প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গত কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহ জাতির সামনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বিগত প্রায় দেড় দশকের একচ্ছত্র শাসনের পতন ও গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে অর্জিত পরিবর্তন শুধু সরকার বদল নয়, বরং রাষ্ট্রকাঠামোর মৌলিক সংস্কারের দাবিও বটে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পতন এবং ৬ আগস্ট দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত হওয়ার পর থেকে বর্তমানে নবগঠিত সংসদীয় প্রক্রিয়াটি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। কারণ, একটি সুস্থ গণতন্ত্রের মেরুদণ্ড হলো কার্যকর ও প্রতিনিধিত্বমূলক আইনসভা, যা জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে সক্ষম।
রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র এই নতুন আইনসভার মান নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। দীর্ঘদিন ধরে দলগুলোতে একক কর্তৃত্ব ও পরিবারতন্ত্রের দৌরাত্ম্য থাকায় সাধারণ কর্মীদের মতামত উপেক্ষিত হয়েছে; মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় ছিল চরম অস্বচ্ছতা। আগামীতে যারা জনপ্রতিনিধি হিসেবে এসেছেন, তারা যেন দলীয় স্বৈরতন্ত্রের দাস না হয়ে জনগণের প্রকৃত সেবক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারেন, সেজন্য দলে গণতান্ত্রিক চর্চা অপরিহার্য। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় নতুন সংসদের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা দূর করতে দ্রুত আইনি সংস্কার, খেলাপি ঋণ আদায় এবং দুর্নীতি দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সংসদ সদস্যদের শুধু আঞ্চলিক বরাদ্দে আটকে না থেকে জাতীয় নীতি প্রণয়নে আরও সক্রিয় হতে হবে। সংসদীয় বিতর্কের মাধ্যমে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে জনজীবনে স্বস্তি ফিরবে।
সামাজিক ন্যায়বিচার ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষায় নতুন সংসদকে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। সংবিধানে বর্ণিত ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িক নীতির সঠিক বাস্তবায়নে সব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব থাকা জরুরি। পাশাপাশি, গণতান্ত্রিক জবাবদিহি নিশ্চিতে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ তরুণ প্রজন্মের কার্যকর অংশগ্রহণ ছাড়া উন্নত ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ অসম্ভব; তাই আইনসভায় তাদের কণ্ঠস্বর নিশ্চিত করাও সময়ের দাবি। নিরাপত্তা বাহিনীর সংস্কার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা জনপ্রতিনিধিদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পুলিশ প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে জনবান্ধব বাহিনীতে রূপান্তর এবং মানবাধিকার রক্ষায় কার্যকর আইন প্রণয়ন করতে হবে। একই সঙ্গে বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন করা প্রয়োজন। আইন ও বিচার বিভাগ শক্তিশালী হলেই সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।
ডিজিটাল যুগে তথ্যের অবাধ প্রবাহ ও ডিজিটাল অধিকার রক্ষা করা সংসদের অন্যতম প্রধান কাজ। জুলাই বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে ইন্টারনেট শাটডাউনের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তি রোধে আইনি সুরক্ষা প্রয়োজন। স্টারলিংকের মতো প্রযুক্তির ব্যবহারে রাষ্ট্রীয় খবরদারি বন্ধ এবং সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাবগুলোতে আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করতে হবে। একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক আইনসভাই পারে ডিজিটাল স্বাধীনতা নিশ্চিত করে ক্ষমতার অপব্যবহার রুখতে। একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব আইনসভা গঠনে নাগরিক সমাজ, তরুণ ও পেশাজীবীদের সম্পৃক্ত করে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অত্যন্ত জরুরি।
সাধারণ সংসদ সদস্যদের মানসম্মত আইন প্রণয়নে সহায়তার জন্য একটি ‘পার্লামেন্টারি এভিডেন্স ইউনিট’ এবং ডেটা প্রাইভেসি বা এনএফটির (NFT) মতো আধুনিক প্রযুক্তির বিষয়ে যুগোপযোগী আইন তৈরিতে ‘স্থায়ী আইন প্রণয়ন কমিটি’ গঠন করা অপরিহার্য। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সংসদীয় কমিটিগুলোকে বিশেষজ্ঞভিত্তিক করার মাধ্যমেই একে প্রকৃত গণতান্ত্রিক কেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব।
সবচেয়ে কঠিন অথচ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তন। এর মূল লক্ষ্য সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা। একটি জনবান্ধব সংসদ শুধু বৈষম্য দূর করে সামাজিক নিরাপত্তাই নিশ্চিত করবে না, বরং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও টেকসই উন্নয়নের মতো যুগোপযোগী আইন প্রণয়নেও কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এই রূপান্তরের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করে সদিচ্ছা দেখাতে হবে।
সংবিধানের নিছক ‘সংশোধন’ নাকি পূর্ণাঙ্গ ‘সংস্কার’- এই শব্দজটে আটকে থাকা জুলাই বিপ্লবের মূল চেতনার পরিপন্থি। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান শুধু ক্ষমতার হাতবদল নয়, বরং এটি এক নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের তীব্র আকাঙ্ক্ষা। অতীতে দলীয় স্বার্থে চাপিয়ে দেওয়া সংশোধনীগুলোই রাষ্ট্রকে স্বৈরতান্ত্রিক করেছিল। তাই জোড়াতালির বদলে জনমতের ভিত্তিতে সামগ্রিক সংস্কার আজ অপরিহার্য। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিতে সংসদে সর্বদলীয় কমিটি গঠন ও উন্মুক্ত বিতর্কের মাধ্যমেই এই কাঠামোগত রূপান্তর বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ- বিশেষ করে গুম প্রতিরোধ, পুলিশ কমিশন ও গণভোটের মতো ২০টি জনগুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ নিয়ে সৃষ্ট টানাপোড়েনের দ্রুত অবসান হওয়া প্রয়োজন। গণঅভ্যুত্থানের ফসল এই জনবান্ধব আইনগুলো বাতিলের বদলে, সংসদীয় বিতর্কের মাধ্যমে চূড়ান্ত আইনে পরিণত করাই হবে সময়োচিত। পাশাপাশি, সাংবিধানিক সংস্কার ও গণভোটের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটাতে পারলেই সংসদ তার প্রকৃত গ্রহণযোগ্যতা ফিরে পাবে।
আইনসভাকে কার্যকর করার পথে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ দীর্ঘকাল ধরে একটি বড় বাধা। এটি সদস্যদের নিজস্ব বিবেকের বদলে দলীয় সিদ্ধান্তে অন্ধভাবে সায় দিতে বাধ্য করে; ফলে তারা নিছক ‘রাবার স্ট্যাম্পে’ পরিণত হন।
এর একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান অত্যন্ত জরুরি। সরকারের স্থায়িত্ব রক্ষায় শুধু অনাস্থা প্রস্তাব ও বাজেট পাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এই অনুচ্ছেদের প্রয়োগ সীমাবদ্ধ রাখা প্রয়োজন। সাধারণ আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণী বিতর্কে সংসদ সদস্যদের স্বাধীন ভোটাধিকার থাকলে সংসদ প্রাণবন্ত ও কার্যকর হয়ে উঠবে। একটি আদর্শ বিরোধী দল শুধু সরকারের সমালোচনাই করে না, তারা বিকল্প সরকার হিসেবে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে।
কিন্তু জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার সুযোগ না পেয়ে বিরোধী দলের ওয়াকআউট করার যে অতীত সংস্কৃতি, তা হতাশাজনক। সংসদীয় কার্যপ্রণালিতে অসহিষ্ণুতার অবসান ঘটিয়ে সরকারি দলকে বিরোধী দলের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে এবং স্পিকারকে হতে হবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে ওয়াকআউট নয়, বরং যুক্তি ও পাল্টা যুক্তির মাধ্যমে নীতির লড়াই হবে। জনগণের স্বপ্নের আইনসভা কোনো অলিক কল্পনা নয়। এটি অর্জন করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের পুরোনো ও অসহিষ্ণু রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান শিখিয়েছে, রাষ্ট্রযন্ত্র জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে কোনো স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামোই টেকে না। তাই নতুন সংসদকে সত্যিই জনবান্ধব করতে হলে সততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে সংবিধান সংস্কারে হাত দিতে হবে। সরকারি ও বিরোধী দল উভয়েরই মনে রাখা উচিত, এই নতুন সূচনা ২০২৪ সালের শহিদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষার্থে একটি জবাবদিহিমূলক ও সত্যিকারের জনগণের সংসদ প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই।
আমানুর রহমান
শিক্ষার্থী, স্নাতক, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ, শান্তিনগর, ঢাকা