ঢাকা রোববার, ১২ এপ্রিল ২০২৬, ২৯ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক আধিপত্যের পুনর্বিন্যাস

জাহিদ হাসান
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক আধিপত্যের পুনর্বিন্যাস

ইরান-ইসরায়েল-আমরিকার পাল্টাপাল্টি আক্রমণ ও দীর্ঘ বাকবিতণ্ডার পর ইরানের কঠোর দশ দফা মেনে নিয়ে যুদ্ধ বন্ধ করতে রাজি হয়েছে আমেরিকা। এই দশ দফা মেনে নিতে আপত্তি সত্ত্বেও ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি ও দশ দফা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। এর আগে পাকিস্তানের মাধ্যমে আমেরিকা ইরানের কাছে একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাঠালে ইরান তা প্রত্যাখ্যান করে এবং পাল্টা দশ দফা ঘোষণা করে যুদ্ধবিরতি চুক্তি করতে বলে। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার এক্স হ্যান্ডেলে একটি পোস্টে ইরানকে ধ্বংসের হুমকি দিয়ে বিবৃতি দেয়। কিন্তু ইরান তার কঠোর জবাব দেয় এবং তাদের অবস্থানে তারা দৃঢ় থাকে। ট্রাম্পের আল্টিমেটাম শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ আগে ইরানের দশ দফা মেনে নিয়ে একপ্রকার বাধ্য হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়। একদিকে ইরান দাবি করছে এটা তাদের বিজয় অন্যদিকে ট্রাম্প তার বিজয় হিসেবে দাবি করে যাচ্ছে।

হোয়াইট হাউস ও আমেরিকান নিউজ এজেন্সিগুলো দাবি করছে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই যুদ্ধবিরতিতে আমেরিকার বিজয় হয়েছে। কিন্তু অন্যদিকে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরানের কাছে ট্রাম্প যে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাঠিয়েছিল তা কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে ইরান যে দশ দফা ঘোষণা করেছে তা সুস্পষ্ট ইরানেরই বিজয় নিশ্চিত করে। ইরান যে শর্তগুলো দিয়েছে তা মেনে নিলে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের একচ্ছত্র মোড়লগিরি প্রতিষ্ঠিত হবে। ইরান যে শর্তগুলো দিয়েছে তার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো ইরানের নিউক্লিয়ার সমৃদ্ধকরণ মেনে নিয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রাখতে হবে এবং কোনো প্রকার বাধা দেওয়া যাবে না।

এই এক প্রস্তাবেই একচ্ছত্র সামরিক আধিপত্য রাখতে পারবে মধ্যপ্রাচ্যে। এর সঙ্গে আরও একটা প্রস্তাব হলো পুরো মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সব যুদ্ধকালীন ঘাঁটি এবং সেনা মোতায়েন কেন্দ্র থেকে মার্কিন সৈন্য সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের শর্ত দিয়েছে ইরান। এর থেকে বোঝা যাচ্ছে যে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের মোড়ল হতে চলেছে।

অন্যদিকে ইরান আরও একটা শর্ত দিয়েছে তা হলো ইরানের সব মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে, যেমন হামাস, হিজবুল্লাহ, হুতিদের, চলমান যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। এই শর্ত মেনে নেওয়া মানে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ব্যাকড এবং ইসরায়েল আমেরিকা বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নব-উত্থান। এই গোষ্ঠীগুলোর উত্থান হলে ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে আরও কোণঠাসা হয়ে পড়বে এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ভিত্তি আরও মজবুত হবে। এর থেকে আরও স্পষ্ট হয় যে এই শর্তগুলো মানলে মধ্যপ্রাচ্যে নিঃশর্তভাবে ইরানের আধিপত্যও মেনে নিতে হবে ইসরায়েল-আমেরিকার। ইরানের দশ দফা শর্তের অন্যতম একটা কঠোর শর্ত হলো হরমুজ প্রণালীতে ইরানের একচ্ছত্র আধিপত্য। ইরান প্রস্তাব দিয়েছে যে তাদের সশস্ত্র বাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে হরমুজ প্রণালীর কার্যক্রম। এটি কার্যকর হলে এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথে ইরানের অপ্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অবস্থান তৈরি হবে। এ ছাড়া তারা একটি ‘নিরাপদ ট্রানজিট প্রটোকল’ তৈরির দাবি করেছে, যা এই প্রণালিতে ইরানের আধিপত্য নিশ্চিত করবে। ইরান আরও একটি আইনি নিরাপত্তার শর্ত জুড়ে দিয়েছে তাদের দশ দফা শর্তের মধ্যে। ভবিষ্যতে যেন এই চুক্তি থেকে সরে আসতে না পারে এর জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি বাধ্যতামূলক রেজ্যুলেশন পাস করাতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে ইসরায়েল, আমেরিকা বা অন্য কোনো শক্তি ইরানে আগ্রাসন না চালাতে পারে। এছাড়া এই যুদ্ধে ইরানের অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষয়ক্ষতির দরুন ইরানকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ভবিষ্যতে আগ্রাসন না চালানোর অঙ্গীকার দিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে রেজুলেশন পাস করাতে হবে। এবং ইরানের উপর থাকা সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে। সর্বশেষ ইরানের এই দশ শর্ত নিঃশর্তভাবে তাৎক্ষণিক কার্যকর করতে হবে।

এরআগে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার আধিপত্য ছিল একচ্ছত্র এবং ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার প্রক্সি মনে করা হয়। কিন্তু ইরানের এই দশ শর্তের আড়ালে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে শক্তির পুনর্বিন্যাস কিভাবে হবে তা দেখা যাক। ইরানের প্রস্তাবিত ১০ দফা শর্ত যা উপরিভাগে সংঘাত নিরসনের আহ্বান জানালেও এর অন্তর্নিহিত লক্ষ্য অনেক গভীর ও সুদূরপ্রসারী। এটি শুধু যুদ্ধবিরতির কোনো সাধারণ চুক্তি বললে ভুল হবে বরং এমন এক ভূ-রাজনৈতিক রূপরেখা, যা বাস্তবায়িত হলে পুরো অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্য আমূল পাল্টে যেতে পারে এবং একটি নতুন ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে ইরানকে প্রতিষ্ঠিত করবে। প্রথমত, এই প্রস্তাবের শুরুতেই যে আঞ্চলিক সংঘাত বন্ধের কথা বলা হয়েছে, তা আপাতদৃষ্টিতে শান্তিপূর্ণ মনে হলেও এর কৌশলগত তাৎপর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গাজা, লেবানন কিংবা ইয়েমেন এই তিনটি ফ্রন্টে ইরানের যে প্রক্সি নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, তা কার্যত অক্ষত থাকবে। যুদ্ধবিরতি মানে এই নয় যে এসব শক্তি বিলুপ্ত হবে, বরং তারা পুনর্গঠনের সময় পাবে, শক্তি সঞ্চয় করবে এবং ভবিষ্যতে আরও সংগঠিতভাবে ফিরে আসবে। অন্যদিকে, ইসরাইলের মতো রাষ্ট্র, যার নিরাপত্তা নীতি মূলত প্রি-এম্পটিভ স্ট্রাইক বা আগাম হামলার ওপর নির্ভরশীল, তারা কার্যত হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়বে। ফলে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকলেও তা প্রয়োগের সুযোগ হারাবে। দ্বিতীয়ত, হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে ইরানের প্রস্তাব মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক রাজনীতির কেন্দ্রে আঘাত হানে।

বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই পথের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং জাহাজ চলাচলে ফি আরোপের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে, ইরান শুধু একটি আঞ্চলিক শক্তি নয় বরং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠবে। এতদিন এই অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি ছিল ‘নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ’-এর নামে প্রভাব বিস্তারের একটি উপায়। কিন্তু ইরান যদি এই দায়িত্ব নিজ হাতে তুলে নেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সেই উপস্থিতির যৌক্তিকতা ও প্রভাব দুই-ই প্রশ্নের মুখে পড়বে। তৃতীয়ত, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ক্ষতিপূরণ এবং আটকে থাকা সম্পদ ফেরতের দাবি ইরানের জন্য এক বিশাল অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের দ্বার খুলে দিতে পারে।

দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপে থাকা দেশটি হঠাৎ করেই বিপুল অর্থনৈতিক সম্পদ হাতে পেলে তা শুধু অভ্যন্তরীণ উন্নয়নেই ব্যয় হবে না; বরং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারেও ব্যবহৃত হবে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে কার্যকর কূটনৈতিক অস্ত্র অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাব ক্ষুণ্ণ হবে। ফলে ভবিষ্যতে ইরানকে চাপ দেওয়ার সক্ষমতা অনেকটাই সীমিত হয়ে যাবে। চতুর্থত, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকারের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চাওয়া যা সরাসরি পারমাণবিক সক্ষমতার দরজা খুলে দেওয়ার মতো। যদিও এটি শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের নামে উপস্থাপিত, বাস্তবে এটি এমন এক অবস্থান তৈরি করবে, যেখানে ইরান খুব দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে। এই সম্ভাবনাই ইসরায়েলের জন্য অস্তিত্বগত হুমকি তৈরি করবে এবং আরব বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোকে নতুন করে তাদের নিরাপত্তা কৌশল ভাবতে বাধ্য করবে। এই প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল হয়ে পড়বে। ইসরায়েল একদিকে তার চারপাশে ইরান-সমর্থিত শক্তিগুলোর উপস্থিতি মেনে নিতে বাধ্য হবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক চুক্তির সীমাবদ্ধতায় সরাসরি সামরিক প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবে না। ফলে তার কৌশলগত স্বাধীনতা সংকুচিত হবে। আর যুক্তরাষ্ট্র, যার মধ্যপ্রাচ্যে উপস্থিতির মূল দুটি ভিত্তি এক. তেলের নিরাপত্তা ও দুই. ইসরায়েলের সুরক্ষা এই দুটিই যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে, তাহলে তাদের জন্য এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা ক্রমশ ব্যয়বহুল ও অকার্যকর হয়ে উঠবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি ঘটতে পারে আঞ্চলিক জোট রাজনীতিতে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলো এতদিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু যদি তারা দেখতে পায় যে ইরান ক্রমশ অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত হচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্র কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারছে না, তাহলে তারা বাস্তবতার নিরিখে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিন্যাস করতে বাধ্য হবে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এক ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হবে, যেখানে ইরান হবে কেন্দ্রীয় শক্তি এবং ইসরায়েল ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।

জাহিদ হাসান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত