ঢাকা রোববার, ০৭ জুন ২০২৬, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

সিন্ডিকেট সংস্কৃতি অর্থনীতির নীরব শত্রু

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল
সিন্ডিকেট সংস্কৃতি অর্থনীতির নীরব শত্রু

বাজার অর্থনীতির অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকে, উৎপাদন বাড়ে এবং ভোক্তারা ন্যায্য মূল্যে পণ্য ও সেবা পেয়ে থাকেন। কিন্তু যখন একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে কেন্দ্রীভূত করে কৃত্রিমভাবে সরবরাহ ও মূল্য নির্ধারণ করে, তখন সৃষ্টি হয় সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেট সংস্কৃতি ধীরে ধীরে একটি দেশের অর্থনীতির জন্য নীরব ভয়াবহ শত্রুতে পরিণত হয়।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ সমস্যা বিদ্যমান থাকলেও উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি। সিন্ডিকেট বলতে সাধারণত এমন এক ধরনের ব্যবসায়িক বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে বোঝায়, যারা পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে নিজেদের মুনাফা বৃদ্ধি করে। এর ফলে প্রকৃত বাজারব্যবস্থা ব্যাহত হয় এবং ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো পণ্যের উৎপাদন পর্যাপ্ত থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়।

আবার কখনও আমদানি, পরিবহন বা পাইকারি বাজারের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ইশারায় বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। বাংলাদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে সিন্ডিকেটের অভিযোগ নতুন বিষয় নয়। চাল, ডিম, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেল, চিনি কিংবা বিভিন্ন কৃষিপণ্যের বাজারে প্রায়ই মূল্য অস্থিতিশীলতা দেখা যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের পরিবর্তন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি বা সরবরাহ সংকটের মতো বাস্তব কারণ কিছু ক্ষেত্রে থাকলেও অনেক সময় বাজার বিশ্লেষকরা কৃত্রিম সংকট ও অসাধু মজুতদারির বিষয়টি তুলে ধরেন।

এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায় এবং নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষজন সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েন। সিন্ডিকেট সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো এটি বাজারের স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা নষ্ট করে। নতুন উদ্যোক্তা বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বাজারে টিকে থাকতে পারেন না।

বড় গোষ্ঠীগুলো তাদের আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে বাজারের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। ফলে ব্যবসায়িক পরিবেশে বৈষম্য সৃষ্টি হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে উদ্ভাবন ও বিনিয়োগের গতি কমে যায়। একটি সুস্থ অর্থনীতিতে যেখানে সৃজনশীলতা ও প্রতিযোগিতা উৎসাহিত হওয়ার কথা, সেখানে সিন্ডিকেট ব্যবস্থা এক ধরনের অদৃশ্য বাধা হিসেবে কাজ করে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বাজারে একচেটিয়া বা অলিগোপলি প্রবণতা বাড়লে ভোক্তা কল্যাণ কমে যায়। বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ তার ‘অদৃশ্য হাত’ তত্ত্বে মুক্ত প্রতিযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন। বাজারে যখন কৃত্রিম হস্তক্ষেপ ও গোষ্ঠীগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সেই স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। ফলস্বরূপ অর্থনীতির দক্ষতা কমে এবং সম্পদের সুষম বণ্টন বাধাপ্রাপ্ত হয়।

সিন্ডিকেট সংস্কৃতি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি সামাজিক ও নৈতিক সমস্যাও বটে। যখন মানুষ বারবার দেখে যে কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইন ও নীতিমালা উপেক্ষা করে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করছে, তখন সমাজে ন্যায়বিচার ও সুশাসনের প্রতিও আস্থার সংকট প্রবল হয়। সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা জন্ম নেয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ সমস্যা মোকাবিলায় কার্যকর বাজার তদারকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে বাজার পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং অসাধু মজুতদারি, কারসাজি ও মূল্য নিয়ন্ত্রণের অপচেষ্টা কঠোরভাবে দমন করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিযোগিতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইনগুলোর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে সরবরাহ ব্যবস্থা ও মূল্য তথ্যকে আরও স্বচ্ছ করা গেলে বাজার কারসাজির সুযোগ অনেকাংশে কমে আসবে।

এছাড়া কৃষক ও উৎপাদকদের সরাসরি বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোও জরুরি। মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমানো গেলে উৎপাদক ন্যায্য মূল্য পাবেন এবং ভোক্তারাও তুলনামূলক কম দামে পণ্য কিনতে পারবেন। সমবায়ভিত্তিক বিপণন ব্যবস্থা, আধুনিক সংরক্ষণাগার এবং ডিজিটাল বাজারব্যবস্থার প্রসার এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। ভোক্তা সচেতনতাও এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যদি বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন থাকে এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়, তাহলে অসাধু ব্যবসায়ীদের জন্য পরিস্থিতি সহজ থাকে না। গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজেরও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও জনসচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে বাজারের অসঙ্গতি তুলে ধরা হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর জবাবদিহির চাপ সৃষ্টি হয়। সিন্ডিকেট সংস্কৃতি একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে বড় বাধা। এটি বাজারের স্বাভাবিক গতিশীলতা নষ্ট করে, মূল্যস্ফীতি বাড়ায়, বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে এবং সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। একটি টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা অপরিহার্য। তাই অর্থনীতির এই নীরব শত্রুর বিরুদ্ধে সমন্বিত ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ গ্রহণই হতে পারে চলমান সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল

উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত