প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৮ মার্চ, ২০২৬
পবিত্র ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটি কাটিয়ে কর্মব্যস্ত নগরী ঢাকায় ফিরতে শুরু করেছে মানুষ। নাড়ির টানে বাড়ি যাওয়ার আনন্দ শেষে এখন ফেরার পালা। প্রতিবছরের মতো এবারও রেল স্টেশন, লঞ্চ টার্মিনাল এবং বাস টার্মিনালগুলোতে উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, যাওয়ার সময়ের মতো ফেরার পথেও যাত্রীদের পোহাতে হচ্ছে নানা ভোগান্তি। বিশেষ করে গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহনের দাপট সাধারণ মানুষের ফেরার আনন্দকে বিষাদে পরিণত করছে। এই প্রেক্ষাপটে একটি নিরাপদ ও ভোগান্তিহীন ফিরতি যাত্রা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
ঈদের ফিরতি যাত্রায় সবচেয়ে বড় আপত্তির জায়গা হলো অতিরিক্ত ভাড়া। সরকারের পক্ষ থেকে নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা থাকলেও অনেক পরিবহন মালিক ও শ্রমিক তা তোয়াক্কা করছেন না। বিশেষ করে দূরপাল্লার বাসগুলোতে ‘ফিরতি ট্রিপ খালি যাবে’- এমন অজুহাত দেখিয়ে দ্বিগুণ ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া রেলের টিকিটের জন্য হাহাকার এবং লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাইয়ের চিরাচরিত চিত্র তো রয়েছেই।
এর পাশাপাশি সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মহাসড়কগুলোতে যানবাহনের প্রচণ্ড চাপ, লক্কড়-ঝক্কড় বাসের যান্ত্রিক ত্রুটি এবং চালকদের বেপরোয়া গতি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে দীর্ঘ যানজট যাত্রীদের ক্লান্তিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
একটি সুশৃঙ্খল ফিরতি যাত্রা নিশ্চিত করতে প্রশাসন, পরিবহন মালিক এবং যাত্রী- এই তিন পক্ষকেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। নিচে নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক ভ্রমণের জন্য কিছু জরুরি পদক্ষেপ ও পরামর্শ তুলে ধরা হলো:
১. কঠোর মনিটরিং ও আইনি ব্যবস্থা
পরিবহন সেক্টরে নৈরাজ্য বন্ধে বিআরটিএ (BRTA) এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। প্রতিটি টার্মিনালে ভ্রাম্যমাণ আদালতের উপস্থিতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন যাতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়কারী এবং লাইসেন্সবিহীন চালকদের তাৎক্ষণিক শাস্তি দেওয়া যায়। বিশেষ করে রাতে হাইওয়ে পুলিশের টহল জোরদার করতে হবে।
২. অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন বর্জন
লঞ্চ এবং ট্রেনের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি যাত্রী তোলা হয়। এটি বড় ধরনের দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। ‘আগে পৌঁছানোর’ চেয়ে ‘নিরাপদে পৌঁছানো’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কর্তৃপক্ষকে কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে যেন কোনো যানই অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে গন্তব্যে রওনা না দেয়।
৩. চালকদের বিশ্রাম ও সতর্কতা
দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকার ফলে চালকরা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। এই ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পরিবহন মালিকদের উচিত চালকদের পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া। পাশাপাশি চালকদেরও মনে রাখতে হবে, তাদের সামান্য একটি ভুল বা বেপরোয়া ওভারটেকিং কেড়ে নিতে পারে শত শত মানুষের প্রাণ।
৪. ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও সচেতনতা
যাত্রীদেরও নিজস্ব সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। অপরিচিত কারো দেওয়া খাবার বা পানীয় গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে, যা ‘অজ্ঞান পার্টি’ বা ‘মলম পার্টির’ হাত থেকে বাঁচার প্রাথমিক উপায়। এছাড়া চলন্ত অবস্থায় বাসের জানালা দিয়ে হাত বের না করা এবং ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ না করার বিষয়ে কঠোর সচেতনতা পালন করতে হবে।
৫. ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও বিকল্প রুট
রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো এবং সিগন্যাল ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল করা প্রয়োজন। যেখানে সম্ভব, বিকল্প সড়কগুলো ব্যবহারের নির্দেশনা দিলে মূল সড়কে চাপ কিছুটা কমবে।
উৎসবের সমাপন যেন বিষাদময় না হয়, সেদিকে আমাদের সবাইকে নজর দিতে হবে। ঈদ মানেই আনন্দ, আর সেই আনন্দ পূর্ণতা পায়, যখন প্রতিটি মানুষ সহি-সালামতে কর্মস্থলে ফিরে আসতে পারেন। পরিবহন খাতের অব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিনের সমস্যা হলেও যথাযথ তদারকি এবং কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ সদিচ্ছা প্রদর্শন করবেন। সুন্দর ও নিরাপদ হোক সবার ফিরতি পথ।