প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৯ জুলাই, ২০২৬
একটি বড় মাত্রার ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে রাজধানী ঢাকা। ভূতাত্ত্বিকরা আশঙ্কা করছেন, ৩০০ থেকে ৫০০ বছরের ‘রিটার্ন পিরিয়ড’ বা ভূমিকম্পের চক্র পূর্ণ হওয়ায় ঢাকা এখন ৭ থেকে সাড়ে ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। গত বছরের ২১ নভেম্বর নরসিংদীতে অনুভূত ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প এবং এর পরবর্তী ছোট ছোট কম্পন আমাদের মাটির নিচে জমে থাকা বিশাল শক্তিরই জানান দিচ্ছে। সম্প্রতি ভেনিজুয়েলার ৭ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্প যে ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র দেখিয়েছে, ঢাকার জন্য তা আরও বহুগুণ ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ত্রুটিপূর্ণ অবকাঠামো এবং দুর্যোগ-পরবর্তী অপ্রতুল প্রস্তুতি ঢাকাকে এক সম্ভাব্য ‘মৃত্যুপুরী’র কিনারে এনে দাঁড় করিয়েছে। এ মহাসংকট মোকাবেলার বিষয়টিকে এখনই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রস্তুতি গ্রহণ না করলে ঢাকাবাসীর জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।
ভূমিকম্প এমন এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা আগে থেকে অনুমান করা অসম্ভব; কিন্তু এর ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার বিষয়টি পুরোপুরি মানুষের প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে। ঢাকার প্রধান ভীতি হলো এর সুউচ্চ ও নিয়মবহির্ভূতভাবে নির্মিত ভবনগুলো। বিল্ডিং কোড অমান্য করে গড়ে ওঠা হাজার হাজার বহুতল ভবন ৭ মাত্রার কম্পন সহ্য করার ক্ষমতা রাখে না। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং সিটি করর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে অবিলম্বে ঢাকার প্রতিটি ভবনের ‘রেট্রোফিটিং’ বা ভূমিকম্প সহনশীলতা পরীক্ষা জোরদার করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত সংস্কার করার অথবা ভেঙে ফেলার সময় চলে যাচ্ছে। নতুন যে কোনো অবকাঠামো নির্মাণে শতভাগ বিল্ডিং কোড অনুসরণ নিশ্চিত করতে হবে এবং এতে কোনো ধরনের শিথিলতা বা দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া চলবে না।
শুধু অবকাঠামো সংস্কারই যথেষ্ট নয়, দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধারকাজের প্রস্তুতিও সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা নগরীর সরু গলি এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার কারণে ফায়ার সার্ভিস বা উদ্ধারকারী দলগুলোর বড় গাড়ি প্রবেশ করা প্রায় অসম্ভব। এ বাস্তবতায় পাড়া-মহল্লাভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন এবং তাদের আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির লাইনে স্বয়ংক্রিয় শাট-অফ (বন্ধ হওয়ার) ব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে, যাতে ভূমিকম্পের পরপরই শহরে অগ্নিকাণ্ড বা অন্যান্য সেকেন্ডারি বিপর্যয় এড়ানো যায়। এ ছাড়া প্রতিটি ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত খোলা জায়গা, মাঠ এবং জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি রাখা প্রয়োজন। আমাদের বড় ঘাটতি রয়েছে জনসচেতনতায়। সাধারণ মানুষের জানা নেই ভূমিকম্পের মুহূর্তে তাদের করণীয় কী। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত এবং গণমাধ্যমে নিয়মিত ‘মক ড্রিল’ বা মহড়া আয়োজনের মাধ্যমে নাগরিকদের মধ্যে দুর্যোগকালীন আত্মরক্ষার কৌশল ছড়িয়ে দিতে হবে।
বড় মাত্রার ভূমিকম্প ধ্বংসযজ্ঞ ও বিপুলসংখ্যক প্রাণহানির পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিকেও পঙ্গু করে দিতে পারে। নরসিংদীর ভূমিকম্প আমাদের যে মৃদু সতর্কবার্তা দিয়ে গেছে, তাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে হবে। সবকিছু নিয়তির ওপর ছেড়ে দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই। দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে রাষ্ট্র ও জনগণকে সমন্বিতভাবে ‘যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি’ গ্রহণ করতে হবে। এ ব্যাপারে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভূমিকম্পের মানবিক ও অবকাঠামোগত বিপর্যয় এড়ানো কঠিন হবে।