প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১২ এপ্রিল, ২০২৬
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। আর এই পার্বণ-উৎসবের শ্রেষ্ঠতম মুকুট হলো পহেলা বৈশাখ। কালপরিক্রমায় আবারও আমাদের দুয়ারে উপস্থিত বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩। জীর্ণ পুরাতনকে পেছনে ফেলে, নতুনের কেতন উড়িয়ে সমাগত বৈশাখ আজ শুধু একটি তারিখ নয়, বরং বাঙালির আত্মপরিচয়, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং হাজার বছরের সংস্কৃতির এক অবিনাশী স্মারক।
পহেলা বৈশাখের গুরুত্ব শুধু আনন্দ-উল্লাসে সীমাবদ্ধ নয়; এর মূলে রয়েছে আমাদের কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থা এবং মুঘল সম্রাট আকবরের প্রবর্তিত ফসলি সনের ইতিহাস। খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে প্রবর্তিত এই সন আজ বাঙালির প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে এ এমন এক মিলনমেলা, যেখানে মানুষে-মানুষে ভেদাভেদ ঘুচে যায়। মঙ্গল শোভাযাত্রার রঙিন আবহে যখন রাজপথ মুখরিত হয়, তখন ইউনেস্কোর স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এই উৎসবটি বিশ্বদরবারে বাঙালির উদারতা ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতির জয়গান গায়।
ইতিহাসের বিভিন্ন সন্ধিক্ষণে বাঙালির এই উৎসবকে স্তব্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। পাকিস্তানি শাসনামলে যখন রবীন্দ্রসঙ্গীত ও বাঙালির সংস্কৃতিকে অবদমিত করার অপচেষ্টা চলেছিল, তখন ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান হয়ে উঠেছিল এক সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দু। আজও উগ্রবাদ ও মৌলবাদ এই উৎসবকে আঘাত করতে চায়। কিন্তু বাঙালির সংস্কৃতির ভিত এতই গভীরে যে, কোনো প্রতিকূলতাই আমাদের এই সর্বজনীন উদযাপনকে ম্লান করতে পারেনি। বরং প্রতিবছর নববর্ষ উদযাপনের বিশালতা প্রমাণ করে যে, আমরা আমাদের শেকড় থেকে বিচ্যুত হইনি।
আজকের বিশ্ব যখন যুদ্ধ, হিংসা আর সংকীর্ণতায় জর্জরিত, তখন পহেলা বৈশাখ আমাদের মাঝে সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে আসে। হালখাতার সেই লাল মলাটে যেমন পুরনো হিসেব চুকিয়ে নতুন শুরুর অঙ্গীকার থাকে, তেমনি আমাদের সামাজিক জীবনেও দুর্নীতি, অবক্ষয় আর অনৈক্য দূর করে এক সুস্থ সমাজ গঠনের শপথ নিতে হবে।
তবে উৎসবের এই দিনে আমাদের মনে রাখতে হবে, পহেলা বৈশাখ যেন কেবল কৃত্রিম আড়ম্বর বা নাগরিক বিলাসিতায় পর্যবসিত না হয়। পান্তা-ইলিশের হিড়িক কিংবা নামিদামি পোশাকের মোড়কে যেন বৈশাখের মূল সুর- অর্থাৎ গ্রামবাংলার মাটির গন্ধ এবং সাধারণ মানুষের সংহতি- হারিয়ে না যায়।
কবিগুরুর এই অমোঘ আহ্বানের মাধ্যমেই পহেলা বৈশাখ আমাদের নতুন করে বাঁচার প্রেরণা দেয়। সব কলুষতা ধুয়ে মুছে আমরা যেন এক সুখী, সমৃদ্ধ এবং বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তুলতে পারি। নববর্ষের এই মাহেন্দ্রক্ষণে আমাদের অঙ্গীকার হোক দেশপ্রেমের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে বাঙালির গৌরবময় সংস্কৃতিকে বিশ্বজুড়ে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া। নববর্ষের এই নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হোক প্রতিটি প্রাণ, প্রতিটি ঘর।