ঢাকা শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬, ২৮ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

সতর্কতা ও সচেতনতাই রুখবে হাম : একটি জরুরি আহ্বান

সতর্কতা ও সচেতনতাই রুখবে হাম : একটি জরুরি আহ্বান

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্যের অন্যতম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সংক্রামক ব্যাধি হাম। দেশের বিভিন্ন জেলায়, বিশেষ করে দুর্গম অঞ্চল এবং ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির খবর পাওয়া যাচ্ছে। এক সময় মনে করা হয়েছিল হাম প্রায় নির্মূলের পথে, কিন্তু টিকাদানে অনীহা, পুষ্টিহীনতা এবং জনসচেতনতার অভাবে এই ভাইরাসটি আবারও মাথাচারা দিয়ে উঠছে। শিশুদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এই রোগটি নিয়ন্ত্রণে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে এটি মহামারি আকার ধারণ করতে পারে।

হাম বা মেজেলস একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ। এটি শুধু সামান্য জ্বর বা ফুসকুড়ি নয়; সময়মতো চিকিৎসা ও সঠিক যত্ন না নিলে এটি নিউমোনিয়া, মস্তিস্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস), অন্ধত্ব এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু এবং গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকির মাত্রা অনেক বেশি। করোনা মহামারির সময় অনেক শিশু রুটিন টিকাদান থেকে বঞ্চিত হয়েছে, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় বড় একটি শূন্যস্থান তৈরি করেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অমূলক ভয় ও কুসংস্কার কাজ করছে।

ভিটামিন ‘এ’-র ঘাটতি থাকা শিশুদের ক্ষেত্রে হামের সংক্রমণ মারাত্মক রূপ নেয়।

হাম থেকে রেহাই পাওয়ার সবচেয়ে কার্যকর ও প্রধান অস্ত্র হলো টিকাদান। তবে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া রোধে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশ সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি অনুযায়ী শিশুকে ৯ মাস পূর্ণ হলে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস পূর্ণ হলে দ্বিতীয় ডোজ এমআর টিকা অবশ্যই দিতে হবে। একটি ডোজও বাদ দেওয়া চলবে না।

আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা : হাম একটি বায়ুবাহিত রোগ। যদি কোনো শিশুর শরীরে জ্বর ও লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়, তবে তাকে দ্রুত অন্য শিশুদের থেকে আলাদা (আইসোলেশন) করে রাখতে হবে। হাচি-কাশির সময় রুমাল ব্যবহারের অভ্যাস এবং বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোয়া নিশ্চিত করতে হবে।

পুষ্টিকর খাবার ও ভিটামিন ‘এ’ : হাম আক্রান্ত শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো জরুরি, কারণ এটি চোখের ক্ষতি রোধ করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার ও পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে।

হামের বিস্তার রোধে শুধু পরিবারের সচেতনতা যথেষ্ট নয়; এখানে রাষ্ট্র এবং সচেতন মহলের বড় ভূমিকা রয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগকে প্রতিটি এলাকা থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। কোথাও সংক্রমণের ক্লাস্টার দেখা দিলে সেখানে দ্রুত ‘আউটব্রেক রেসপন্স’ টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

রেডিও, টেলিভিশন ও সংবাদপত্রের পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ায় হামের ভয়াবহতা ও টিকার গুরুত্ব নিয়ে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। ধর্মীয় ও স্থানীয় নেতাদের এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা জরুরি।

ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে টিকার পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো শিশু যেন শুধু দূরত্বের কারণে টিকা থেকে বঞ্চিত না হয়।

অনেকেই মনে করেন, হাম হলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া বা ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজন নেই। এটি একটি মারাত্মক ভুল ধারণা। কবিরাজি চিকিৎসা বা ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভর করে শিশুর জীবনকে ছুঁকির মুখে ঠেলে দেবেন না। জ্বর তিন দিনের বেশি থাকলে বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে। মনে রাখবেন, ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই শ্রেয়।’

একটি সুস্থ সবল প্রজন্ম গড়ে তুলতে হলে আমাদের শিশুদের সংক্রামক ব্যাধিমুক্ত রাখা অপরিহার্য। হাম নির্মূলে বাংলাদেশের ইতিপূর্বের সাফল্য বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছিল। সেই অর্জিত সাফল্যকে অক্ষুণ্ণ রাখতে আমাদের আবারও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। অভিভাবক হিসেবে আপনার সচেতনতা, চিকিৎসক হিসেবে সঠিক পরামর্শ এবং সরকার হিসেবে কার্যকর ব্যবস্থাপনা- এই তিনের সমন্বয়েই সম্ভব হামমুক্ত বাংলাদেশ গড়া। আগামীকাল নয়, টিকাদানের সিদ্ধান্ত নিন আজই। আপনার সচেতনতাই পারে একটি শিশুর অমূল্য জীবন বাঁচাতে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত