প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬
ঢাকায় শহরের রাস্তায় দাঁড়ালেই বোঝা যায়- শব্দ এখন আর শুধু শব্দ নয়, এটি এক অদৃশ্য আতঙ্ক। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠা এই কোলাহল ধীরে ধীরে আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। শব্দ এক ধরনের শক্তি, যা আমাদের কানে প্রবেশ করে শ্রবণ অনুভূতি সৃষ্টি করে। তবে এই শব্দের তীব্রতা যখন সহনীয় সীমা অতিক্রম করে, তখনই তা শব্দদূষণে রূপ নেয়। সাধারণত ৬০ ডেসিবলের বেশি শব্দ মানুষের জন্য বিরক্তিকর ও ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। আমাদের শ্রবণযন্ত্রের স্বাভাবিক সহনক্ষমতা প্রায় ১ থেকে ৭৫ ডেসিবল পর্যন্ত; এর ঊর্ধ্বে দীর্ঘ সময় অবস্থান করলে তা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ৬০ ডেসিবল শব্দ সাময়িক শ্রবণ সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে এবং ১০০ ডেসিবল শব্দ স্থায়ী ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করে। অথচ বাস্তবতা হলো—ঢাকার ব্যস্ত সড়কে শব্দের মাত্রা প্রায়ই ৬০ থেকে ৮০ ডেসিবল ছাড়িয়ে যায়। লাউডস্পিকারের শব্দ ১০০ থেকে ১২০ ডেসিবল পর্যন্ত পৌঁছায়, বাসের হাইড্রোলিক হর্ন প্রায় ১৩০ ডেসিবল এবং সাইরেন ১১০-১২০ ডেসিবল পর্যন্ত হতে পারে। এমনকি ঘরের ভেতর ফ্যান চালু থাকলেও ৫০ থেকে ৭০ ডেসিবল শব্দ তৈরি হয়, যদিও তা তুলনামূলকভাবে সহনীয়। অকুপেশনাল সেফটি অ্যান্ড হেলথ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ঙঝঐঅ) এবং আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব অডিওলজির মতে, ৮৫ ডেসিবলের বেশি শব্দে ৩০ মিনিট অবস্থান করাও ঝুঁকিপূর্ণ, আর ১২০ ডেসিবলের বেশি শব্দে মাত্র ৩০ সেকেন্ড থাকাই ক্ষতিকর। এই বাস্তবতা থেকে সহজেই বোঝা যায়—আমরা প্রতিদিন কতটা ঝুঁকির মধ্যে বাস করছি। বাংলাদেশে শব্দদূষণের উৎস বহুমাত্রিক। শিল্পকারখানা, যানবাহন, নির্মাণকাজ, সামাজিক অনুষ্ঠান এবং লাউডস্পিকার- সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একটি সরকারি সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ গাড়ির হর্নকে শব্দদূষণের প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কনসার্ট, বিয়ে বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উচ্চমাত্রার শব্দ এবং আতশবাজির ব্যবহার।
শব্দদূষণের প্রভাব কেবল পরিবেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক হুমকি। দেশে পরিবেশ দূষণজনিত অসুস্থতায় প্রতিবছর প্রায় ২৫ শতাংশ মানুষের মৃত্যু ঘটে, যেখানে বৈশ্বিক গড় ১৬ শতাংশ। বিভিন্ন সমীক্ষা বলছে, দেশে প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে শ্রবণ সমস্যায় ভুগছেন এবং ট্রাফিক পুলিশের প্রায় ১১ শতাংশ এই সমস্যায় আক্রান্ত। ঢাকার প্রায় ৭১ শতাংশ মানুষ শব্দদূষণের কারণে মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও হতাশার শিকার।
অতিরিক্ত শব্দদূষণের ফলে শ্রবণশক্তি হ্রাস, টিনিটাস, মাথাব্যথা, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদস্পন্দনের অনিয়ম, অনিদ্রা, দুশ্চিন্তা, এমনকি মানসিক ভারসাম্যহীনতাও দেখা দেয়। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে শব্দদূষণপ্রবণ শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা অন্যতম; বাণিজ্যিক এলাকায় শব্দের মাত্রা গড়ে ১১৯ ডেসিবল পর্যন্ত পৌঁছায়, আর রাজশাহীতে তা প্রায় ১০৩ ডেসিবল।
এতসব সমস্যার পরও আইন রয়েছে। শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০০৬ অনুযায়ী হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অফিস-আদালতের আশপাশের ১০০ মিটার এলাকা ‘নীরব এলাকা’ হিসেবে ঘোষিত, যেখানে হর্ন বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে এই আইন মানার প্রবণতা খুবই কম; ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং অবাধ হর্ন ব্যবহারের কারণে পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ। আইনের কঠোর প্রয়োগ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, গণমাধ্যমে প্রচারণা, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং যানবাহনের নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি সামাজিক অনুষ্ঠান, কনসার্ট ও অন্যান্য আয়োজনেও শব্দ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। শব্দদূষণ এখন আর শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি আমাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। আমরা যদি এখনই সচেতন না হই, তবে এই অবিরাম কোলাহলই একদিন আমাদের নীরব বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠবে। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, শান্ত ও বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে তুলতে আজই সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়া অপরিহার্য।
মো: আমিনুর রহমান
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়