প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬
বাংলা নববর্ষ আমাদের প্রাণের উৎসব। মুঘল সম্রাট আকবরের হাত ধরে সূচনা হয় বাংলা নববর্ষের। প্রথমবারের মতো সংস্কারের উদ্যোগ নেন সম্রাট শাহজাহান, যা সম্পূর্ণ কৃষিকাজ ও কৃষকের ফসল উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। আকবর রাজ্যের কর উত্তোলনের জন্য বাংলা সন চালু করেন। হালখাতা ছিল নববর্ষের মূল কাজগুলোর একটি। কৃষকেরা সারাবছর ফসল উৎপাদনের জন্য যে বকেয়া করত, দোকানগুলোতে সেগুলো নববর্ষের পূর্বদিন পরিশোধ করে দিয়ে নতুন হিসাবের খাতা খুলত। এটি পরে বাংলার আপামর জনতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে গেছে এবং পেয়েছে জাঁকজমকপূর্ণ বর্ণিল রূপ।
নববর্ষ আসলেই প্রথমেই কৃষকের কথা মনে পড়ে। কারণ তাদের প্রয়োজন ও শাসকদের প্রয়োজনেই বাংলা সনের উৎপত্তি। সৌর সন অনুযায়ী খাজনা আদায় করতে গেলে নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে হতো। সমস্যার সমাধানের জন্যই সৃষ্টি করা হয় বাংলা সন। বাংলা নববর্ষের সঙ্গে যে নামগুলো জড়িত সেগুলো হলো সম্রাট আকবর, আলাউদ্দিন হোসেন, সম্রাট শাহজাহান, সম্রাট আওরঙ্গজেব এবং ড. মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ। বাংলা সন প্রবর্তন হয় ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে, তবে গণনা শুরু হয় ১৫৫৬ সাল থেকে। এখন যে বাংলা পঞ্জিকা চালু আছে, সেটি তৈরি করেন ড. মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ। ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ সরকার এটি গ্রহণ করে। ১৯৮৯ সাল থেকে শুরু হওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রা নববর্ষকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ প্রতিবছর এটি আয়োজন করে থাকে। যদিও গত বছর ১৪৩২ বঙ্গাব্দে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা‘। মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে দেশের বিভিন্ন মানুষের মধ্যে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া, যা প্রতিবছর সমালোচনার জন্ম দেয়। এর আগে ১৯৬৭ সালে রমনার বটমূলে সংগীত গেয়ে সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট’ বর্ষবরণ অনুষ্ঠান পালন করত। পান্তা-ইলিশ খেত সবাই মিলে, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। পল্লীগ্রামের মানুষরা পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ খেত।
এখনও মনে পড়ে পহেলা বৈশাখ এলেই দেশের বিভিন্ন জায়গায় বসত বৈশাখী মেলা। হরেক রকম জিনিসপত্রের আগমন ঘটত। তরুণীরা শাড়ি পরে মেলা দেখতে যেত। চুড়ি-গহনা ইত্যাদি শখের বসে কিনত। তরুণরা বিভিন্ন গানের তালে নববর্ষকে বরণ করত। শিশু-কিশোররা মাটির তৈরি বিভিন্ন জিনিসপত্র কিনত। নাগরদোলায় চড়ে আনন্দ উপভোগ করত। প্রতিবছর বিনোদনের একটি বৃহৎ উৎস ছিল বৈশাখী মেলা। এখনও মনে আছে, আমি আমার মায়ের সঙ্গে বৈশাখী মেলায় যেতাম। বিভিন্ন জিনিসপত্র কিনে ঘরের আলমারিতে রেখে দিতাম। আমার মা ও আত্মীয়স্বজন তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র মেলা থেকে কিনতেন।
নববর্ষের প্রথম দিন আমরা খালি পায়ে বের হতাম। মাথায় গামছা বেঁধে কৃষক সাজতাম। এরপর মা বলতেন, ‘বছরের পহেলা দিন যার ভালো কাটে, সারাবছরই তার ভালো কাটে।’ তাই এই দিন সবার সঙ্গে দেখা হলে হাসিমুখে কথা বলতাম। ভালো খাবার খেয়ে উদযাপন করতাম। মনে হতো, ইলিশ ছাড়া নববর্ষ অর্থহীন। যাই হোক, বাংলা নববর্ষ মূলত কৃষকের সঙ্গে সম্পর্কিত। তর্ক-বিতর্কের বেড়াজালে আমরা এই দিনে কৃষকদের মনে করতে পারি না। নববর্ষ নিয়ে বর্ণিল উদযাপন হয়, কিন্তু আমাদের কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তন হয় না। সবাই এই দিনে কৃষক সাজতে চায়, কিন্তু কৃষকের মুক্তির জন্য কথা বলতে চায় না। কৃষকের পক্ষে কথা বলতে দেখা যায় না। কারণ কৃষক লাভবান হলে পুঁজিপতিদের ভালো মুনাফা অর্জন হবে না। যে কৃষক থেকে নববর্ষের উৎপত্তি, এখন সেই কৃষিকাজই হয়ে পড়ছে অলাভজনক। কিন্তু নববর্ষ উদযাপন এখন হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক লাভের মাধ্যম। আমরা নববর্ষের দিনে কতজন কৃষককে মিডিয়ার সামনে আনতে পেরেছি? কতজন কৃষকের দুঃখ লাঘব করতে পেরেছি?
এগুলো ভাবলে আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। সত্যিই কি আমরা সবুজ-শ্যামল বাংলাকে ভালোবাসতে পেরেছি? যা সম্পূর্ণ কৃষকদের শ্রমের কারুকার্য। সেই বাংলার নতুন বছরকে আমরা সাড়ম্বরে উদযাপন করি ঠিকই, কিন্তু কৃষকের দুঃখ লাঘবের জন্য বিন্দুমাত্র কাজ করি না। নববর্ষ এখন হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার। নিকট অতীত থেকে যা শুরু হয়েছে, তা এখন ক্যান্সারে পরিণত হয়েছে। যার ফলে নববর্ষ এখন পরিণত হয়েছে এলিটদের উৎসবে। টিএসসিতে কেউ এসে বলে, ‘আমি পান্তা ভাত খেতে পারি না, জীবনে খাইনি, বমি আসে।’ অথচ ভরদুপুরে কৃষক বিস্তর মাঠে ভাতে পানি মিশিয়ে আহার করেন। আমাদের জন্য উৎপন্ন করেন সোনার ফসল। নববর্ষের অঙ্গিকার হোক দেশের কৃষিকাজের উন্নতির জন্য। কৃষকদের কষ্ট আমাদের দূর করতেই হবে। নাহলে নববর্ষ আকাঙ্খা পূরণ হবে না। মনে রাখতে হবে কৃষক ছাড়া বাংলা নববর্ষ কখনোই পূর্নতা পাবে না। কৃষকের মুক্তি মানেই নববর্ষের জয়।
আবদুল কাদের জীবন
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়