ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

মক্কা চুক্তি : বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

জুবাইয়া বিন্তে কবির
মক্কা চুক্তি : বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

মক্কা শুধু একটি শহরের নাম নয়; মুসলমানদের কাছে এটি বিশ্বাস, ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের এক গভীর প্রতীক। সেই মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান যখন 'মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি' স্বাক্ষর করল, তখন ঘটনাটি স্বাভাবিকভাবেই মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ও কৌশলগত আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করে। চুক্তির মূলনীতি- তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা। এর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বাংলাদেশের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার প্রশ্নটি সামনে এসেছে। প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বাংলাদেশ চুক্তিটিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে বলে জানান। জাতীয় সংসদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানও বলেন, সদস্যদেশগুলো বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানালে ঢাকা বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে। তবে তিনি একই সঙ্গে স্পষ্ট করেছেন- এখনও বাংলাদেশের যোগদানের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

এটি কি 'মুসলিম ন্যাটো'? মক্কা চুক্তির সবচেয়ে আলোচিত বৈশিষ্ট্য অবশ্যই এর যৌথ প্রতিরক্ষা ধারা। কিন্তু একে সরাসরি 'মুসলিম ন্যাটো' বলা এখনও অতিরঞ্জন। ন্যাটোর রয়েছে বহু দশকের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, সমন্বিত কমান্ড ব্যবস্থা, যৌথ সামরিক পরিকল্পনা ও সুসংহত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া। মক্কা চুক্তি এখনও সেই পর্যায়ের পরিণত সামরিক জোট নয়। তবে একে নিছক প্রতীকী ঘোষণাও বলা যাবে না। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জানিয়েছেন, আক্রান্ত সদস্যের আনুষ্ঠানিক অনুরোধের পর সহায়তার ধরন পরিস্থিতি অনুযায়ী গোয়েন্দা তথ্য, লজিস্টিক সহায়তা থেকে সামরিক ইউনিট মোতায়েন পর্যন্ত হতে পারে। নিয়মিত মন্ত্রী ও সামরিক কর্মকর্তাদের বৈঠক এবং সৌদি আরবে একটি স্থায়ী সচিবালয় প্রতিষ্ঠার কথাও বলা হয়েছে। অর্থাৎ চুক্তিটি এখনও বিকাশমান হলেও এর মধ্যে একটি বাস্তব নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।

কেন এ তিন দেশ এক হলো? তিন প্রতিষ্ঠাতা দেশের শক্তির ধরন ভিন্ন, কিন্তু পরস্পরকে পরিপূরক। সৌদি আরবের হাতে রয়েছে বিপুল অর্থনৈতিক ও জ্বালানি শক্তি এবং মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাব। তুরস্কের রয়েছে বৃহৎ সামরিক বাহিনী, ন্যাটো-অভিজ্ঞতা এবং দ্রুত বিকাশমান নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প। পাকিস্তানের রয়েছে বড় ও যুদ্ধ-অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী এবং মুসলিম বিশ্বের একমাত্র ঘোষিত পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার।

এ তিন শক্তির সমন্বয় একটি নতুন ধরনের প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করতে পারে। সৌদি অর্থায়ন, তুর্কি প্রযুক্তি ও পাকিস্তানি সামরিক দক্ষতা একত্র হলে ড্রোন, আকাশ প্রতিরক্ষা, নৌপ্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, সাইবার নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা উৎপাদনে সহযোগিতার পরিধি বাড়তে পারে। চুক্তির ঘোষণাতেও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও যৌথ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।

কেন ঠিক এখন? মক্কা চুক্তির তাৎপর্য বুঝতে হলে এর সময়টিকে বুঝতে হবে। পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘদিনের সংঘাত, ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, লোহিত সাগর ও উপসাগরীয় নৌপথের নিরাপত্তা এবং মার্কিন নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার প্রশ্ন- সব মিলিয়ে আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজাচ্ছে।

সৌদি আরবের জন্য শিক্ষা স্পষ্ট: শক্তিশালী মিত্র থাকা আর প্রত্যেক পরিস্থিতিতে সেই মিত্রের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা পাওয়া এক বিষয় নয়। ফলে রিয়াদ একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে এবং তুরস্ক-পাকিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা গভীর করছে। সৌদি কর্মকর্তারাও অবশ্য বলছেন, মক্কা চুক্তি কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয় এবং এটি বিদ্যমান অংশীদারত্বের বিকল্প নয়।

বাংলাদেশের প্রতি সম্ভাব্য আগ্রহের পেছনেও বাস্তব ভূরাজনীতি রয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জনবহুল মুসলিম দেশ, বঙ্গোপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ ভূ-কৌশলগত অবস্থানে অবস্থিত এবং মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে শ্রম, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রবাসী আয়ের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সৌদি আরব বাংলাদেশকে মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। অন্যদিকে ঢাকার প্রকাশ্য অবস্থান হলো- চুক্তিটিকে ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে, কিন্তু সদস্যপদের সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি।

এখানেই বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছে: আমন্ত্রণকে সম্মান করা এবং একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জাতীয় স্বার্থের কঠিন হিসাব করা।

বাংলাদেশের সম্ভাব্য সবচেয়ে বড় লাভ হতে পারে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে। তুরস্ক গত কয়েক বছরে ড্রোন, যুদ্ধজাহাজ, সাঁজোয়া যান, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ও অন্যান্য প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা অর্জন করেছে। পাকিস্তানের রয়েছে দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা, আর সৌদি আরবের রয়েছে বৃহৎ অর্থনৈতিক সামর্থ্য। বাংলাদেশ যদি চুক্তির পূর্ণ সদস্য হয়, তাহলে যৌথ প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি বিনিময়, প্রতিরক্ষা গবেষণা, ড্রোন ও সাইবার নিরাপত্তা, সামুদ্রিক নজরদারি এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে অংশীদারত্বের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য 'ক্রেতা' থেকে ধীরে ধীরে 'সহযোগী উৎপাদক' হওয়ার পথ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। তবে এখানে শর্ত একটাই- বাংলাদেশকে শুধু অস্ত্র কিনলে চলবে না; প্রযুক্তি হস্তান্তর, যৌথ উৎপাদন ও দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

দ্বিতীয় লাভ- সামরিক প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি : বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। কিন্তু আধুনিক যুদ্ধের প্রকৃতি দ্রুত বদলাচ্ছে। ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার আক্রমণ, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, স্যাটেলাইট নজরদারি এবং সমুদ্রভিত্তিক নিরাপত্তা এখন জাতীয় প্রতিরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মক্কা কাঠামোর অধীনে নিয়মিত যৌথ মহড়া ও সামরিক বিনিময় হলে বাংলাদেশের বাহিনী তুরস্কের প্রযুক্তি, পাকিস্তানের যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা এবং সৌদি আরবের আধুনিক প্রতিরক্ষা অবকাঠামোর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হতে পারে। চুক্তির ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গভীর করার বিষয়টি রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এটি কেবল সামরিক লাভ নয়; দীর্ঘমেয়াদে এটি প্রতিরক্ষা গবেষণা, প্রকৌশল শিক্ষা ও দেশীয় প্রযুক্তি শিল্পেরও ভিত্তি শক্ত করতে পারে।

তৃতীয় লাভ- সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তির সঙ্গে সংযোগ : সৌদি আরব বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশ নয়; এটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক শক্তি। লাখ লাখ বাংলাদেশি সেখানে কাজ করেন এবং তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তাই নিরাপত্তা সহযোগিতার সঙ্গে যদি বিনিয়োগ, জ্বালানি, বন্দর, অবকাঠামো, শিল্প, দক্ষতা উন্নয়ন ও শ্রমবাজারের সুযোগ যুক্ত করা যায়, তাহলে মক্কা কাঠামো বাংলাদেশের জন্য বৃহত্তর অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের দরজা খুলতে পারে। তবে বাংলাদেশকে এখানে অত্যন্ত বাস্তববাদী হতে হবে। সামরিক সম্পর্কের বিনিময়ে অর্থনৈতিক সুবিধা নয়; বরং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক সমন্বিত অংশীদারত্বই হওয়া উচিত লক্ষ্য।

চতুর্থ লাভ- মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ওজন : বাংলাদেশের জনসংখ্যার বিপুল অংশ মুসলমান। কিন্তু মুসলিম বিশ্বের কূটনৈতিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের ভূমিকা তার জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক গুরুত্বের তুলনায় আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে একটি প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা কাঠামোতে যুক্ত হলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক দৃশ্যমানতা বাড়তে পারে। ফিলিস্তিন, রোহিঙ্গা সংকট, ইসলামফোবিয়া, মুসলিম বিশ্বের অর্থনৈতিক সহযোগিতা কিংবা উন্নয়ন প্রশ্নে বাংলাদেশ আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে।

তবে বাংলাদেশের কূটনীতি যেন কখনও ধর্মীয় আবেগের বন্দি না হয়। মুসলিম বিশ্বের অংশ হওয়া যেমন বাংলাদেশের পরিচয়ের বাস্তবতা, তেমনি বাংলাদেশ একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার একটি রাষ্ট্র, বঙ্গোপসাগরীয় দেশ এবং জাতিসংঘকেন্দ্রিক বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সক্রিয় অংশীদার।

পঞ্চম লাভ- রোহিঙ্গা ও মিয়ানমার প্রশ্নে নতুন সমর্থন : বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রত্যক্ষ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জগুলোর একটি মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা সংকট। কয়েক বছর ধরে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছে। এই সংকটের সমাধান শুধু মানবিক নয়; এটি সীমান্ত, নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।

তুরস্ক ও সৌদি আরব রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিকভাবে সক্রিয় হয়েছে। পাকিস্তানেরও মিয়ানমারসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে একটি প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা সম্পর্ক বাংলাদেশের রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও মিয়ানমার-সংক্রান্ত কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় নতুন সমর্থন তৈরি করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রেও সামরিকীকরণ নয়, কূটনৈতিক চাপ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাই বাংলাদেশের প্রধান অস্ত্র হওয়া উচিত।

বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্রমেই সমুদ্রনির্ভর হচ্ছে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর, মাতারবাড়ী, বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক সম্পদ এবং ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যপথ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তুরস্কের নৌপ্রযুক্তি এবং সৌদি আরব-পাকিস্তানের সামুদ্রিক নিরাপত্তা অভিজ্ঞতার সঙ্গে সহযোগিতা বাংলাদেশের কোস্টাল সার্ভেইলেন্স, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, দুর্যোগ মোকাবিলা ও অবৈধ পাচার প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে। এখানে একটি বড় সুযোগ হলো- বাংলাদেশ মক্কা কাঠামোকে শুধু 'যুদ্ধের জোট' হিসেবে না দেখে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, মানবিক উদ্ধার ও শান্তিরক্ষার ক্ষেত্রেও কাজে লাগাতে পারে।

কিন্তু সবচেয়ে বড়ঝুঁকি- অন্যের যুদ্ধ নিজের যুদ্ধ হয়ে যাওয়া : লাভের তালিকা যত দীর্ঘ, ঝুঁকির তালিকাও তত গুরুত্বপূর্ণ। চুক্তির মূলনীতি হলো এক সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলা অন্য সদস্যদের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে। যদিও তুরস্ক জানিয়েছে, সহায়তা পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্ধারিত হবে এবং আক্রান্ত দেশকে আনুষ্ঠানিক সহায়তা চাইতে হবে, তবু বাংলাদেশের জন্য প্রশ্ন থেকেই যায়: ভবিষ্যতে কোন পরিস্থিতিকে 'আক্রমণ' বলা হবে? সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের সংঘাত হলে? পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সংঘাত হলে? তুরস্ক কোনো আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে? এসব সংঘাত বাংলাদেশের সরাসরি যুদ্ধ নয়। কিন্তু পূর্ণ প্রতিরক্ষা সদস্য হলে তার কৌশলগত অভিঘাত বাংলাদেশকে বহন করতে হতে পারে। রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে বড় প্রশ্ন আর কী হতে পারে?

ভারতকে ভয় নয়, বাস্তবতা বুঝতে হবে : মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান নিয়ে ভারতের উদ্বেগ এরইমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, নয়াদিল্লি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত সব উন্নয়ন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কিন্তু একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা নীতি অন্য রাষ্ট্রের উদ্বেগ দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে না। ভারত তার জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী নীতি নির্ধারণ করবে; বাংলাদেশও করবে বাংলাদেশের স্বার্থ অনুযায়ী। আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান যথার্থই বলেছেন- 'ভারত ভারত হিসেবে চলবে, বাংলাদেশ বাংলাদেশ হিসেবে চলবে।' এ আত্মবিশ্বাসই হওয়া উচিত বাংলাদেশের কূটনীতির ভিত্তি। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু নির্ভরতা নয় : মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়া মানে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়। বরং বাংলাদেশের উচিত একই সঙ্গে দিল্লি, বেইজিং, ওয়াশিংটন, রিয়াদ, আঙ্কারা, ইসলামাবাদ, টোকিও ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা। আধুনিক কূটনীতির শক্তি হলো বহুমাত্রিকতা। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হতে পারে- কোনো একটি শক্তির ছায়ায় না দাঁড়িয়ে একাধিক শক্তির সঙ্গে জাতীয় স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখা। মক্কা চুক্তিতে যোগদানও সেই বহুমুখী কূটনীতির একটি স্তম্ভ হতে পারে।

'সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব' নতুন বাস্তবতায় নতুন অর্থ : 'সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়' বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত কূটনৈতিক দর্শন। কিন্তু বন্ধুত্ব মানে আত্মসমর্পণ নয়। বন্ধুত্বের অর্থ হলো পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক। মক্কা চুক্তিতে যোগদানকে তাই কোনো রাষ্ট্রবিরোধী সামরিক অবস্থান হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিকল্প সম্প্রসারণ হিসেবে দেখতে হবে। তুরস্কও স্পষ্ট করেছে, চুক্তিটি কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে নয় এবং বন্ধুত্বপূর্ণ অন্য দেশগুলোর জন্য এর দরজা খোলা।

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রশ্নও ভুললে চলবে না : বাংলাদেশের ভূরাজনীতি শুধু ভারতকে কেন্দ্র করে নয়। চীন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা অংশীদার। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ইউরোপীয় ইউনিয়নও বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সম্পদ হলো- একই সঙ্গে বহু শক্তির সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা। কোনো একটি সামরিক ব্লকে ঢুকে সেই কৌশলগত নমনীয়তা নষ্ট করা উচিত হবে না। অতএব মক্কা চুক্তিতে যোগদান যদি হয়ও, সেটি যেন কোনো 'ব্লক রাজনীতি'র ঘোষণা না হয়ে ওঠে।

ইরান প্রশ্নটি আরও কঠিন : বাংলাদেশের সঙ্গে ইরানের কোনো মৌলিক সামরিক বিরোধ নেই। কিন্তু মক্কা চুক্তির ভবিষ্যৎ যদি উপসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে, তাহলে ইরান-সৌদি উত্তেজনা বাংলাদেশের জন্য একটি কঠিন কূটনৈতিক পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বাংলাদেশ কি কোনো সংঘাতে সেনা পাঠাবে? তার আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেবে? গোয়েন্দা তথ্য দেবে? নাকি শুধু কূটনৈতিক সমর্থন দেবে? এসব প্রশ্নের উত্তর না জেনে সদস্যপদ গ্রহণ করা হবে অনেকটা চুক্তির 'বড় অক্ষর' পড়ে 'ছোট অক্ষর' না পড়েই স্বাক্ষর করার মতো। আর রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো প্রায়ই ছোট অক্ষরেই লেখা থাকে।

বাংলাদেশের জন্য তৃতীয় পথ খোলা আছে : বাংলাদেশের সামনে শুধু 'যোগ দেওয়া' অথবা 'যোগ না দেওয়া' এই দুই বিকল্প নেই। সবচেয়ে বুদ্ধিমান পথ হতে পারে ধাপে ধাপে এগোনো। বাংলাদেশ প্রথমে পর্যবেক্ষক বা সংলাপের অংশীদার হতে পারে। যৌথ প্রশিক্ষণ, সাইবার নিরাপত্তা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, শান্তিরক্ষা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও গবেষণায় অংশ নিতে পারে। কিন্তু স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্যের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বাধ্যবাধকতা গ্রহণ না করেও এই সহযোগিতা সম্ভব। এটি বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনও বজায় রাখবে, আবার নতুন অংশীদারত্বের সুবিধাও দেবে।

পূর্ণ সদস্য হলে বাংলাদেশের শর্ত থাকা চাই : যদি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ পূর্ণ সদস্য হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে কয়েকটি শর্ত স্পষ্ট করা জরুরি। প্রথমত, 'collective defence' কখন কার্যকর হবে। দ্বিতীয়ত, চুক্তির ভৌগোলিক পরিধি কী। তৃতীয়ত, সদস্যদের সামরিক সহায়তার প্রকৃতি কী। চতুর্থত, কোনো সংঘাতে বাংলাদেশের নিজস্ব সাংবিধানিক ও সার্বভৌম সিদ্ধান্তের অধিকার অক্ষুণ্ন থাকবে কি না। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো বাংলাদেশের সংসদ ও জনগণের কাছে চুক্তির বাধ্যবাধকতা পরিষ্কার থাকা উচিত। প্রতিরক্ষা চুক্তি কোনো আবেগের দলিল নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নীতির দলিল।

বাংলাদেশের আসল প্রতিরক্ষা নিজের শক্তি : ভারতকে মোকাবিলার জন্য অন্যের ছায়ায় দাঁড়ানো কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। বাংলাদেশের নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় নিশ্চয়তা হবে একটি শক্তিশালী অর্থনীতি, আধুনিক সশস্ত্র বাহিনী, দক্ষ কূটনীতি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় ঐক্য। নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলতে হবে। ড্রোন, সাইবার নিরাপত্তা, রাডার, স্যাটেলাইট নজরদারি, নৌপ্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতায় বিনিয়োগ করতে হবে। বঙ্গোপসাগরে নিজের উপস্থিতি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে অর্থনীতিকে বহুমুখী করতে হবে, যাতে কোনো এক দেশ বা বাজার বাংলাদেশের ওপর অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করতে না পারে। একটি আত্মনির্ভর বাংলাদেশই সবচেয়ে কার্যকর কৌশলগত প্রতিরোধ।

তারেক রহমানের জন্য ঐতিহাসিক সুযোগ : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে তাই একটি বিরল সুযোগ এসেছে। তিনি চাইলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে নতুন ভারসাম্যের দিকে নিয়ে যেতে পারেন যেখানে ভারত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী, চীন গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার, যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও কৌশলগত অংশীদার, আর সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম ও প্রতিরক্ষা অংশীদার। কারও বিরুদ্ধে গিয়ে নয়; বরং সবার সঙ্গে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক রেখে। মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদান তার সরকারের 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' নীতির একটি দৃশ্যমান কৌশলগত ঘোষণা হতে পারে।

বন্ধুর সংখ্যা বাড়াতে হবে : রাষ্ট্রনীতির একটি সহজ সূত্র আছে শত্রু কমাও, বন্ধু বাড়াও; কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা হারিয়ো না। মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশকে এই নীতিই অনুসরণ করতে হবে। ভারতকে জানাতে হবে, এটি তার বিরুদ্ধে নয়। চীনকে জানাতে হবে, এটি অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিকল্প নয়। যুক্তরাষ্ট্রকে জানাতে হবে, বাংলাদেশ কোনো নতুন সংঘাতের অংশ হতে যাচ্ছে না। আর সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানকে জানাতে হবে- বাংলাদেশ বন্ধুত্ব চায়, কিন্তু সেই বন্ধুত্বের ভিত্তি হবে পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ।

পরিশেষে, শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি ধর্মীয় আবেগের নয়, রাষ্ট্রীয় স্বার্থের। মক্কার পবিত্রতা বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে গভীর; সৌদি আরবের সঙ্গে আমাদের আত্মিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর; তুরস্কের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক দ্রুত বাড়ছে; পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কও নতুন বাস্তবতায় পুনর্গঠিত হচ্ছে। সেই বাস্তবতায় মক্কা চুক্তি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় কৌশলগত সুযোগ। আজ যখন এর প্রতিষ্ঠাতা তিন দেশ ইস্তাম্বুলে প্রথম বৈঠকে বসছে, তখন ঢাকারও নীরব দর্শক হয়ে থাকার সময় শেষ। আমার বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশকে সাহসী কিন্তু বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে- মক্কা চুক্তিতে যোগ দিতে হবে, তবে বাংলাদেশের শর্তে; বন্ধুত্বের হাত বাড়াতে হবে, কিন্তু সার্বভৌম সিদ্ধান্তের অধিকার অক্ষুণ্ন রেখে। বাংলাদেশ কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যাবে না; বাংলাদেশ যাবে নিজের স্বার্থের পক্ষে। ভারতের অনুমতি নিয়ে নয়, কারও বিরোধিতা করেও নয়- নিজের শক্তি, মর্যাদা ও ভবিষ্যতের হিসাব কষেই। কারণ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সম্পদ হলো তার স্বাধীন সিদ্ধান্ত। আর আজকের পৃথিবীতে নিরাপত্তা মানে শুধু সেনাবাহিনী নয় অর্থনীতি, প্রযুক্তি, কূটনীতি, জ্বালানি, সমুদ্র, জনশক্তি ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের সম্মিলিত শক্তি। মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদান যদি সেই জাতীয় শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে, তাহলে ইতিহাসের এই মুহূর্তে পিছিয়ে থাকার কোনো কারণ নেই। মক্কা থেকে যে নতুন নিরাপত্তা-দিগন্তের সূচনা হয়েছে, তার সঙ্গে বাংলাদেশকে যুক্ত হতে হবে- বাংলাদেশের পতাকা নিয়েই।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক, কলামিস্ট।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত