ঢাকা শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬, ৭ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

দুর্নীতি প্রতিরোধে হালাল রুজির গুরুত্ব

ফরিদুল ইসলাম
দুর্নীতি প্রতিরোধে হালাল রুজির গুরুত্ব

দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়; এটি একটি নৈতিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যাধি। ঘুষ, আত্মসাৎ, অবৈধ সুবিধা গ্রহণ, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার, প্রতারণা, স্বজনপ্রীতি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ ব্যক্তি ও পরিবারকে সাময়িকভাবে সমৃদ্ধ করলেও দীর্ঘমেয়াদে সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিত দুর্বল করে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইন, প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রয়োজনীয়; কিন্তু এর পাশাপাশি মানুষের বিবেক, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের জাগরণও অপরিহার্য। আর এখানেই ইসলামের হালাল রুজি বা বৈধ উপার্জনের শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

হালাল রুজি বলতে শুধু বৈধ পেশা থেকে আয় করাকে বোঝায় না; বরং উপার্জনের পদ্ধতিও হতে হবে সৎ, ন্যায়সংগত ও বৈধ। একজন সরকারি কর্মকর্তা বেতন নিচ্ছেন- কিন্তু দায়িত্ব পালনে ইচ্ছাকৃত গাফিলতি করছেন, ঘুষ ছাড়া সেবা দিচ্ছেন না কিংবা সরকারি সম্পদ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করছেন- তাহলে শুধু বেতনটি বৈধ হওয়াই যথেষ্ট নয়; তার দায়িত্ব পালনের সঙ্গে উপার্জনের নৈতিকতাও জড়িত।

একইভাবে একজন ব্যবসায়ী বৈধ পণ্য বিক্রি করলেও যদি মাপে কম দেন, ভেজাল দেন বা প্রতারণার মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেন, তাহলে তার উপার্জনের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। কোরআনের দৃষ্টিতে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ নিষিদ্ধ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং মানুষের সম্পদের কোনো অংশ জেনেশুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা শাসকদের কাছে পৌঁছে দিও না। (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৮)। এ আয়াত অন্যায়ভাবে সম্পদ অর্জন এবং ঘুষের মাধ্যমে অন্যের সম্পদ আত্মসাতের পথকে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করেছে। অর্থাৎ দুর্নীতির একটি বড় ভিত্তিই হলো- অন্যের অধিকার অন্যায়ভাবে নিজের করে নেওয়া। সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ঘুষ গ্রহণ, অবৈধ কমিশন, প্রকল্পের অর্থ লোপাট কিংবা প্রভাব খাটিয়ে অন্যের সম্পদ দখল- সব ক্ষেত্রেই মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়।

ইসলামে উপার্জন শুধু জীবনধারণের মাধ্যম নয়; এটি মানুষের চরিত্র ও আত্মিক জীবনের সঙ্গেও সম্পর্কিত। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি শুধু পবিত্র বা উত্তম জিনিসই গ্রহণ করেন। একই হাদিসে অবৈধ খাদ্য, পানীয় ও পোশাকের কারণে মানুষের দোয়া কবুল হওয়ার পথে বাধার কথাও এসেছে। এ শিক্ষা মানুষের সামনে একটি গভীর নৈতিক প্রশ্ন তুলে ধরে- আমরা সন্তানদের জন্য যে অর্থ উপার্জন করছি, সেই অর্থের উৎস কতটা পরিচ্ছন্ন? সন্তানের মুখে দামি খাবার তুলে দেওয়া, উন্নত শিক্ষার ব্যবস্থা করা কিংবা বিলাসবহুল জীবন নিশ্চিত করার আগে একজন মানুষের ভাবা উচিত- এই অর্থের মধ্যে কারও অধিকার জড়িত আছে কি না। কারণ অবৈধ অর্থ দিয়ে বাহ্যিক সুখ কেনা গেলেও নৈতিক শান্তি কেনা যায় না।

দুর্নীতির মূল কারণগুলোর একটি হলো অতিরিক্ত ও অন্যায় লাভের আকাঙ্ক্ষা। প্রয়োজনের সীমা অতিক্রম করে সম্পদ অর্জনের প্রবণতা যখন বিবেককে পরাজিত করে, তখন ঘুষ ও দুর্নীতি সহজ হয়ে ওঠে। হালাল রুজির ধারণা মানুষকে শেখায়- আয় যত কমই হোক, তা যেন সৎ পথে হয়। একজন ব্যক্তি যখন বিশ্বাস করেন যে তার রিজিক আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত এবং হারাম পথে অর্জিত সম্পদ তার কল্যাণ বয়ে আনবে না, তখন তার মধ্যে অবৈধ উপার্জনের প্রতি এক ধরনের নৈতিক প্রতিরোধ তৈরি হয়।

এ আত্মনিয়ন্ত্রণই দুর্নীতি প্রতিরোধের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি। শুধু ঘুষ না নেওয়াই যথেষ্ট নয় দুর্নীতি প্রতিরোধকে অনেক সময় শুধু ঘুষ না নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়। বাস্তবে বিষয়টি আরও বিস্তৃত। কাজ না করে বেতন নেওয়া, দায়িত্বে ইচ্ছাকৃত অবহেলা করা, সরকারি সময় ব্যক্তিগত কাজে ব্যয় করা, সরকারি গাড়ি বা সম্পদ ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করা, মিথ্যা বিল-ভাউচার তৈরি করা, প্রকল্পের কাজে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা, প্রাপ্য ব্যক্তিকে বঞ্চিত করে স্বজন বা পরিচিতজনকে সুবিধা দেওয়া- এসবও জনসম্পদ ও জনস্বার্থের সঙ্গে অসততার সম্পর্ক তৈরি করে। তাই হালাল রুজির শিক্ষা মানুষকে শুধু ‘ঘুষ নেব না’ বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে না; বরং আমি যার দায়িত্ব নিয়েছি, তার প্রতি আমানতদার থাকব- এই মানসিকতা গড়ে তোলে।

সরকারি চাকরি মূলত জনগণের অর্থে পরিচালিত একটি সেবামূলক দায়িত্ব। একজন সরকারি কর্মচারী যে বেতন পান, তার অর্থের উৎস রাষ্ট্রীয় রাজস্ব, আর রাষ্ট্রীয় রাজস্বের বড় অংশ আসে জনগণের কর ও অন্যান্য বৈধ আয় থেকে। ফলে সরকারি কর্মচারীর দায়িত্ব পালনে সততা শুধু ব্যক্তিগত নৈতিকতার বিষয় নয়; এটি জনগণের প্রতি আমানতের বিষয়। একজন কর্মচারী যদি নিয়মিত অফিসে উপস্থিত হন, আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন, জনগণকে হয়রানি না করেন, ঘুষ না নেন এবং সরকারি সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করেন- তাহলে তার বেতন শুধু জীবিকার উপায় নয়, সৎ সেবার বিনিময়ে অর্জিত সম্মানজনক রুজি হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে দায়িত্বে ফাঁকি দিয়ে বেতন নেওয়া কিংবা জনগণের ন্যায্য সেবা পাওয়ার অধিকারকে অর্থের বিনিময়ে আটকে দেওয়া নৈতিকতার গুরুতর সংকট তৈরি করে। দুর্নীতি শুধু অর্থ চুরি করে না, ভবিষ্যৎও চুরি করে একটি সড়ক নির্মাণে দুর্নীতি হলে শুধু সরকারি অর্থের অপচয় হয় না- মানুষের জীবনও ঝুঁকিতে পড়ে। একটি বিদ্যালয়ের নির্মাণকাজে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার হলে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি হলে মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সামাজিক নিরাপত্তার অর্থ আত্মসাৎ হলে অসহায় মানুষ তার প্রাপ্য সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়। অতএব দুর্নীতি মূলত মানুষের অধিকার হরণ করে। আর মানুষের অধিকার হরণ করে অর্জিত সম্পদকে কোনোভাবেই প্রকৃত কল্যাণের সম্পদ বলা যায় না। পরিবার থেকেই শুরু হতে পারে দুর্নীতিবিরোধী শিক্ষা, দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন শুধু আদালত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা দুর্নীতি দমনকারী প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। এর শুরু হওয়া উচিত পরিবার থেকে। একজন বাবা যদি সন্তানের সামনে ঘুষকে অতিরিক্ত আয় হিসেবে উপস্থাপন করেন, তাহলে সন্তান অসততাকে স্বাভাবিক হিসেবে শিখতে পারে। বিপরীতে বাবা-মা যদি বলেন- অল্প হলেও সৎভাবে উপার্জন করব, তাহলে সন্তান সততা ও আত্মমর্যাদার মূল্য শিখবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও হালাল রুজি, আমানতদারি, ন্যায়বিচার, দায়িত্ববোধ ও সততার শিক্ষা কার্যকরভাবে দেওয়া প্রয়োজন। ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিক শিক্ষাকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে দুর্নীতিবিরোধী মানসিকতা আরও শক্তিশালী হতে পারে। আইন ও নৈতিকতা- দুই পথেই এগোতে হবে, দুর্নীতি দমনে কঠোর আইন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য। একই সঙ্গে প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, ডিজিটাল সেবা, প্রক্রিয়ার সরলীকরণ, স্বার্থের সংঘাত নিয়ন্ত্রণ, সম্পদের হিসাব এবং অভিযোগের কার্যকর প্রতিকার। তবে শুধু শাস্তির ভয় দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে দুর্নীতি নির্মূল করা কঠিন। কারণ একজন মানুষ যদি সুযোগ পেলেই অন্যায় করতে প্রস্তুত থাকে, তাহলে আইন এড়িয়ে যাওয়ার নতুন পথও সে খুঁজবে। তাই আইনের পাশাপাশি তার বিবেককে জাগ্রত করতে হবে। তাকে বোঝাতে হবে- অবৈধ অর্থ শুধু আইনভঙ্গ নয়, এটি আত্মমর্যাদা, মানুষের অধিকার এবং নৈতিকতার বিরুদ্ধে অবস্থান।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে- হালাল ও সৎ উপার্জনের বিষয়ে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা জোরদার করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সেবার প্রক্রিয়া সহজ, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে, যাতে ঘুষের সুযোগ কমে। দায়িত্বে অবহেলা, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার এবং ঘুষকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। সৎভাবে জীবনযাপনকারী মানুষকে সামাজিক মর্যাদা দিতে হবে। সমাজে যদি অবৈধ সম্পদের মালিকই বেশি সম্মান পান, তাহলে তরুণ প্রজন্মের কাছে ভুল বার্তা যায়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলাকে নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং অভিযোগকারীদের নিরাপত্তা ও ন্যায্য প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই আসলে মানুষের লোভ, অসততা ও নৈতিক দুর্বলতার বিরুদ্ধে লড়াই। আইন দুর্নীতিবাজকে শাস্তি দিতে পারে, কিন্তু হালাল রুজির বিশ্বাস মানুষকে অন্যায় করার আগেই থামিয়ে দিতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে- জীবনে সম্পদের পরিমাণের চেয়ে সম্পদের উৎস অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অল্প হালাল রুজিতে যে শান্তি আছে, বিপুল হারাম সম্পদেও তা নেই।

অন্যায় পথে অর্জিত সম্পদ হয়তো ব্যাংক হিসাব ভারী করতে পারে, কিন্তু মানুষের বিবেককে ভারী করে না; বরং বোঝা বাড়ায়। তাই দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়তে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, মানুষের উপার্জনের দর্শনও বদলাতে হবে। আমাদের সন্তানদের শেখাতে হবে- সফলতা মানে শুধু বেশি অর্থ নয়; সফলতা হলো সৎ পথে অর্জিত অর্থ, ন্যায়সঙ্গত জীবন এবং মানুষের অধিকার অক্ষুণ্ণ রেখে এগিয়ে চলা।

হালাল রুজির প্রতি এ দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্তি থেকে পরিবারে, পরিবার থেকে সমাজে এবং সমাজ থেকে রাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়লে দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী নৈতিক প্রতিরোধ গড়ে উঠতে পারে। আর সেই প্রতিরোধই হতে পারে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র নির্মাণের অন্যতম ভিত্তি।

লেখক : কবি ও গবেষক।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত