ঢাকা রোববার, ১২ এপ্রিল ২০২৬, ২৯ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

পহেলা বৈশাখ : গ্রামীণ ও শহুরে রীতি

মো. আমিনুর রহমান
পহেলা বৈশাখ : গ্রামীণ ও শহুরে রীতি

বাঙালি লোকজ জীবন ও নাগরিক জীবনের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করে পহেলা বৈশাখ। গ্রাম হোক কিংবা শহর­- নববর্ষ বাঙালি জাতিকে একত্রিত করে জাতীয়তাবোধে। শেকড়সন্ধানী এই উৎসব বাঙালিকে দাঁড় করায় তার নিজস্ব মৌলিকতায়। জাতি, ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে নববর্ষ পরিণত হয় বাঙালির প্রাণের উৎসবে। শুধু বাঙালিরাই নয়, বাংলা ভাষাভাষী আদিবাসী ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীরাও সমানভাবে এ উৎসবকে বরণ করে নেয়।

নববর্ষ সকলের জীবনে নিয়ে আসে নতুন সম্ভাবনার বার্তা। পুরোনো দিনের জীর্ণতা মুছে ফেলে নতুন স্বপ্নের আলোয় হৃদয় ভরে ওঠে। তাই নানা বর্ণিল আয়োজনের মধ্য দিয়ে মানুষ স্বাগত জানায় নতুন বছরকে।

পহেলা বৈশাখ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন। এটি বাঙালির ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণের দিন। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরাসহ দেশ-বিদেশে বসবাসরত বাঙালিরা দিনটি উদযাপন করে। বাংলাদেশে এটি জাতীয় উৎসব হিসেবে পালিত হয়।

ইতিহাস অনুযায়ী, মুঘল সম্রাট আকবরের সময় বাংলা সনের প্রবর্তনের মাধ্যমে কৃষিকাজ ও রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে এই বর্ষপঞ্জির প্রচলন হয়। পরবর্তীতে এটি সাংস্কৃতিক রূপ লাভ করে। একসময় নববর্ষ ছিল ঋতুভিত্তিক উৎসব, যার সঙ্গে কৃষির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সেই সময় থেকেই নববর্ষ উদযাপনের প্রচলন শুরু হয়।

পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে গ্রাম-গঞ্জে বসে বৈচিত্র্যপূর্ণ মেলা। এসব মেলায় পাওয়া যায় ঐতিহ্যবাহী নানা লোকজ সামগ্রী। বিকেলে লাঠিখেলা, সাপ খেলা, সার্কাস, জাদু এবং শিশুদের জন্য বিভিন্ন প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়। সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যেখানে পরিবেশিত হয় লোকজ গান, নাটক ও নৃত্য।

এই দিনে ছেলে-মেয়েরা লাল-সাদা পোশাকে সেজে ওঠে। পান্তা-ইলিশ ও বিভিন্ন ভর্তা বিশেষ খাবার হিসেবে পরিবেশিত হয়। তবে গ্রামাঞ্চলে প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসেই পান্তা ও ভর্তার উপস্থিতি থাকে, তাই সেখানে নববর্ষের ঐতিহ্য আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। শহরে অনেক সময় এটি কিছুটা আনুষ্ঠানিক বা প্রদর্শনমূলক হয়ে পড়ে।

মূলত নববর্ষকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ ঐতিহ্যগুলো অত্যন্ত চমৎকারভাবে প্রকাশ পায়। গ্রামীণ মায়েরা পহেলা বৈশাখের আগের দিন থেকেই হরেক রকম শাকসবজি সংগ্রহ করেন। নববর্ষের দিন পান্তা-ইলিশের সঙ্গে বিভিন্ন শাক দিয়ে রান্না করা ‘সাত শাক’ পরিবেশন করা হয়। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা দলবেঁধে রাস্তায় আনন্দ শোভাযাত্রায় অংশ নেয়। হৈচৈয়ে মেতে ওঠে তারা, যা বাঙালির জাতীয় ঐতিহ্যকে ধারণ করে। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়, যা ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ইউনেস্কো বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি লাভ করে। এ সময় শিশুরা আবির মেখে আনন্দ করে।

অন্যদিকে শহরে অনেক সময় স্কুল-কলেজ কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের শোভাযাত্রায় অংশ নিতে উৎসাহিত করে। তবুও শহরে অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। এছাড়া বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। ঘরে ঘরে এই দিনে পান্তা-ইলিশসহ নানা ভর্তার আয়োজন থাকে, যা অনেক ক্ষেত্রে একটি সামাজিক প্রদর্শনে রূপ নেয়। শহরে নববর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত মেলা অনেক সময় বাণিজ্যিক রূপ ধারণ করে, ফলে লোকজ সংস্কৃতির কিছু অংশ আড়ালে পড়ে যায়। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে আধুনিক গানের পরিবেশ বেশি লক্ষ্য করা যায়।

নববর্ষের প্রাক্কালে ব্যবসায়ীরা নতুন বছরের সূচনা উপলক্ষে পুরোনো হিসাব বন্ধ করে নতুন খাতা খোলেন। এ উপলক্ষে আয়োজন করা হয় ‘শুভ হালখাতা’। খদ্দেরদের মিষ্টিমুখ করিয়ে পুরোনো হিসাবের সমাপ্তি টানা হয়। এই প্রথাটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি সামাজিক উৎসবে রূপ নিয়েছে এবং নববর্ষের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। গ্রামীণ সমাজে এটিকে মঙ্গলজনক হিসেবে মেনে পালন করা হয়।তবে শহরে এটি ব্যবসায়ীদের বকেয়া টাকা উত্তলনের রীতিতে পরিণত হয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে, পহেলা বৈশাখ আমাদের সকলের উৎসব। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই এক কাতারে মিলিত হয়ে এই দিনটি উদযাপন করা উচিত। এটি আমাদের শেখায় একসঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে সাম্যের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে এক অভিন্ন জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ হতে।

মনে রাখা প্রয়োজন, বাংলা নববর্ষের প্রধান ধারক ও বাহক হলো গ্রামীণ জনগোষ্ঠী। এদের অধিকাংশই কৃষক, যারা আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে লালন করেন এবং আমাদের অন্ন জোগান। তাদের কারণেই পহেলা বৈশাখের ঐতিহ্যবাহী রূপ আজও টিকে আছে। নববর্ষের সূচনায় আমাদের প্রত্যাশা বাংলাদেশ এগিয়ে যাক অমিত সম্ভাবনার পথে। বাংলা নববর্ষে এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

মো. আমিনুর রহমান

শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত