদের সঙ্গেও সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি বৈদেশিক নীতি বিষয়ক চ্যালেঞ্জ নয়, এটি দেশের প্রতিটি মানুষের জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব বিস্তারকারী একটি অর্থনৈতিক বিপর্যয়। হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হওয়া এবং তেলের দামের আকাশচুম্বী বৃদ্ধি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে খাদের কিনারে নিয়ে যেতে পারে। তবে ২০২৬ সালের যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তি এই গভীর সংকটের মধ্যেও কিছুটা আশার আলো দেখিয়েছে।

মো. সাইদুর রহমান

শিক্ষার্থী, আইন ও ভূমি প্রশাসন অনুষদ, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত