
বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকাংশেই বোরো ও আমন ধানের ওপর নির্ভরশীল। উত্তরাঞ্চলের রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা ও নীলফামারী এই পাঁচটি জেলাকে দেশের শস্যভাণ্ডার বলা হয়। অথচ টানা অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে এসব অঞ্চলের হাজার হাজার একর বীজতলা ও মাঠের ফসল জলমগ্ন।
কৃতির অমোঘ নিয়মে বর্ষা আসে, আর বাংলাদেশে বর্ষা মানেই নদ-নদীর স্ফীতি ও প্লাবন। কিন্তু চলতি মাসে যে পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে দেশ, তাকে শুধু ‘ঋতুভিত্তিক স্বাভাবিক দুর্যোগ’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
গত ১ জুলাই থেকে আবহাওয়া অধিদপ্তর ও পানি উন্নয়ন বোর্ড যে দীর্ঘমেয়াদী সতর্কবার্তা দিয়েছিল, তা ছিল এক আসন্ন মানবিক ও কৃষি বিপর্যয়ের স্পষ্ট সংকেত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সেই সতর্কবার্তা মাঠ পর্যায়ে কার্যকর প্রস্তুতির রূপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
যার ফলে, দেশের পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে তৈরি হয়েছে মানবিক সংকট এবং উত্তরাঞ্চলের শস্যভাণ্ডারগুলো এখন অস্তিত্বের লড়াইয়ে। বন্যা শুধু বাড়িঘর ভাসিয়ে নেয়নি, দেশের সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতির মেরুদণ্ডকেও দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বিভাগের সাতটি জেলাসহ দেশের পূর্বাঞ্চলের ৫৯টি উপজেলা ও ৩৩৪টি ইউনিয়ন পানির নিচে। সরকারি হিসেবে পানিবন্দি হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫৫ হাজার পরিবার, আর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ৬ লাখ।
পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যায় এ পর্যন্ত ৫৪ জনের প্রাণহানি এবং ৩৯ জনের আহত হওয়ার ঘটনা দুর্যোগের গভীরতাকে নির্দেশ করে। রাঙামাটি ও বান্দরবানের মতো পার্বত্য অঞ্চলে ঘরবাড়ি হারিয়ে হাজার হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। বিশুদ্ধ পানির অভাব, শিশুখাদ্যের সংকট এবং পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব এখন সময়ের অপেক্ষা।
বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকাংশেই বোরো ও আমন ধানের ওপর নির্ভরশীল। উত্তরাঞ্চলের রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা ও নীলফামারী- এই পাঁচটি জেলাকে দেশের শস্যভাণ্ডার বলা হয়। অথচ টানা অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে এসব অঞ্চলের হাজার হাজার একর বীজতলা ও মাঠের ফসল জলমগ্ন। পূর্বাঞ্চলের অন্যতম প্রধান ধানের মোকাম আশুগঞ্জ। প্রতিদিন এখান থেকে ১ লাখ মণ ধানের লেনদেন হয়। অথচ আধুনিক জেটি, শ্রমিকদের বিশ্রামাগার বা স্যানিটেশন ব্যবস্থার মতো ন্যূনতম নাগরিক সুযোগ-সুবিধাও এখানে নেই। ফলে দুর্যোগের সময় ধান পরিবহনে ব্যবসায়ী ও কৃষকদের যে ভোগান্তি পোহাতে হয়, তা দেশের চালের দামের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
বর্তমানে বাজারে ধান বিক্রি করতে গিয়ে কৃষক পড়ছেন মিশ্র প্রতিক্রিয়ার মুখে। চিকন ধানের দাম কিছুটা বেশি থাকলেও স্বর্ণা ও ব্রি-২৮ জাতের ধানের দাম উৎপাদন খরচের তুলনায় আশানুরূপ নয়। গুদামে রাখার সুযোগ না থাকায় এবং মাঠের ফসল দ্রুত মাড়াই করতে না পারায় কৃষকরা বাধ্য হয়ে পানির দরে ধান বিক্রি করছেন, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদী নিঃস্ব হওয়ার পথে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বন্যার তীব্রতার জন্য শুধু জলবায়ু পরিবর্তন দায়ী নয়, বরং প্রশাসনিক ব্যর্থতা এর অন্যতম প্রধান কারণ। আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের সতর্কবার্তা ছিল সুনির্দিষ্ট। অথচ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় প্রথম ধাপে ত্রাণ বরাদ্দ দিতে ১২ জুলাই পর্যন্ত সময় নিয়েছে। এই ১২ দিনের ব্যবধান হাজার হাজার পরিবারের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। অধ্যাপক আইনুন নিশাতের মতে, বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের টেকনিক্যাল ভাষাকে সাধারণ মানুষের বোধগম্য না করে তোলা পর্যন্ত সতর্কবার্তা সফল হবে না। স্থানীয় প্রশাসনের জনবল নিয়োগ বছরের পর বছর ঝুলে থাকায় বন্যা মোকাবিলা ও ত্রাণ কার্যক্রমে কর্মকর্তাদের হিমশিম খাওয়ার দৃশ্য শুধু অব্যবস্থাপনারই প্রমাণ দেয়। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় সরকার ধানবীজ ও চারা বিতরণের কার্যক্রম শুরু করেছে।
এছাড়া গবাদি পশুর রোগ নিয়ন্ত্রণে ১৫ দিনের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবে কৃষিমন্ত্রীর ঘোষিত ‘২ হাজার মিনি কোল্ড স্টোরেজ’ স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নই এখন আসল পরীক্ষা। দুর্যোগকালীন সময়ে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা অচল থাকায় পুনর্বাসন তদারকি নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। বন্যা বাংলাদেশিদের জীবনযাত্রার অংশ হলেও, এ বছরের দুর্যোগ আমাদের শিখিয়ে দিয়েছে যে পূর্বাভাস থাকলেই হবে না, সেই পূর্বাভাসকে মাঠ পর্যায়ে কার্যকর প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। শুধু ত্রাণ দিয়ে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
এর জন্য প্রয়োজন টেকসই পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং কৃষকদের উৎপাদনস্থলের কাছেই পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত উন্নয়ন। আগামী দিনের সম্ভাব্য বন্যা মোকাবিলায় সরকার কতটা নমনীয় ও সমন্বিত হতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে দেশের কৃষি অর্থনীতির ভবিষ্যৎ।