প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
রং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ট্রাফিক সংকেত, পোশাক, ফল-মূল, ফুল, বইয়ের ছবি, মানচিত্র, শিক্ষামূলক চিত্র কিংবা বিভিন্ন নির্দেশনায় রঙের ব্যবহার রয়েছে। কিন্তু সবার চোখ রংকে একইভাবে শনাক্ত করে না। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট রঙের পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা কম থাকে। এ অবস্থাকে সাধারণভাবে রং-অন্ধত্ব বা রং দেখার ঘাটতি বলা হয়। রং-অন্ধত্ব মানেই অন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। অধিকাংশ আক্রান্ত ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবেই দেখতে পারেন, তবে কিছু রঙের মধ্যে পার্থক্য করতে অসুবিধা হয়। এটি জন্মগত হতে পারে, আবার জীবনের পরবর্তী সময়েও বিভিন্ন রোগ বা চোখের সমস্যার কারণে দেখা দিতে পারে।
দিবসটির ইতিহাস : প্রতি বছর ৬ সেপ্টেম্বর রং-অন্ধত্ব সচেতনতা দিবস পালন করা হয়। দিবসটি ২০১৫ সালে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ হিসেবে শুরু হয়। ৬ সেপ্টেম্বর তারিখটি বেছে নেওয়ার সঙ্গে বিজ্ঞানী জন ডাল্টনের জন্মদিনের সম্পর্ক রয়েছে। তিনি নিজের রঙ দেখার অভিজ্ঞতা এবং রঙের পার্থক্য নিয়ে বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করেছিলেন। এই দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো- রং-দৃষ্টির ঘাটতি সম্পর্কে মানুষকে জানানো, আক্রান্ত শিশুদের সমস্যা বোঝা এবং শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়ক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
বিশ্বব্যাপী পরিসংখ্যান : বিশ্বে আনুমানিক ৩০ কোটি মানুষ কোনো না কোনো মাত্রার রং দেখার ঘাটতি নিয়ে জীবনযাপন করেন। সাধারণভাবে বংশগত লাল-সবুজ রঙের ঘাটতি পুরুষদের মধ্যে প্রায় ৮ শতাংশ এবং নারীদের মধ্যে প্রায় ০.৫ শতাংশ দেখা যায়। অর্থাৎ গড়ে প্রায় প্রতি ১২ জন পুরুষের একজন এবং প্রতি ২০০ জন নারীর একজন লাল-সবুজ রঙের পার্থক্য শনাক্ত করতে সমস্যায় পড়তে পারেন। শিশুদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক শিশু বুঝতেই পারে না যে তারা অন্যদের তুলনায় রং ভিন্নভাবে দেখছে। ফলে বিদ্যালয়ে রঙের ওপর নির্ভরশীল বিভিন্ন কাজে তাদের সমস্যা হলেও তা সবসময় দ্রুত শনাক্ত হয় না।
রং-অন্ধত্বের প্রধান কারণ : বংশগত- জিনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে জন্ম থেকেই রং শনাক্ত করার ক্ষমতায় ঘাটতি থাকতে পারে। লাল-সবুজ রঙের ঘাটতি বংশগত হওয়ার প্রবণতা বেশি।
চোখের রোগ : রেটিনা বা চোখের অন্যান্য অংশের কিছু রোগের কারণে রঙ দেখার ক্ষমতা পরিবর্তিত হতে পারে।
দৃষ্টিস্নায়ুর সমস্যা : চোখ থেকে মস্তিষ্কে দৃষ্টির সংকেত বহনকারী স্নায়ু আক্রান্ত হলে রং শনাক্ত করার ক্ষমতায় পরিবর্তন আসতে পারে।
মস্তিষ্কের সমস্যা : দৃষ্টিকে বিশ্লেষণ করে এমন মস্তিষ্কের অংশে সমস্যা হলে রং বোঝার ক্ষেত্রে অসুবিধা হতে পারে।
বয়সজনিত পরিবর্তন : বয়স বাড়ার সঙ্গে চোখের বিভিন্ন স্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণে রং শনাক্ত করার ক্ষমতা কিছুটা কমতে পারে।
চোখে আঘাত : চোখ বা দৃষ্টিসংশ্লিষ্ট স্নায়ুতে আঘাতের পর কখনো রং দেখার সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কিছু ওষুধের প্রভাব : নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় রং দেখার ক্ষমতায় পরিবর্তন হতে পারে। তাই নতুন কোনো ওষুধ ব্যবহারের পর এ ধরনের পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
রং-অন্ধত্বের প্রকারভেদ : লাল-সবুজ রঙের ঘাটতি— এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। লাল ও সবুজের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কিছু রঙের পার্থক্য করতেও সমস্যা হতে পারে।
নীল-হলুদ রঙের ঘাটতি : এটি তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। নীল, সবুজ, হলুদ বা সংশ্লিষ্ট রঙের কিছু শেড আলাদা করতে অসুবিধা হতে পারে।
সম্পূর্ণ রঙের ঘাটতি : এটি অত্যন্ত বিরল। আক্রান্ত ব্যক্তি খুব সীমিতভাবে রং শনাক্ত করতে পারেন এবং পৃথিবীকে অনেকটা ধূসর ধরনের মনে হতে পারে। এ অবস্থার সঙ্গে আলোতে অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা ও দৃষ্টির অন্যান্য সমস্যাও থাকতে পারে।
প্রধান লক্ষণ : রং-দৃষ্টির ঘাটতির লক্ষণ ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। যেমন—
লাল ও সবুজের কিছু শেড গুলিয়ে ফেলা। নির্দিষ্ট রঙের নাম বলতে ভুল করা।
রঙিন ছবি বা চিত্র বুঝতে সমস্যা হওয়া। রঙের ওপর নির্ভরশীল মানচিত্র বা লেখচিত্র বুঝতে অসুবিধা। কম আলোতে রঙের পার্থক্য বুঝতে বেশি সমস্যা হওয়া। পোশাকের রং নির্বাচন করতে ভুল হওয়া। ফল পাকল কি না রং দেখে বোঝার ক্ষেত্রে অসুবিধা। বিদ্যালয়ের রঙভিত্তিক কাজে বারবার ভুল করা।
শিশুদের ক্ষেত্রে বিশেষ লক্ষণ : শিশুরা বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন না থাকায় কিছু আচরণ খেয়াল করা যেতে পারে— রঙের নাম বারবার ভুল বলা। একই রঙের জায়গায় ভিন্ন রঙ ব্যবহার করা। রঙিন মানচিত্র বা চিত্র বুঝতে অসুবিধা। শিক্ষক রঙের মাধ্যমে নির্দেশনা দিলে তা অনুসরণে সমস্যা হওয়া। রঙ করার কাজে অন্যদের তুলনায় বেশি ভুল করা। রঙভিত্তিক শিক্ষামূলক কাজে অনীহা দেখানো। তবে এসব লক্ষণ থাকলেই শিশুটি রং-অন্ধ— এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। যথাযথ পরীক্ষা প্রয়োজন।
পড়াশোনায় প্রভাব : বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় অনেক বিষয়েই রঙ ব্যবহার করা হয়। বিজ্ঞানচিত্র, মানচিত্র, লেখচিত্র, রঙিন সংকেত এবং বিভিন্ন ব্যবহারিক কাজে রং গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক যদি শুধু রঙের মাধ্যমে নির্দেশনা দেন, তাহলে রং-দৃষ্টির ঘাটতিসম্পন্ন শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়তে পারে। তাই রঙের পাশাপাশি লেখা, সংখ্যা, প্রতীক, আকার ও অবস্থান ব্যবহার করা প্রয়োজন।
দৈনন্দিন জীবনে সমস্যা : রং-দৃষ্টির ঘাটতি সাধারণত গুরুতর শারীরিক অক্ষমতা তৈরি করে না। তবে দৈনন্দিন কিছু কাজে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন হতে পারে। যেমন— ট্রাফিক সংকেত শনাক্ত করা। বৈদ্যুতিক তার বা যন্ত্রের রঙভিত্তিক সংকেত বোঝা। রান্নার সময় খাবারের রং দেখে প্রস্তুত হয়েছে কি না বোঝা। পোশাকের রং নির্বাচন। রঙিন ওষুধের প্যাকেট বা অন্যান্য সামগ্রী আলাদা করা। এসব ক্ষেত্রে শুধু রঙের ওপর নির্ভর না করে লেখা বা প্রতীক ব্যবহার করা নিরাপদ।
জটিলতা : রং-অন্ধত্ব নিজে সাধারণত গুরুতর দৃষ্টিশক্তি হারানোর কারণ নয়। তবে সমস্যা শনাক্ত না হলে— শিক্ষাক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় অসুবিধা হতে পারে। শিশুর আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে। রঙভিত্তিক কাজে বারবার ভুল হতে পারে। কিছু নির্দিষ্ট পেশা নির্বাচনে সীমাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে। অর্জিত রং-দৃষ্টির ঘাটতির পেছনে থাকা চোখ বা স্নায়ুর রোগ শনাক্ত হতে দেরি হতে পারে।
পরীক্ষা করা : রং দেখার ক্ষমতা যাচাই করতে বিশেষ রং-পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে বিভিন্ন রঙের বিন্দু দিয়ে তৈরি নকশার মধ্যে সংখ্যা বা আকৃতি শনাক্ত করার পরীক্ষা বহুল ব্যবহৃত।
শিশুদের বিদ্যালয়ে এ ধরনের সমস্যা সন্দেহ হলে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে আগে স্বাভাবিকভাবে রং দেখলেও পরে হঠাৎ পরিবর্তন দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা : বংশগত রং-দৃষ্টির ঘাটতি সাধারণত পুরোপুরি দূর করার নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। তবে জীবনযাপন সহজ করার অনেক উপায় রয়েছে। রঙের পাশাপাশি লেখা ও প্রতীক ব্যবহার করা। পোশাকে রঙের নাম লিখে রাখা। প্রয়োজন হলে বিশেষ প্রযুক্তি বা রং শনাক্তকারী ব্যবহার করা। বিদ্যালয়ে শিশুর প্রয়োজন অনুযায়ী বিকল্প শিক্ষাপদ্ধতি ব্যবহার করা। পেশা নির্বাচনের আগে সংশ্লিষ্ট কাজে রং শনাক্ত করার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানা হঠাৎ রং দেখার ক্ষমতা পরিবর্তিত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।
পরিবারের ভূমিকা : রং-অন্ধত্ব নিয়ে শিশুকে বকা, উপহাস বা অন্য শিশুদের সামনে বিব্রত করা উচিত নয়। তাকে বোঝাতে হবে যে এটি একটি দৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য এবং তার মেধা বা যোগ্যতার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। অভিভাবক ও শিক্ষক শিশুর প্রয়োজন বুঝে বিকল্প সংকেত ব্যবহার করলে তার শেখার সুযোগ আরও সহজ হয়।
সচেতনতার প্রয়োজন : রং-দৃষ্টির ঘাটতি সম্পর্কে সামাজিক ভুল ধারণা দূর করা জরুরি। একজন ব্যক্তি রং ভিন্নভাবে দেখেন বলে তিনি কম মেধাবী বা কম সক্ষম— এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। সচেতনতার মাধ্যমে শিশুকে সময়মতো শনাক্ত করা, শিক্ষাক্ষেত্রে সহায়তা দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পেশাগত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করা সম্ভব।
পরিশেষে বলা যায়, রং-অন্ধত্ব মানুষের দৃষ্টিশক্তির একটি ভিন্নতা, অক্ষমতার পরিচয় নয়। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ এ বৈশিষ্ট্য নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। প্রয়োজন হলো সমস্যাটিকে বুঝে নেওয়া এবং পরিবেশকে আরও সহায়ক করে তোলা।আন্তর্জাতিক রং-অন্ধত্ব সচেতনতা দিবসের বার্তা হোক— রঙের পার্থক্য নয়, মানুষের সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিন। শিশুদের সময়মতো শনাক্তকরণ, শিক্ষায় সহায়ক ব্যবস্থা, পরিবারের ইতিবাচক ভূমিকা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরামর্শের মাধ্যমে রং-দৃষ্টির ঘাটতিসম্পন্ন মানুষ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শিক্ষা, কর্মজীবন ও সমাজে এগিয়ে যেতে পারেন।
লেখক : কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক