প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৯ জুলাই, ২০২৬
একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন কিংবা অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে পরিমাপ করা যায় না; বরং নাগরিকদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবনমানই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান সূচক। একটি সুস্থ ও উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠী ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই বিশ্বের উন্নত দেশগুলো স্বাস্থ্যখাতকে ব্যয় নয়, বরং মানবসম্পদ উন্নয়নের একটি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করে।
ইসলামের দৃষ্টিতেও মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আমানত। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে পরিচ্ছন্নতা, পরিমিত আহার, রোগ প্রতিরোধ এবং অসুস্থ হলে চিকিৎসা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সুস্থ শরীর ও মন মানুষকে ইবাদত, মানবসেবা ও সমাজের কল্যাণে কার্যকর ভূমিকা পালনে সক্ষম করে। তাই স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ মানুষের জীবন রক্ষা ও আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের যথাযথ সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
স্বাধীনতার পর সীমিত সম্পদ নিয়ে যাত্রা শুরু করেও বাংলাদেশ গত পাঁচ দশকে স্বাস্থ্যখাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৭৩ বছরে উন্নীত হয়েছে, টিকাদান কর্মসূচি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে, মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার কমেছে এবং ১৪ হাজারেরও বেশি কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। স্বল্প সম্পদে এসব অর্জন আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
তবে এই অগ্রগতির পাশাপাশি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এখনও রয়েছে কাঠামোগত দুর্বলতা। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ণ, অসংক্রামক রোগের বিস্তার এবং বাড়তি স্বাস্থ্য চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অবকাঠামো ও দক্ষ জনবল বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়নি। ফলে সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ, শয্যা সংকট এবং চিকিৎসকদের ওপর অতিরিক্ত কর্মভার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর ২৫ হাজার ধাত্রী এবং এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের অঙ্গীকার সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দক্ষ পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই উদ্যোগ সফল হলে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা আরও শক্তিশালী হবে, নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত হবে, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা সম্প্রসারিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা মানুষের আরও কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত ইতোমধ্যে বহু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে; এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে একটি দক্ষ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার পথে দেশ আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।
স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম বড় সমস্যা হলো গ্রাম ও শহরের বৈষম্য। রাজধানী ও বড় শহরে উন্নত চিকিৎসা সুবিধা ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রাচুর্য থাকলেও জেলা, উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে অনেক রোগীকে সাধারণ চিকিৎসার জন্যও ঢাকায় আসতে হয়, যা রোগীর সময় ও ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি রাজধানীর হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো উচ্চ ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যব্যয়। সর্বশেষ স্বাস্থ্য বুলেটিন অনুযায়ী, দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৬৮.৫ শতাংশ পরিবারকে নিজস্ব অর্থ থেকে বহন করতে হয়। এতে অনেক পরিবার অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে পড়ে এবং অনেক মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ থেকেও বিরত থাকে। ফলে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা’ অর্জন কঠিন হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকট অবকাঠামোর চেয়ে দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি। হাসপাতাল ও আধুনিক সরঞ্জাম যত উন্নতই হোক, পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, ধাত্রী ও স্বাস্থ্যকর্মী ছাড়া মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীরাই একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল ভিত্তি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজার মানুষের বিপরীতে চিকিৎসকের সংখ্যা মাত্র ৭ দশমিক ২ জন এবং নিবন্ধিত নার্স ও ধাত্রীর সম্মিলিত সংখ্যা প্রায় ৬ দশমিক ২ জন। এই অনুপাত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় অনেক কম। বিশেষ করে উপজেলা ও গ্রামীণ এলাকায় চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট আরও প্রকট। অনেক পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকে এবং কর্মরত চিকিৎসকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ থাকায় রোগীদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অসম বণ্টনও বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সমস্যা। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রাজধানী ও বড় শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের মানুষ জটিল চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন। এ কারণে সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় অনেক রোগীর অবস্থা জটিল হয়ে ওঠে এবং ব্যয়ও বেড়ে যায়। রাজধানীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবার চাপ কমাতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ প্রেক্ষাপটে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী ২৫ হাজার ধাত্রী (মিডওয়াইফ) এবং এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের যে অঙ্গীকার করেছেন, তা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী ও সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ। একই সঙ্গে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের ৫১ শয্যার হাসপাতালগুলোকে পর্যায়ক্রমে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার ঘোষণাও স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে নতুন ভবন বা শয্যা বৃদ্ধি তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার সঙ্গে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, ধাত্রী, স্বাস্থ্যকর্মী, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার সমন্বয় ঘটবে।
আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ধাত্রীর ভূমিকা কেবল প্রসবসেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গর্ভধারণের শুরু থেকে প্রসবোত্তর সময় পর্যন্ত মা ও নবজাতকের সার্বিক পরিচর্যায় একজন প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফ অপরিহার্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউএনএফপিএ-এর মতে, পর্যাপ্ত সংখ্যক দক্ষ ধাত্রী নিশ্চিত করা গেলে মাতৃমৃত্যু, নবজাতকের মৃত্যু এবং প্রসবজনিত জটিলতার একটি বড় অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশনের প্রবণতা কমানো, নিরাপদ স্বাভাবিক প্রসব নিশ্চিত করা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে মাতৃস্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণেও ধাত্রীরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।
একইভাবে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীরা আধুনিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার নীরব চালিকাশক্তি। টিকাদান, পুষ্টি, পরিবার পরিকল্পনা, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের প্রাথমিক শনাক্তকরণ, স্বাস্থ্যশিক্ষা, মা ও শিশু পরিচর্যা, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ এবং দুর্যোগকালীন স্বাস্থ্যসেবায় তাদের অবদান অপরিসীম। বিশ্বের অনেক দেশ হাসপাতালনির্ভর চিকিৎসার পরিবর্তে কমিউনিটিভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ সেই দিকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
নিঃসন্দেহে এই উদ্যোগ বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। তবে এর প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে নিয়োগের স্বচ্ছতা, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ, গ্রামীণ এলাকায় কার্যকর পদায়ন, পর্যাপ্ত অবকাঠামো, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শক্তিশালী জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনার ওপর। এসব বিষয় নিশ্চিত করা গেলে প্রধানমন্ত্রীর এই অঙ্গীকার শুধু নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে না; বরং স্বাস্থ্যসেবাকে আরও জনমুখী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানসম্মত করে একটি সুস্থ, উৎপাদনশীল এবং মানবিক বাংলাদেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আধুনিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার অন্যতম মৌলিক নীতি হলো- রোগ হওয়ার পর চিকিৎসা করার চেয়ে রোগ প্রতিরোধ করা অধিক কার্যকর, কম ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘমেয়াদে অধিক ফলপ্রসূ। এ কারণেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা (সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা) অর্জনের লক্ষ্যে হাসপাতালনির্ভর চিকিৎসার পাশাপাশি শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং কমিউনিটিভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আসছে। ডব্লিউএইচও-এর মতে, জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের প্রায় ৮০-৯০ শতাংশ চাহিদা কার্যকর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব।
বাংলাদেশেও স্বাস্থ্যকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে টিকাদান, পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, পুষ্টি, স্বাস্থ্যশিক্ষা এবং সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। কোভিড-১৯ মহামারির সময় স্থানীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের কার্যকর ভূমিকা প্রমাণ করেছে যে, প্রশিক্ষিত কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রথম প্রতিরক্ষা স্তর। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যসেবার বিস্তৃত চাহিদার তুলনায় এই জনবল এখনও অপর্যাপ্ত।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যঝুঁকির ধরনও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
একদিকে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ক্যানসার ও কিডনি রোগের মতো অসংক্রামক রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে ডেঙ্গু, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং নতুন সংক্রামক রোগও জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ডব্লিউএইচও-এর মতে, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কমিউনিটি পর্যায়ে রোগের প্রাথমিক শনাক্তকরণ, নিয়মিত স্বাস্থ্যপরামর্শ, স্বাস্থ্যশিক্ষা এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণের কোনো বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীরাই সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেন।
এ বাস্তবতায় এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের সরকারি পরিকল্পনা বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে। যথাযথ প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা গেলে এই জনবল গ্রামাঞ্চলে রোগ প্রতিরোধ, মা ও শিশুস্বাস্থ্য, পুষ্টি, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সেবা এবং দুর্যোগকালীন স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম হবে। এতে হাসপাতালের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ কমবে এবং মানুষের দোরগোড়ায় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া আরও সহজ হবে।
বাংলাদেশের বর্তমান স্বাস্থ্যবাস্তবতা বিবেচনায় ২৫ হাজার ধাত্রী এবং এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি স্বাস্থ্যখাতের মানবসম্পদ উন্নয়নে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিনিয়োগ। ডব্লিউএইচও দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছে যে, দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা অর্জনের অন্যতম প্রধান বাধা। বিশ্বব্যাপী ২০৩০ সালের মধ্যে স্বাস্থ্যখাতে প্রায় এক কোটি কর্মীর ঘাটতি থাকবে বলেও সংস্থাটি পূর্বাভাস দিয়েছে, যার বড় অংশ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে।
২৫ হাজার ধাত্রী নিয়োগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে। ডব্লিউএইচও ও ইউএনএফপিএ-এর গবেষণা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফ মাতৃ ও নবজাতকের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় ৯০ শতাংশ মৌলিক সেবা প্রদান করতে সক্ষম। পর্যাপ্ত সংখ্যক দক্ষ ধাত্রী নিশ্চিত করা গেলে মাতৃমৃত্যু, নবজাতকের মৃত্যু এবং মৃত সন্তান প্রসবের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে স্বাভাবিক প্রসবকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশনের প্রবণতাও হ্রাস করা যায়।
এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের সম্ভাব্য প্রভাব আরও বিস্তৃত। এই জনবলকে কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা গেলে টিকাদান, পুষ্টি, পরিবার পরিকল্পনা, কিশোর-কিশোরীর স্বাস্থ্য, প্রবীণদের পরিচর্যা এবং অসংক্রামক রোগের প্রাথমিক শনাক্তকরণ আরও শক্তিশালী হবে। এতে রোগের প্রাথমিক পর্যায়েই হস্তক্ষেপ সম্ভব হবে এবং জেলা ও রাজধানীর হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
প্রধানমন্ত্রী উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের ৫১ শয্যার হাসপাতালগুলোকে পর্যায়ক্রমে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার যে পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন, সেটিও স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ইউএনএফপিএ-এর অভিজ্ঞতা বলছে, কেবল ভবন বা শয্যা বৃদ্ধি করলেই স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত হয় না; এর সঙ্গে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, ধাত্রী, ল্যাব টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার সমন্বয় নিশ্চিত করতে হয়। একইভাবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা করা গেলে রাজধানীকেন্দ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
তবে শুধু নতুন জনবল নিয়োগ করলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, স্বাস্থ্যখাতে সাফল্যের জন্য স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ, নিয়মিত দক্ষতা উন্নয়ন, গ্রামীণ এলাকায় কর্মরতদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, টেলিমেডিসিন ও ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ডের ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বয়ও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন কেবল একটি সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মসূচি নয়; এটি মানবসম্পদ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একজন সুস্থ নাগরিকই উৎপাদনশীল কর্মশক্তিতে পরিণত হন এবং দেশের উন্নয়নে কার্যকর অবদান রাখতে পারেন। তাই স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগকে ব্যয় নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি কৌশলগত জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত।পরিশেষে বলতে হয়, প্রধানমন্ত্রীর ২৫ হাজার ধাত্রী এবং এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের অঙ্গীকার সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দক্ষ পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই উদ্যোগ সফল হলে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা আরও শক্তিশালী হবে, নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত হবে, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা সম্প্রসারিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা মানুষের আরও কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত ইতোমধ্যে বহু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে; এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে একটি দক্ষ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার পথে দেশ আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।
ড. মো. মিজানুর রহমান
লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট