প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১২ এপ্রিল, ২০২৬
মানুষের শারীরিক সীমাবদ্ধতা যে আধ্যাত্মিক ও মানসিক শক্তির কাছে কতটা তুচ্ছ হতে পারে, তার এক জীবন্ত উপমা হয়ে ইতিহাসে নাম লিখিয়েছেন নাটোরের বড়াইগ্রামের শতায়ু বৃদ্ধ আব্দুর রহমান মোল্লা। ১২০ বছরের দীর্ঘ এক জীবন, যার শেষ পঁচিশটি বছর অতিবাহিত হয়েছে দৃষ্টিহীনতার অন্ধকারে, অথচ সেই অন্ধকারকে তিনি জয় করেছিলেন অন্তরের নূর বা ঐশ্বরিক আলো দিয়ে। নিজের ঘর থেকে মসজিদ পর্যন্ত টানানো দুইশ মিটারের একখণ্ড দড়ি আর বাঁশের অবলম্বন ছিল তার পৃথিবী জয়ের হাতিয়ার। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে সেই দড়ি ধরে টালমাটাল পায়ে হেঁটে তিনি পাঁচ ওয়াক্ত আজান দিয়েছেন এবং ইমামতি করেছেন, যা ইতিহাসে এক অদম্য সংকল্পের দলিল হিসেবে গণ্য হবে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখলে, বার্ধক্য এবং দৃষ্টিহীনতা মানুষের স্নায়বিক ও পেশিবহুল নিয়ন্ত্রণকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ১২০ বছর বয়সে একজন মানুষের পক্ষে ভারসাম্য রক্ষা করে চলাফেরা করা যেখানে প্রায় অসম্ভব, সেখানে আব্দুর রহমান মোল্লা প্রতিদিন পাঁচবার মসজিদে যাতায়াত করেছেন। এটি প্রমাণ করে যে, শরীরের জৈবিক ঘড়ির ওপর মনের নিয়ন্ত্রণ থাকলে স্নায়বিক উদ্দীপনা বার্ধক্যের জড়তাকে কাটিয়ে দেহকে সচল রাখতে পারে। তার এই শারীরিক সক্ষমতা আধুনিক চিকিৎসকদের জন্য এক বিস্ময়কর গবেষণার বিষয় হতে পারে।
মনোবিজ্ঞানের আঙ্গিকে বিচার করলে দেখা যায়, আব্দুর রহমান মোল্লার মধ্যে ছিল এক অসাধারণ ‘পজিটিভ মেন্টাল অ্যাটিটিউড’ বা ইতিবাচক মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি। যখন দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে যায়, তখন অধিকাংশ মানুষ বিষণ্ণতা বা ‘ডিপ্রেশনে’ নিমজ্জিত হয়, কিন্তু তিনি তার এই সীমাবদ্ধতাকে মেনে নিয়ে জীবনের নতুন এক রুটিন তৈরি করেছিলেন। এই যে একনিষ্ঠভাবে দড়ি ধরে পথ চলা, এটি তার মস্তিষ্কের ‘কগনিটিভ ম্যাপিং’ বা মানসিকভাবে পথ চেনার ক্ষমতার এক অনন্য উদাহরণ। তার এই দৃঢ় মনোবল প্রমাণ করে যে, লক্ষ্য যদি অবিচল থাকে, তবে বাহ্যিক অন্ধত্ব মানুষের সৃজনশীলতা ও দায়িত্ববোধকে স্তব্ধ করতে পারে না।
রসায়ন শাস্ত্রের ভাষায় বলতে গেলে, মানুষের শরীরের ভেতরে যে হরমোনাল নিঃসরণ ঘটে, তা মূলত তার আবেগ ও বিশ্বাসের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। আব্দুর রহমান মোল্লার মতো একজন ধর্মপ্রাণ মানুষের মস্তিষ্কে যখন আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও ইবাদতের তৃপ্তি কাজ করত, তখন তার শরীরে ‘ডোপামিন’ এবং ‘সেরোটোনিন’-এর মতো প্রশান্তিদায়ক রাসায়নিকের উপস্থিতি তাকে শারীরিক ব্যথা বা ক্লান্তি ভুলিয়ে দিতো। তার এই আধ্যাত্মিক সাধনা ছিল আসলে এক জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়া, যা তাকে দীর্ঘ ১২০ বছর ধরে জীবনীশক্তি জুগিয়ে গেছে এবং জরাগ্রস্ত শরীরেও এক অপার্থিব শক্তি সঞ্চার করেছিল।
সমাজবিজ্ঞানের প্রেক্ষাপটে এই বৃদ্ধ মোয়াজ্জিন ছিলেন একটি সামাজিক ঐক্যের প্রতীক এবং অনুপ্রেরণার কেন্দ্রবিন্দু। তার এই নিঃস্বার্থ সেবা এবং বিনিময়হীন ইবাদত সমাজের মানুষের মধ্যে ত্যাগের মহিমা ছড়িয়ে দিয়েছে। একটি স্বার্থপর পৃথিবীতে, যেখানে প্রতিটি কাজের পেছনে পারিশ্রমিক খোঁজা হয়, সেখানে তার বিনা পয়সায় আজান দেওয়া ও ইমামতি করা আমাদের সামাজিক কাঠামোতে এক অনন্য নৈতিক মূল্যবোধ যোগ করেছে।
মানববিজ্ঞানের ছাত্ররা যদি আব্দুর রহমান মোল্লার জীবন বিশ্লেষণ করেন, তবে তারা দেখতে পাবেন মানুষের টিকে থাকার আদিম ও অকৃত্রিম লড়াইয়ের এক রূপ। বিবর্তনের ধারায় মানুষ প্রতিকূল পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে শিখেছে, আর এই বৃদ্ধ তার দৃষ্টিহীনতাকে দড়ি ও বাঁশের মাধ্যমে এক যান্ত্রিক সরলিকরণে রূপান্তর করেছিলেন। প্রযুক্তির এই যুগে তিনি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, আদিম উদ্ভাবনী শক্তি ও ইচ্ছাশক্তি থাকলে সরু একগাছি রশিও হয়ে উঠতে পারে সাফল্যের মহাসড়ক।
ইচ্ছাশক্তি বিজ্ঞানের একটি বড় শিক্ষা হলো, বাধা যত বড় হবে, মানুষের উত্তরণ তত বেশি গৌরবময় হবে। আব্দুর রহমান মোল্লার কাছে মসজিদ পর্যন্ত যাওয়াটা শুধু একটি শারীরিক দূরত্ব ছিল না, এটি ছিল প্রতিদিনের এক চ্যালেঞ্জ। তার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল অলঙ্ঘনীয় ইচ্ছাশক্তির এক একটি জয়গান। বিজ্ঞান বলে, ইচ্ছাশক্তি হলো এক প্রকার মানসিক পেশি, যা চর্চার মাধ্যমে শক্তিশালী হয়। তিনি দীর্ঘ ২৫ বছর সেই পেশির চর্চা করেছেন, যার ফলে ১২০ বছর বয়সেও তার সংকল্পে কোনো চিড় ধরেনি।
এনার্জি বিজ্ঞান বা শক্তি বিজ্ঞানের তত্ত্বে বলা হয়, মহাবিশ্বের ইতিবাচক শক্তি তাদেরই ধরা দেয়, যারা নিজেদের ক্ষুদ্র শক্তিকে বৃহত্তর কোনো উদ্দেশে বিলিয়ে দেয়। এই বৃদ্ধের প্রতিদিনের আজান ছিল সেই ইতিবাচক শক্তির এক স্পন্দন, যা পুরো গ্রামে শান্তির অনুরণন তৈরি করত। তিনি তার শরীরের সীমিত শক্তিকে আল্লাহর ঘরের সেবায় ব্যয় করেছেন, আর বিনিময়ে পরম করুণাময় তাকে দান করেছিলেন এক ক্লান্তিহীন আত্মিক শক্তি।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখলে, যুগে যুগে এমন অনেক মহৎ প্রাণ মানুষের দেখা মেলে যারা শারীরিক অক্ষমতাকে জয় করে অমর হয়ে আছেন। আব্দুর রহমান মোল্লা নাটোরের ইতিহাসের পাতায় তেমনই এক নাম, যিনি কোনো তলোয়ার বা যুদ্ধের ময়দানে নয়, বরং নামাজের মোসল্লায় এবং আজানের ধ্বনিতে জয় করেছেন মানুষের হৃদয়।
তার এই জীবনগল্প আগামীর প্রজন্মের কাছে এক ত্যাগের ইতিহাস হয়ে থাকবে, যা মানুষকে শিখিয়ে যাবে কীভাবে প্রতিকূলতার মধ্যে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকা যায় এবং নিঃস্বার্থভাবে স্রষ্টার সৃষ্টিকে ভালোবাসা যায়।
অর্থনীতি বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে তার এই কর্মকাণ্ড ‘স্বেচ্ছাশ্রম’-এর এক মহত্তম উদাহরণ। আধুনিক অর্থনীতি শুধু বস্তুগত লাভণ্ডক্ষতির হিসাব করে, কিন্তু আব্দুর রহমান মোল্লা দেখিয়েছেন ‘সোশ্যাল ক্যাপিটাল’ বা সামাজিক পুঁজি কীভাবে বৃদ্ধি করতে হয়। তিনি কোনো বেতন গ্রহণ করেননি, অথচ তার এই কর্মের মূল্য কোটি টাকার চেয়েও বেশি। তার এই নিঃস্বার্থ অবদান প্রমাণ করে যে, সব কাজ অর্থের মানদণ্ডে পরিমাপ করা যায় না এবং কিছু প্রাপ্তি থাকে যা কেবল পরকালীন সঞ্চয় হিসেবেই সংরক্ষিত থাকে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় তিনি ছিলেন একজন আদর্শ নাগরিক, যিনি কোনো দাবি বা আন্দোলন ছাড়াই রাষ্ট্রের এক কোণে বসে নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছেন। রাষ্ট্র তার নাগরিকদের কাছ থেকে আনুগত্য এবং কর্তব্যনিষ্ঠা প্রত্যাশা করে, আর তিনি তা পালন করেছেন শ্রেষ্ঠত্বের সঙ্গে। তার এই জীবনধারা রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থায় থাকা ব্যক্তিদের জন্য এক বিশাল শিক্ষা হতে পারে- দায়িত্বের প্রতি এমন অবিচল থাকা এবং পদের মোহ ত্যাগ করে মানুষের সেবা করা।
সংস্কৃতি বিজ্ঞানে তার এই জীবনযাত্রা বাংলার লোকজ ধর্মীয় সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। রশি বেঁধে মসজিদে যাওয়ার এই দৃশ্যটি শুধু একটি ঘটনা নয়, এটি একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক চিত্রকল্প বা ‘ইমেজ’। এটি বাংলার মানুষের ধর্মপ্রাণতা, সহনশীলতা এবং পারিবারিক বন্ধনের (তার ছেলেদের সহযোগিতার মাধ্যমে) এক অপরূপ নিদর্শন।
মানব প্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন আব্দুর রহমান মোল্লা। তিনি জানতেন, আজান দেওয়া মানে শুধু উচ্চস্বরে ডাকা নয়, বরং মানুষকে কল্যাণের পথে আহ্বান করা। তিনি মানুষকে ভালোবাসতেন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, আর তাই তো পুরো এলাকার মানুষ তার জানাজায় অংশ নিয়ে তার প্রতি অসীম ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে।
দেশপ্রেম শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বরং নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের মধ্যেও নিহিত। আব্দুর রহমান মোল্লা তার জন্মভূমির মাটি ও মানুষের প্রতি এক গভীর টান অনুভব করতেন। তিনি এই দেশের মাটিকে পবিত্র মনে করতেন বলেই সেই মাটিতে কপাল ঠেকিয়ে বার বার সিজদাহ দিয়েছেন। তার এই দীর্ঘ ১২০ বছরের জীবন এই দেশের আলো-বাতাসে পুষ্ট হয়েছে এবং তিনি তার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত এই জনপদকে আজানের সুরে মুখরিত রেখেছেন। তার এই একনিষ্ঠতা দেশের প্রতি তার নীরব ও গভীর ভালোবাসারই প্রমাণ।
পরিশেষে বলা যায়, আব্দুর রহমান মোল্লা শুধু একজন মোয়াজ্জিন ছিলেন না, তিনি ছিলেন মানবতার এক আলোকবর্তিকা। তার জীবন আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেল যে, চোখের দৃষ্টি না থাকলেও মনের দৃষ্টি দিয়ে আকাশ ছোঁয়া সম্ভব। ১২০ বছর বয়সে তার এই প্রস্থান আমাদের শোকাতুর করলেও তার রেখে যাওয়া শিক্ষা চিরকাল অম্লান থাকবে। অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর আল্লাহর ওপর ভরসা থাকলে যে কোনো অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়- তার এই জীবনদর্শন আজ এবং আগামীতে সব হতাশাগ্রস্ত মানুষের জন্য এক সঞ্জীবনী সুধা হিসেবে কাজ করবে।
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রাবন্ধিক, কথা সাহিত্যিক, প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল