প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৯ মার্চ, ২০২৬
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হলো জ্বালানি। শিল্পায়ন, যাতায়াত, কৃষিকাজ থেকে শুরু করে দৈনন্দিন গৃহস্থালি- সবক্ষেত্রেই আমরা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। তবে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক ভূরাজনীতি, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন এবং ক্রমবর্ধমান বাজারমূল্যের কারণে জ্বালানি সংকট আজ শুধু একটি দেশের সমস্যা নয়, বরং একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে জ্বালানি ব্যবহারে সতর্ক হওয়া এবং সাশ্রয়ী মনোভাব গড়ে তোলা এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং সময়ের অপরিহার্য দাবি।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ প্রাকৃতিক গ্যাস ও আমদানিকৃত তরল জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের ওঠানামা এবং ডলার সংকটের কারণে এলএনজি (LNG) আমদানিতে যে ব্যয়ভার তৈরি হচ্ছে, তা জাতীয় অর্থনীতির ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে। দেশের অভ্যন্তরে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুতও ধীরে ধীরে কমে আসছে। এই পরিস্থিতিতে যদি আমরা জ্বালানি ব্যবহারে এখনই মিতব্যয়ী না হই, তবে অদূর ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও শিল্পোৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
জালানি সাশ্রয়ের প্রথম ধাপ শুরু হওয়া উচিত আমাদের ঘর থেকে। অযথা বাতি বা পাখা জ্বালিয়ে রাখা আমাদের একটি মজ্জাগত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। দিনের আলো থাকতেই কৃত্রিম আলোর ব্যবহার কমানো, অপ্রয়োজনে এসি (AC) ব্যবহার না করা এবং ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বৈদ্যুতিক সুইচ বন্ধ নিশ্চিত করার মতো ছোট ছোট পদক্ষেপ বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে অফিস-আদালতে এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে না রাখা এবং প্রাকৃতিক বাতাসের প্রবাহ নিশ্চিত করা গেলে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব। মনে রাখতে হবে, আপনার সাশ্রয় করা এক ইউনিট বিদ্যুৎ অন্য একটি শিল্পকারখানায় চাকা ঘোরাতে সাহায্য করতে পারে।
পরিবহন খাত জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ ভোগ করে। ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তোলা গেলে জ্বালানি আমদানির ওপর চাপ অনেকটা কমবে। একইসঙ্গে শিল্পকারখানাগুলোতে পুরোনো ও ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রপাতির বদলে আধুনিক ও শক্তি-সাশ্রয়ী (Energy Efficient) প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কারখানায় প্রচুর জ্বালানি অপচয় হয়। নিয়মিত ‘এনার্জি অডিট’ বা জ্বালানি নিরীক্ষার মাধ্যমে এই অপচয় রোধ করা সম্ভব।
জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে নজর দিতে হবে। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি বা বায়োগ্যাস প্রকল্পের সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি। সরকারি ভবনের ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপন বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি ব্যক্তিগত উদ্যোগেও মানুষকে উৎসাহিত করতে হবে। আধুনিক বিশ্বে টেকসই উন্নয়নের মূলমন্ত্রই হলো- পরিবেশবান্ধব জ্বালানি। বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অনুকূল অবস্থানে রয়েছে, যা কাজে লাগিয়ে আমরা আমাদের জ্বালানি খাতের একটি বড় অংশ সুরক্ষিত করতে পারি।
জ্বালানি সাশ্রয়ে শুধু ব্যক্তিগত প্রচেষ্টাই যথেষ্ট নয়, এর জন্য প্রয়োজন কঠোর রাষ্ট্রীয় তদারকি। অবৈধ বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, সিস্টেম লস কমানো এবং জ্বালানি চুরির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া আমদানিকৃত জ্বালানির বিকল্প হিসেবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে গ্যাস অনুসন্ধানে আরও বেশি বিনিয়োগ ও গতি আনা প্রয়োজন। একইসঙ্গে গণমাধ্যমে প্রচারণার মাধ্যমে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। সাধারণ মানুষকে বোঝাতে হবে যে, জ্বালানি সাশ্রয় মানেই নিজের অর্থ সাশ্রয় এবং দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
পরিশেষে বলা যায়, জ্বালানি কোনো অফুরন্ত সম্পদ নয়। এটি একটি মূল্যবান রাষ্ট্রীয় আমানত। বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সম্পদের অপচয় মানেই দেশের অগ্রগতিকে পিছিয়ে দেওয়া। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশ রেখে যেতে হলে আমাদের প্রতিটি ফোঁটা জ্বালানি ও প্রতিটি ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারে সর্বোচ্চ সতর্ক হতে হবে। অপচয় রোধ এবং সাশ্রয়ী জীবনযাপনই হতে পারে, এই সংকটের টেকসই সমাধান। আমরা যদি আজ সতর্ক না হই, তবে আগামীকাল আমারা অন্ধকারের মুখোমুখি হতে পারি। তাই আসুন, জ্বালানি সাশ্রয়কে একটি জাতীয় আন্দোলনে পরিণত করি এবং দেশের সমৃদ্ধিতে শামিল হই।