ঢাকা রোববার, ০৭ জুন ২০২৬, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ভেজাল খাদ্যের মরণকামড় আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া রক্ষা নেই

ভেজাল খাদ্যের মরণকামড় আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া রক্ষা নেই

বাজার থেকে টাকা দিয়ে দেশের মানুষ আসলে কী কিনছে- খাদ্য নাকি বিষ? গত শুক্রবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জনস্বাস্থ্যের যে ভয়াবহ ও রূঢ় বাস্তবতাকে সামনে এনেছে, তা এককথায় শিউরে ওঠার মতো। অতি মুনাফালোভী একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর সিন্ডিকেটের কারণে দেশের পুরো খাদ্যশৃঙ্খল পড়েছে বিপর্যয়ের মুখে। মাছ, মাংস, চাল, ডাল থেকে শুরু করে ফলমূল, মিষ্টি, এমনকি শিশুদের জীবন রক্ষাকারী গুঁড়া দুধ- কোনো কিছুই আজ বিষাক্ত রাসায়নিকের ছোবল থেকে মুক্ত নয়। জনস্বাস্থ্যের এই চরম সংকট নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে যে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।

বলা বাহুল্য, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক ল্যাব টেস্টের প্রতিবেদনগুলো একেকটি ভয়াবহ আতঙ্কের দলিল। বিএফএসএর গত ১০ মাসের প্রতিবেদন বলছে, পরীক্ষা করা ১ হাজার ৭৫৬টি নমুনার মধ্যে ৫৮৬টিতেই ভেজাল ও মারাত্মক দূষণের প্রমাণ মিলেছে। দেখা গেছে, আমাদের প্রধান খাদ্য চালের মধ্যে অতিমাত্রায় আর্সেনিক ও ক্রোমিয়াম, হলুদের গুঁড়ায় সিসা এবং মাছ-মুরগিতে মানুষের শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া যাচ্ছে! এমনকি শিশুদের প্রিয় চিপসের ৬৫ শতাংশে মিলছে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ‘অ্যাক্রিলামাইড’। শুধু তাই নয়, জিলাপি-মিষ্টিতে টেক্সটাইল হাইড্রোস, কাচ্চি বিরিয়ানিতে কাপড়ের ক্ষতিকর রং, পাম অয়েলে রং মিশিয়ে সরিষার তেল বানানোর মতো পৈশাচিক জালিয়াতিও এখন প্রকাশ্যেই ঘটছে।

আমাদের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এর চেয়ে ভয়াবহ চিত্র আর কী হতে পারে? যে খাবার খেয়ে মানুষের পুষ্টি পাওয়ার কথা, সেই খাবার খেয়ে মানুষ আজ ক্যানসার, লিভার সিরোসিস কিংবা কিডনি বিকল হওয়ার মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অথচ খাদ্যে বিষপ্রয়োগ রুখতে দেশে আইনের কোনো অভাব নেই। নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩, ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৫ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯ এর মতো বেশকিছু কঠোর আইন দেশে বিদ্যমান। এমনকি ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে খাদ্যে ভেজাল দেওয়া ও বিক্রির অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান পর্যন্ত রাখা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত আইন থাকা সত্ত্বেও ল্যাবরেটরির পরীক্ষায় কেন শুধুই ভেজালের উদ্বেগজনক চিত্রই মিলছে? এর একমাত্র কারণ, আইনের যথাযথ ও কঠোর প্রয়োগের অভাব।

এই মহাসংকট থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হলে সরকারকে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে এখন থেকেই জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। বাজার মনিটরিং বাড়াতে হবে। শুধু বিশেষ দিন বা উৎসব-পার্বণে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালালেই চলবে না; বরং মাঠ প্রশাসনে বছরজুড়ে নিয়মিত ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। ভেজাল প্রমাণিত হলে কেবল আর্থিক জরিমানা নয়, অপরাধীদের বিশেষ ক্ষমতা আইনে সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় এনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। অসাধু সিন্ডিকেটদের কারণে দেশের মানুষের জীবন এভাবে ঝুঁকিতে ফেলা যাবে না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগেই জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় কালবিলম্ব না করে সরকার সব আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করবে-এটাই প্রত্যাশা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত