ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

এক টুকরো লাল-সাদা ঐতিহ্যের বৈশাখ

শিমলা পাল
এক টুকরো লাল-সাদা ঐতিহ্যের বৈশাখ

‘ভস্ম হতে জেগে ওঠা ফিনিক্সের মতো, পহেলা বৈশাখ হলো বাঙালির সেই অবিনাশী স্পর্ধা যা জীর্ণতাকে পুড়িয়ে ছাই করে নতুনের বিজয়তিলক পরে ফিরে আসে।’ তপ্ত রোদে যখন দুপুরের আকাশ তামাটে হয়ে ওঠে, আর ধুলোবালির মিছিলে আকাশ কাঁপে কালবৈশাখীর গর্জনে, ঠিক তখনই বাংলার হৃদপিণ্ডে বেজে ওঠে পুনর্জন্মের দামামা। কালবৈশাখীর রুদ্রমূর্তিতে ধুয়ে মুছে গেছে জীর্ণতা, আর সেই নতুনের বার্তা নিয়ে বাঙালির জীবনে ফিরে এসেছে পহেলা বৈশাখ। এটি শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা বদল নয়, বরং হাজার বছরের লালিত ঐতিহ্যের এক মহা-উন্মেষ। বাংলার আকাশে যখন বৈশাখী রোদ খেলা করে, তখন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে বেজে ওঠে নতুনের জয়গান। এই উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা এক অসাম্প্রদায়িক ও উদার সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী। ভোরের প্রথম আলো যখন প্রকৃতিকে স্পর্শ করে, তখন রমনার বটমূল থেকে শুরু করে সারা দেশের অলিগলিতে ধ্বনিত হয় ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’। এই সুর বাঙালির আত্মার আকুতি, যা সমস্ত গ্লানি দূর করে সুন্দর আগামীর স্বপ্ন দেখায়। বছরের অন্য ৩৬৪ দিন আমরা নাগরিকতার যান্ত্রিক চাদরে ঢাকা থাকি, কিন্তু বৈশাখের প্রথম সূর্যোদয় আমাদের সেই চাদর ছিন্নভিন্ন করে দাঁড় করিয়ে দেয় শেকড়ের মুখোমুখি। বৈশাখ মানেই এক মহাজাগরণ, যেখানে থমকে যাওয়া সময় নতুন করে ডানা মেলার সাহস পায়। রাস্তার পিচ ঢালা কালো বুক আজ ঢেকে গেছে রঙের কারুকাজে। সেই আল্পনার প্রতিটি বাঁক যেন একেকটি না বলা গল্প। চারুকলার সামনের মঙ্গল শোভাযাত্রাটি যখন এগোয়, তখন মনে হয় এক বিশাল জাদুর আয়না আমাদের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। বিশালকায় সব টেপা পুতুল আর মাটির সরাগুলো যেন চিৎকার করে বলছে আমরা হারিনি, আমরা হারবো না। এই মিছিল অন্ধকারের বিরুদ্ধে এক নান্দনিক বিদ্রোহ। যখন হাজার হাজার মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সুর মেলায়, তখন বাঙালির কোনো ধর্ম বা গোত্র থাকে না; থাকে শুধু এক অখণ্ড পরিচয় আমরা বাঙালি।

শহরের কৃত্রিম আলো আর শপিং মলের চাকচিক্যকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে আজ রাজত্ব করে মেঠো সুর আর মাটির ঘ্রাণ। মেলায় নাগরদোলনার শব্দ যেন কোনো এক দূর অতীতে নিয়ে যায়, যেখানে বাতাসা আর কদমার স্বাদে লেগে থাকতো মাটির সোঁদা গন্ধ। বৈশাখ আমাদের শেখায় আভিজাত্য শুধু দামী পোশাকে নয়, বরং সাদা সুতি শাড়ির লাল পাড় আর কপালে আঁকা ছোট্ট টিপেই তা লুকিয়ে আছে। এটি এমন এক সময়, যখন আধুনিকতা আর ঐতিহ্য হাত ধরাধরি করে হাঁটে। এক হাতে স্মার্টফোন আর অন্য হাতে মাটির সরা নিয়ে যখন কোনো কিশোরী হেঁটে যায়, তখন বোঝা যায় আমাদের সংস্কৃতি কতটা শেকড়মুখী।

শিমলা পাল

আইন বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত