ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

নববর্ষের অঙ্গীকার

ঐতিহ্যের শেকড়ে আধুনিকতার মেলবন্ধন

ঐতিহ্যের শেকড়ে আধুনিকতার মেলবন্ধন

বাঙালির পঞ্জিকায় যুক্ত হলো আরও একটি নতুন বছর-১৪৩৩। ভোরের রক্তিম সূর্য আর রমনার বটমূলের সুরে আজ সূচিত হয়েছে নতুন প্রাণস্পন্দন। পহেলা বৈশাখ কেবল একটি তারিখ নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক মহা-মিলনমেলা। পান্তা-ইলিশ, মঙ্গল শোভাযাত্রা আর নতুন হালখাতার ঘ্রাণে আজ বাংলার আকাশ-বাতাস মুখরিত।

পহেলা বৈশাখ কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা গোষ্ঠীর উৎসব নয়; এটি বাংলার আপামর জনতার। মুঘল সম্রাট আকবরের সময় খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে যে ‘ফসলি সন’ চালু হয়েছিল, তা আজ আমাদের জাতীয় ঐক্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। যখনই আমাদের সংস্কৃতি আক্রান্ত হয়েছে, আমরা পহেলা বৈশাখকে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করেছি। ১৯৬৭ সালে পাকিস্তানি শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ছায়ানট যে উৎসবের সূচনা করেছিল, তা ছিল আমাদের স্বাধীনতার সুপ্ত ঘোষণা। বর্তমান সময়ে যখন বিশ্বজুড়ে অসহিষ্ণুতা বাড়ছে, তখন বৈশাখী উৎসব আমাদের শেখায়- বৈচিত্র্যের মধ্যেই আসল শক্তি।

ইউনেস্কো কর্তৃক ‘মানবতার বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃত মঙ্গল শোভাযাত্রা আজ বৈশাখের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশালাকার মাছ, পাখি, লোকজ মোটিফ আর রঙিন মুখোশে সাজানো এই শোভাযাত্রা অশুভ শক্তিকে বিনাশ করে এক শান্তিময় আগামীর স্বপ্ন দেখায়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা জাতি হিসেবে কতটা সমৃদ্ধ এবং সৃষ্টিশীল।

নববর্ষকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতিতে এক বিশাল চাঞ্চল্য তৈরি হয়। নতুন পোশাক কেনা থেকে শুরু করে মিষ্টান্ন বিতরণ- সব মিলিয়ে বৈশাখী অর্থনীতি এখন কয়েক হাজার কোটি টাকার। বিশেষ করে গ্রামীণ মেলাগুলো আমাদের কুটিরশিল্প ও কারুশিল্পীদের প্রাণ বাঁচিয়ে রেখেছে। মাটির সরা, নকশিকাঁথা, শীতলপাটি আর নাগরদোলার সেই পুরোনো আমেজ আজও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক প্রজন্মকে মাটির কাছাকাছি টেনে আনে।

তবে উদযাপনের আড়ালে আমাদের কিছু মৌলিক সংকটের কথা ভুলে গেলে চলবে না। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাধারণ মানুষের জীবনে যে নাভিশ্বাস উঠছে, তা কাটানোর শপথ নিতে হবে এই নতুন বছরে। পহেলা বৈশাখ মানে কেবল মেকি আড়ম্বর নয়, বরং মেহনতি মানুষের সঙ্গে একাত্ম হওয়া। গত বছরের সমস্ত গ্লানি, জরা আর ব্যর্থতা ধুয়ে মুছে যাক বৈশাখের প্রথম কালবৈশাখীতে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়- মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ আমাদের প্রত্যাশা, নতুন বছরের এই সূর্যোদয় যেন শুধু উৎসবের আনন্দই বয়ে না আনে, বরং নিয়ে আসুক একটি বৈষম্যহীন, আধুনিক এবং প্রকৃত অর্থেই সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়।

শুভ নববর্ষ! সকলের জীবন ভরে উঠুক নতুন কুঁড়ির সজীবতায়।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত