ঢাকা শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬, ১৮ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ জীবন শ্রমিকের অধিকার

নাজিয়াত আক্তার
ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ জীবন শ্রমিকের অধিকার

দেখিনু সেদিন রেলে,

কুলি বলে এক বাবু সাব তারে ঠেলে দিলে নিচে ফেলে!

চোখ ফেটে এলো জল,

এমনি করে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?

কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত কবিতার চরণ আমাদের বলে দেয় সমাজের বাস্তব চিত্র। সমাজে শ্রমিকের অনিরাপদ জীবন অথচ তারাই সমাজের উঁচু স্থান তৈরি করার মূল কারিগর।

সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নের মূল ভিত্তি হলো শ্রমিক শ্রেণি। তাদের নিরলস পরিশ্রম, ঘাম এবং ত্যাগের বিনিময়ে গড়ে ওঠে শিল্প, কৃষি, নির্মাণ ও সেবাখাত। একটি দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে শ্রমিকদের অবদান অপরিসীম। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণিটি প্রায়ই তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। তাই ‘ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ জীবন- শ্রমিকের অধিকার’ একটি মৌলিক মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবি।

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৩ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে, যেখানে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক দিনরাত কাজ করছেন। এছাড়া প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রধান উৎস। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে শ্রমিকদের ভূমিকা অন্যতম। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য পরিশ্রমিক পাচ্ছে না কাজের ঘন্টা অনুযায়ী।

ন্যায্য মজুরি বলতে বোঝায় এমন পারিশ্রমিক যা শ্রমিকের কাজের পরিমাণ, দক্ষতা ও সময় অনুযায়ী যথার্থভাবে নির্ধারিত হয়। একজন শ্রমিক সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করার পর যদি তার প্রাপ্ত মজুরি দিয়ে নিজের ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে না পারে, তবে সেটি অন্যায় ও অমানবিক। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা- এই মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করার জন্য শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি অপরিহার্য। ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত না হলে দারিদ্র্যতা বৃদ্ধি পায়, সামাজিক বৈষম্য বেড়ে যায় এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়।

নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করাও শ্রমিকদের অন্যতম প্রধান অধিকার। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শ্রমিকরা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হয় যেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। কারখানায় অগ্নিকাণ্ড, ভবন ধস বা যন্ত্রপাতির ত্রুটির কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে, যা শ্রমিকদের জীবনকে বিপন্ন করে তোলে। এসব ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং পুরো সমাজের জন্য একটি বড় ক্ষতি। মাঝে মধ্যে সরকার কর্তৃক কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণও তারা পায় না। তাই কর্মস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব।

শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শ্রম আইন প্রণয়ন ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি মালিকপক্ষেরও দায়িত্ব রয়েছে শ্রমিকদের প্রতি সহানুভূতিশীল ও দায়িত্বশীল আচরণ করার। শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবা, বিশ্রামের সুযোগ এবং সামাজিক নিরাপত্তা প্রদান করা হলে তারা আরও উৎসাহ নিয়ে কাজ করতে পারবে, যা শেষ পর্যন্ত উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করবে।

এছাড়া শ্রমিকদের নিজেদের মধ্যেও সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। তারা যদি নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন না হয়, তবে সহজেই তারা শোষণের শিকার হতে পারে। শ্রমিক সংগঠনগুলো এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

বর্তমান বিশ্বে টেকসই উন্নয়নের জন্য শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। একটি দেশ তখনই প্রকৃত অর্থে উন্নত হতে পারে, যখন তার শ্রমিকরা সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারে।

আর শ্রমিকরা যখন সম্মানজনক জীবন যাপন করবে তখন কাজের প্রতি তাদের আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে যা অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা শুধু শ্রমিকদের অধিকার নয়, বরং এটি একটি উন্নত, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত।

বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর’ ১ মে ‘মে দিবস’ বা ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’ হিসেবে পালন করা হয় । ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটে দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করে এই দিবসটি পালন করা হয়। তাই বিশ্বব্যাপী এই দিনটি ‘মে দিবস’ বা ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে এই দিনটি এই সংগ্রামী জাতির আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

সরকার, মালিকপক্ষ, শ্রমিক এবং সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে এই বিষয়ে দায়িত্বশীল হতে হবে। শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা করা মানে শুধু একটি শ্রেণির উন্নয়ন নয়, বরং সমগ্র জাতির অগ্রগতি নিশ্চিত করা। শ্রমিকদের সম্মান ও অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই আমরা একটি ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তুলতে পারি।

নাজিয়াত আক্তার

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ফিচার, কলাম অ্যান্ড কনটেন্ট রাইটার্স

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত