ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

সংসদের পথে নারীর যাত্রা : যোগ্যতা, জনপ্রিয়তা ও ক্ষমতার সমীকরণ

জুবাইয়া বিন্তে কবির
সংসদের পথে নারীর যাত্রা : যোগ্যতা, জনপ্রিয়তা ও ক্ষমতার সমীকরণ

দেশের রাজনৈতিক সময়রেখায় কিছু মুহূর্ত আসে, যা একটি নির্বাচনের গণ্ডি ছাড়িয়ে হয়ে ওঠে প্রতীকী এক সন্ধিক্ষণ। আগামী ১২ মে’র সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন তেমনই যেখানে প্রতিযোগিতা, নীরব টানাপোড়েন আর প্রত্যাশার ঢেউ একসাথে মিশে গেছে। সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই রাজনৈতিক অঙ্গনে স্পষ্ট হচ্ছে তৎপরতার তীব্রতা, বাড়ছে আগ্রহ ও চাপের বহুমাত্রিক প্রকাশ। সরকারি দল থেকে বিরোধী শিবির সবখানেই নারী নেত্রীদের সক্রিয় উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় যেন আজ কেবল একটি স্থান নয়, বরং স্বপ্ন ও সংগ্রামের এক উজ্জ্বল প্রতীক। এই নির্বাচন শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি নারী নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আর সেই পথচলায় জনসমাগম, স্লোগান আর প্রত্যাশার আবহ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক প্রাণবন্ত রাজনৈতিক মঞ্চ, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপেই লুকিয়ে আছে সম্ভাবনার নতুন গল্প।

সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা : ইতিহাস, কাঠামো ও রাজনৈতিক বাস্তবতা : বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ এককক্ষবিশিষ্ট, যেখানে মোট ৩৫০টি আসনের মধ্যে ৩০০টি সরাসরি নির্বাচিত এবং ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন। এই ৫০টি আসন মূলত পরোক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব অনুযায়ী বণ্টিত হয়। সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংরক্ষিত আসনের এই ব্যবস্থা ১৯৭২ সালে প্রবর্তিত হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে এই সংখ্যা ৫০-এ উন্নীত করা হয় এবং সর্বশেষ সংশোধনীর মাধ্যমে এটি ২০৪৩ সাল পর্যন্ত বহাল রাখা হয়েছে। তবে এই ব্যবস্থাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়ে গেছে এটি কি সত্যিকারের নির্বাচন, নাকি একটি দলীয় মনোনয়ননির্ভর কোটা ব্যবস্থা? কারণ এখানে জনগণের সরাসরি ভোট নেই; সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত ক্ষমতা রাজনৈতিক দলের হাতে কেন্দ্রীভূত।

মনোনয়ন রাজনীতি : যোগ্যতা, অনুগত্য ও পারিবারিক পরিচয়ের ত্রিভুজ : সংরক্ষিত আসনের মনোনয়ন প্রক্রিয়া মূলত দলীয় বিবেচনার ওপর নির্ভরশীল। এখানে প্রার্থীর রাজনৈতিক ভূমিকা, দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা এবং দলের প্রতি অনুগত্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে বাস্তবতায় আরেকটি শক্তিশালী উপাদান কাজ করে- পারিবারিক পরিচয়। রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য, প্রয়াত নেতাদের স্ত্রী-কন্যা কিংবা প্রভাবশালী নেতাদের স্বজনদের একটি বড় অংশ এই মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় এগিয়ে থাকে। এই প্রবণতা অনেক সময় যোগ্যতা ও দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রশ্নকে ছাপিয়ে যায়। ফলে মনোনয়ন হয়ে ওঠে এক ধরনের ‘লিগ্যাসি পলিটিক্স’-এর প্রতিফলন, যেখানে পরিচয় কখনো কখনো যোগ্যতার চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

নয়াপল্টনের ভিড় : স্বপ্নের জোয়ার নাকি প্রতিযোগিতার চাপ : মনোনয়ন ফরম বিক্রির প্রথম দিন থেকেই নয়াপল্টনের দলীয় কার্যালয় হয়ে ওঠে জনসমুদ্র। হাজারো নারী নেত্রীর পদচারণায় মুখরিত সেই প্রাঙ্গণ যেন এক রাজনৈতিক মেলার রূপ নেয়। কেউ এসেছেন দীর্ঘদিনের ত্যাগের স্বীকৃতি চাইতে, কেউ এসেছেন নতুন সম্ভাবনার হাতছানি নিয়ে। এই ভিড় শুধু সংখ্যার নয়, এটি রাজনীতিতে নারীর ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির প্রতিচ্ছবি।

বিএনপির রেকর্ড ভাঙা আগ্রহ : সংখ্যা ও সম্ভাবনার দ্বন্দ্ব : সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন ঘিরে এবার বিএনপিতে যে সাড়া দেখা গেছে, তা দলীয় ইতিহাসেই এক ব্যতিক্রমী অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। হাজারেরও বেশি মনোনয়ন ফরম বিক্রি হয়ে গেছে, যা অতীতের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। দলীয় কেন্দ্রীয় কার্যালয় নয়াপল্টনে কয়েক দিন ধরে যে জনসমাগম, তা শুধু প্রার্থিতার প্রতিযোগিতা নয় বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রত্যাশা, ত্যাগ ও অবস্থানের এক সম্মিলিত প্রকাশ। অথচ এই বিপুল আগ্রহের বিপরীতে বাস্তবতা অত্যন্ত সীমিত ও নির্মম। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনী ফলাফলের ভিত্তিতে মোট ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের মধ্যে বিএনপি জোটের প্রাপ্তি ৩৬টি, জামায়াত জোটের ১৩টি এবং স্বতন্ত্র ও অন্যান্যদের জন্য ১টি আসন নির্ধারিত হয়েছে।

এই সীমিত সংখ্যক আসনের ভেতর থেকেই হাজারো আবেদনকারীর ভাগ্য নির্ধারিত হবে, যা প্রতিযোগিতাকে করেছে আরও তীব্র ও সূক্ষ্ম। এই সংখ্যাগত বৈপরীত্যই সৃষ্টি করেছে এক জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতা যেখানে একেকটি মনোনয়ন শুধু একটি আসন নয়, বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার স্বীকৃতি পাওয়ার প্রতীক হয়ে উঠেছে। ফলে প্রতিটি আবেদনপত্র যেন একজন নারীনেত্রীর বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা সংগ্রাম, সাংগঠনিক অবস্থান ও রাজনৈতিক উপস্থিতির এক নীরব দলিল।

কারা এগিয়ে : রাজপথের কর্মী না পরিচিত মুখ : সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন ঘিরে বিএনপির ভেতরে এবার তৈরি হয়েছে এক বহুমাত্রিক প্রতিযোগিতা, যেখানে একদিকে দাঁড়িয়ে আছেন দীর্ঘদিনের রাজপথের পরীক্ষিত নেত্রীরা, অন্যদিকে আলোচনায় রয়েছেন পেশাজীবী, সাংস্কৃতিক অঙ্গন ও শোবিজের পরিচিত মুখ। তালিকায় সুলতানা আহমেদ, নিলোফার চৌধুরী মনি, রেহানা আক্তার রানু, আরিফা সুলতানা রুমার মতো রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নাম যেমন আছে, তেমনি আছেন বেবী নাজনীন, কনকচাঁপা ও দিলরুবা খানের মতো জনপ্রিয় শিল্পীরা। এই বৈচিত্র্যই প্রতিযোগিতাকে করেছে আরও জটিল ও বহুমাত্রিক, যেখানে যোগ্যতা, ত্যাগ ও জনপ্রিয়তা- সবকিছুই একসঙ্গে বিচার্য হয়ে উঠছে।

তারকার উপস্থিতি : জনপ্রিয়তার শক্তি নাকি রাজনৈতিক বিতর্ক? শোবিজ ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের তারকাদের অংশগ্রহণ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। একদিকে তাদের জনসম্পৃক্ততা, জনপ্রিয়তা এবং সামাজিক প্রভাবকে রাজনৈতিক সম্পদ হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে তৃণমূলের দীর্ঘদিনের নেত্রীদের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে- দুঃসময়ের রাজপথে না থাকা কেউ কি শুধু পরিচিতির কারণে অগ্রাধিকার পেতে পারেন? দলীয় সূত্রগুলো বলছে, এবারের মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব শুধু সংগঠন নয়, জনআকর্ষণ ও গ্রহণযোগ্যতাকেও মূল্যায়নের একটি মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করছে, যা পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামোতে নতুন এক বাস্তবতা যোগ করেছে।

জামায়াতের নীরব কৌশল : সংগঠিত সিদ্ধান্তের ভিন্ন ধারা : বিএনপির উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক মনোনয়ন প্রক্রিয়ার বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী এবারও অনুসরণ করছে নিয়ন্ত্রিত ও কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তনির্ভর পদ্ধতি। এখানে ফরম বিক্রির আনুষ্ঠানিক প্রতিযোগিতা নেই; বরং দলীয় শূরা ও হাইকমান্ডের বাছাইয়ের মাধ্যমেই নির্ধারিত হচ্ছে সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা। আলোচনায় রয়েছেন অধ্যাপিকা নুরুন্নিসা সিদ্দিকা, প্রকৌশলী মারদিয়া মমতাজ, সাবেক সংসদ সদস্য ডা. আমিনা বেগম রহমানসহ একাধিক শিক্ষিত ও পেশাজীবী নারী। দলটির এই কাঠামোবদ্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণ পদ্ধতি একদিকে শৃঙ্খলার প্রতীক হলেও, অন্যদিকে স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণের সীমাবদ্ধতা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্নও তুলছে।

এনসিপির সীমিত আসনে বিস্তৃত আকাঙ্ক্ষা : নতুন রাজনৈতিক শক্তি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবার সংরক্ষিত নারী আসনের মাত্র একটি সম্ভাব্য আসন ঘিরেও রাজনৈতিক আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে। দলটির ভেতরে মনিরা শারমিন ও ডা. মাহমুদা মিতুর মতো নেত্রীদের নিয়ে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি জোট রাজনীতির ভেতরে আরও একটি আসন আদায়ের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও চলছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে, যা তাদের রাজনৈতিক কৌশলকে আরও সক্রিয় করে তুলেছে।

এক পরিবার এক এমপি : নীতি, নাকি রাজনৈতিক ভারসাম্যের কৌশল? ‘এক পরিবার এক এমপি’ নীতিটি এবারও আলোচনার কেন্দ্রে। জাতীয় নির্বাচনে এর আংশিক প্রয়োগ পরিবারতন্ত্রের সমালোচনা কিছুটা কমালেও, সংরক্ষিত নারী আসনে এর বাস্তব প্রয়োগ কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। তৃণমূলের একাংশ মনে করে, এই নীতি কার্যকর হলে নতুন নেতৃত্বের উত্থান সহজ হবে এবং দীর্ঘদিনের বঞ্চনার কিছুটা হলেও অবসান ঘটবে। তবে নীতিনির্ধারণী মহলে এখনো যোগ্যতা, সাংগঠনিক অবদান এবং গ্রহণযোগ্যতাকেই মূল বিবেচ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ত্যাগীদের আর্তি : স্বীকৃতির দীর্ঘ অপেক্ষা : দলীয় আন্দোলন-সংগ্রামের কঠিন সময়ের সাক্ষী ত্যাগী নেত্রীদের মধ্যে এক ধরনের গভীর প্রত্যাশা কাজ করছে। তারা মনে করেন, যারা জেল-জুলুম, মামলা-হামলা ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের মধ্যেও সংগঠনকে ধরে রেখেছেন, তাদের মূল্যায়নই হওয়া উচিত প্রধান ভিত্তি। তাদের ভাষায়, এই নির্বাচন যদি প্রকৃত ত্যাগীদের স্বীকৃতি না দেয়, তবে রাজনীতিতে নিষ্ঠা ও আত্মত্যাগের প্রেরণা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে সংগঠনের ভিতকেই প্রভাবিত করবে।

সুবিধাবাদ বনাম আদর্শ: ভেতরের অদৃশ্য টানাপোড়েন : বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে আলোচিত শব্দগুলোর একটি হলো ‘সুবিধাবাদ’। অনেক তৃণমূল নেত্রীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা বা দলে সীমিত সম্পৃক্ততা থাকা ব্যক্তিরা হঠাৎ করেই মনোনয়ন প্রতিযোগিতায় সামনে আসছেন। এই প্রবণতা একদিকে যেমন অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ তৈরি করছে, অন্যদিকে দলীয় ঐক্য ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন শুধু আসন বণ্টনের বিষয় নয়; বরং এটি আদর্শ, জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক ত্যাগের মধ্যে ভারসাম্য খোঁজার এক সূক্ষ্ম পরীক্ষা।

একজন নারী গবেষকের দৃষ্টিতে বাস্তবতা : আমি নিজেও একজন নারী গবেষক এবং বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে এই বাস্তবতাকে ভেতর থেকে অনুভব করি। রাজনীতি কেবল পদ বা ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি একটি দায়বদ্ধতার ক্ষেত্র। এখানে প্রতিনিধিত্ব মানে কণ্ঠহীন মানুষের কণ্ঠ হওয়া। তাই সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন কেবল একটি সুযোগ নয় এটি একটি দায়িত্ব, যা গ্রহণের জন্য প্রয়োজন যোগ্যতা, সততা এবং জনসম্পৃক্ততা।

সংসদ কি অলংকারের স্থান? প্রশ্ন উঠেছে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যরা কি সত্যিই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছেন? নাকি তারা অনেক সময় শুধু সংখ্যার হিসাব পূরণের একটি মাধ্যম হয়ে থাকেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, যোগ্যতা ও প্রস্তুতির অভাব থাকলে সংসদে উপস্থিতি অর্থবহ হয় না। তাই প্রার্থী নির্বাচনে এই বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

রাজনীতিতে নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন : নারীর ক্ষমতায়ন তখনই বাস্তব হয়, যখন তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। সংরক্ষিত আসন সেই সুযোগ তৈরি করে, কিন্তু সেটি অর্থবহ করতে হলে প্রয়োজন সঠিক নির্বাচন। ত্যাগী, শিক্ষিত, অভিজ্ঞ এবং জনসম্পৃক্ত নারীদেরই এই দায়িত্ব দেওয়া উচিত।

বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল বিভাগ) ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস জাহান শিরিন এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক, বিএনপি মিডিয়া সেলের অন্যতম সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘সংরক্ষিত নারী আসন শুধু কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্ব নয়; এটি দলের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ধারক-বাহকদের স্বীকৃতি দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। আমরা বিশ্বাস করি, যারা দুঃসময়ে রাজপথে থেকেছেন, মামলা-হামলা সহ্য করেছেন, দলের আদর্শকে ধারণ করে সংগঠনকে এগিয়ে নিয়েছেন তাদের মূল্যায়ন অবশ্যই প্রাধান্য পাবে। ‘তবে একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে, জাতীয় সংসদ একটি আইন প্রণয়নের জায়গা। এখানে শুধু ত্যাগ নয়, প্রয়োজন মেধা, প্রজ্ঞা, বক্তব্যের সক্ষমতা এবং রাষ্ট্রবোধ। তাই মনোনয়নের ক্ষেত্রে ত্যাগ ও যোগ্যতার একটি সুসমন্বিত মূল্যায়ন অপরিহার্য।’ পারিবারিক প্রভাবের প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘কেউ কোনো নেতার পরিবার থেকে এলেই যে অযোগ্য, এমনটি আমরা মনে করি না। আবার শুধুমাত্র পারিবারিক পরিচয় দিয়ে কাউকে অগ্রাধিকার দেওয়াও সমর্থনযোগ্য নয়। দলের নীতিগত অবস্থান হলো- যোগ্যতা, সাংগঠনিক অবদান এবং গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।’ তারা আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘বিএনপির চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমান এরমধ্যেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে ‘এক পরিবার এক মনোনয়ন’ নীতির প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। সংরক্ষিত নারী আসনেও সেই নীতির প্রতিফলন ঘটবে বলে আমরা প্রত্যাশা করি। এতে করে তৃণমূলের ত্যাগী নেত্রীদের মধ্যে আস্থা ও উদ্দীপনা আরও বাড়বে।‘ ‘এই নির্বাচন শুধু কিছু আসন পূরণের প্রক্রিয়া নয়; এটি দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গঠনের একটি সুযোগ। তাই আমরা চাই, এমন নারীরা সংসদে যাক যারা জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে পারবেন, দলের সংগ্রামের ইতিহাসকে ধারণ করবেন এবং নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন।’

সংস্কার ও ভবিষ্যতের পথ : সমান অংশগ্রহণের নতুন দিগন্ত : বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, বর্তমান সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা পরিবর্তন করে নারীদের জন্য সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা উচিত। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি দলকে নির্দিষ্ট শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিতে হবে, যা ধীরে ধীরে বাড়িয়ে ৩৩ শতাংশ বা তারও বেশি করা যেতে পারে। এতে নারীরা সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে আসবেন, যা তাদের রাজনৈতিক মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা উভয়ই বাড়াবে। তবে এই পথও সহজ নয়। রাজনৈতিক বাস্তবতা, দলীয় ক্ষমতার ভারসাম্য এবং পুরুষ আধিপত্যের দীর্ঘ ইতিহাস এই সংস্কারের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। তবুও একটি বিষয় স্পষ্ট নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এখন আর কেবল প্রতীকী নয়; এটি ভবিষ্যৎ গণতন্ত্রের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন।

পরিশেষে, এই নির্বাচন কেবল একটি প্রক্রিয়া নয় এটি সময়ের কাছে রাজনীতির এক নিঃশব্দ জবাবদিহি। দলগুলো এখানে দাঁড়িয়ে আছে এক সূক্ষ্ম প্রশ্নের মুখোমুখি: তারা কি সত্যিই যোগ্যতা, ত্যাগ ও গ্রহণযোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেবে, নাকি পরিচিত পুরোনো ছায়ার পুনরাবৃত্তিতেই আটকে থাকবে? এই সিদ্ধান্তের ভেতরেই নিহিত আছে তাদের ভবিষ্যৎ গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তি।

এই নির্বাচন তাই নিছক আসন বণ্টনের হিসাব নয়; এটি আমাদের রাজনৈতিক মূল্যবোধের গভীরতম পরীক্ষাগুলোর একটি। এখানে নির্ধারিত হবে, রাজনীতির পথ কি উত্তরাধিকার আর পরিচয়ের বলয়ে আবদ্ধ থাকবে, নাকি ত্যাগ, মেধা ও যোগ্যতার আলোয় নতুন এক দৃষ্টান্তের জন্ম দেবে। যদি এই প্রক্রিয়ায় সত্যিকারের সংগ্রামী, দক্ষ ও জনসম্পৃক্ত নারীরা জায়গা করে নিতে পারেন, তবে তা হবে পরিবর্তনের এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী সূচনা।

আর যদি ব্যতিক্রম না ঘটে, তবে তা শুধু হতাশা নয় বরং আস্থাহীনতার এক দীর্ঘ ছায়া নামিয়ে আনবে রাজনৈতিক অঙ্গনে। অতএব, এই নির্বাচন শেষ পর্যন্ত শুধু প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতির আত্মপরিচয়ের এক গভীর পরীক্ষা, যেখানে লেখা হবে ভবিষ্যতের ইতিহাস উজ্জ্বল সম্ভাবনার আলোয়, নাকি অনুশোচনার দীর্ঘ নীরবতায়।

জুবাইয়া বিন্তে কবির

অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত