প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
প্রযুক্তির এ যুগে আমাদের মনে হতে পারে, দৈনন্দিন জীবনের অনেক কিছুই বুঝি আমরা নিজেদের স্বাধীন ইচ্ছায় করছি। কী খবর পড়ব, কোন ভিডিও দেখব বা কার সঙ্গে যোগাযোগ রাখব— সবকিছুই যেন আমাদের একান্ত ব্যক্তিগত পছন্দের ফল। কিন্তু গভীরভাবে তলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, আমাদের এসব পছন্দের পেছনে নীরবে কাজ করছে একটি অদৃশ্য ব্যবস্থা— অ্যালগরিদম। এটি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে ঠিকই; কিন্তু একই সঙ্গে তৈরি করেছে এক নতুন ধরনের ফাঁদ— 'অ্যালগরিদমের ফাঁদ'।
অ্যালগরিদম মূলত কিছু ধারাবাহিক গাণিতিক নিয়ম বা সংকেত, যার মাধ্যমে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের আচরণ বিশ্লেষণ করে। আমরা কী দেখছি, কতক্ষণ দেখছি, স্ক্রল করতে করতে কোথায় থামছি— এসব তথ্য বিশ্লেষণ করেই অ্যালগরিদম অনুমান করে নেয় আমাদের পরবর্তী পছন্দ। এরপর সেই অনুযায়ী আমাদের সামনে আরও কনটেন্ট বা আধেয় হাজির করে। এ প্রক্রিয়া নিছক কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানী নিক সিভারের এক গবেষণায় দেখা যায়, স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক বি জে ফগ ১৯৯৮ সালে 'ক্যাপটোলজি' নামে একটি গবেষণাক্ষেত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এর লক্ষ্য ছিল, কম্পিউটারভিত্তিক প্রযুক্তি কীভাবে মানুষের আচরণ পরিবর্তন করতে পারে, তা খতিয়ে দেখা। পরবর্তী সময়ে সিলিকন ভ্যালির বহু প্রতিষ্ঠান এই ধারণা থেকেই তাদের পণ্য ও সেবা তৈরি করেছে। অর্থাৎ, প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীকে আটকে রাখার এই কৌশল মূলত তাদের সুপরিকল্পিত ছকেরই ফসল।
শুরুতে বিষয়টি বেশ সুবিধাজনক মনে হতে পারে। আপনি গণিতের ভিডিও পছন্দ করলে প্ল্যাটফর্ম আপনাকে আরও গণিতের ভিডিও দেখাবে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন অ্যালগরিদম আমাদের পছন্দকে শুধু অনুসরণই করে না, বরং ধীরে ধীরে তা নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। কেউ যদি নিয়মিত নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক কনটেন্ট দেখেন, অ্যালগরিদম তাঁকে একই ধরনের কনটেন্ট বারবার দেখাতে থাকে। ফলে ব্যবহারকারীর সামনে থেকে ভিন্নমত ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায়; মানুষ আটকে পড়ে শুধু নিজের পছন্দের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া এক ক্ষুদ্র তথ্যজগতে।
সম্প্রতি দেশের ৩০ জন তরুণ-তরুণীর ওপর চালানো এক অনুসন্ধানে অধিকাংশই জানিয়েছেন তারা প্রতিদিন তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যয় করেন এবং সেখানে ভিন্নমতের কনটেন্ট তাদের সামনে খুব কমই আসে। এভাবেই তৈরি হয় 'ইকো চেম্বার' বা প্রতিধ্বনি বলয়, যেখানে মানুষ শুধু নিজের মতের প্রতিধ্বনিই শুনতে থাকে।
অ্যালগরিদমের আরেকটি বড় ফাঁদ হলো 'মনোযোগের বাণিজ্য'। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর মূল লক্ষ্য থাকে ব্যবহারকারীকে যতটা সম্ভব বেশি সময় ধরে রাখা। তাই যে কনটেন্ট আমাদের উত্তেজিত করে বা রাগিয়ে দেয়, সেটিই তাদের কাছে বেশি গুরুত্ব পায়। এ লক্ষ্য কতটা সুনির্দিষ্ট, তার প্রমাণ মেলে খোদ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরের স্বীকারোক্তিতেই। একটি জনপ্রিয় সংগীত স্ট্রিমিং প্রতিষ্ঠানের প্রধান বিজ্ঞানী একবার খোলাখুলিই বলেছিলেন, নতুন ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে তাদের প্রথম লক্ষ্যই থাকে তাদের 'আসক্ত' করে তোলা। এমনকি ২০০৯ সালে নেটফ্লিঙ্ সবচেয়ে নির্ভুল অ্যালগরিদম তৈরির জন্য ১০ লাখ ডলার পুরস্কার দিলেও শেষ পর্যন্ত সেটি আর ব্যবহার করেনি। কারণ, তত দিনে তাদের লক্ষ্য নির্ভুলতার মানদণ্ড থেকে সরে গিয়ে ব্যবহারকারীকে স্ক্রিনের সামনে আটকে রাখার দিকে মোড় নিয়েছিল।
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটেও এই প্রবণতা বেশ স্পষ্ট। জরিপে অংশ নেওয়া তরুণদের বড় অংশই জানিয়েছেন, উত্তেজক ও নেতিবাচক কনটেন্টই তাদের বেশি আকর্ষণ করে এবং অনলাইনের তর্ক-বিতর্কে তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি রাগান্বিত হন। আবেগের এই টানাপোড়েন একপর্যায়ে আমাদের বাস্তব সম্পর্কের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অনেকেই ভিন্নমতের মানুষকে ব্লক করেন, এমনকি পরিবারের সদস্যদেরও এড়িয়ে চলেন।
তরুণদের ওপর এর প্রভাব আরও ভয়াবহ। হয়তো পড়াশোনার জন্য কোনো শিক্ষার্থী মোবাইল হাতে নিলেন, কিন্তু নোটিফিকেশনের টানে একের পর এক ভিডিও দেখতে দেখতে তার পড়াশোনার মূল্যবান সময় হারিয়ে যায় বিনোদনের অতল গহ্বরে। মনোবিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াকে আচরণবাদী মনোবিজ্ঞানের সেই বিখ্যাত পরীক্ষার সঙ্গে তুলনা করেন, যেখানে 'অনিশ্চিত পুরস্কার' প্রাণীকে বারবার একই আচরণ করতে প্ররোচিত করে। মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও এর বিরূপ প্রভাব পড়ে। দীর্ঘদিন নেতিবাচক কনটেন্ট দেখতে থাকলে স্নায়ুতন্ত্র ক্লান্ত হয়ে পড়ে, বাড়ে একাকিত্ব ও বিষণ্ণতার ঝুঁকি।
আরও উদ্বেগজনক দিক হলো, অ্যালগরিদমের এই ফাঁদ সমাজে সহিংসতার বীজ বপন করছে। বারবার সহিংস কনটেন্ট দেখার ফলে মানুষের অনুভূতি ভোঁতা হয়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়; তখন সহিংসতাকে আর অস্বাভাবিক কিছু মনে হয় না। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে অন্তত ২৯৩ জন সংঘবদ্ধ সহিংসতায় (মব জাস্টিস) প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে অনেক ঘটনার সূত্রপাতই হয়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পোস্ট থেকে।
তাহলে কি অ্যালগরিদম পুরোটাই খারাপ? মোটেও নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, ব্যাংকিং খাত থেকে শুরু করে অসংখ্য ক্ষেত্রে অ্যালগরিদম মানুষের জীবনযাত্রাকে উন্নত ও সহজ করছে। সমস্যাটা শুরু হয় তখনই, যখন আমরা অ্যালগরিদম ব্যবহার করার বদলে অ্যালগরিদম নিজেই আমাদের ব্যবহার করতে শুরু করে। এ ক্ষেত্রে নৃবিজ্ঞানের একটি পুরোনো পর্যবেক্ষণ বেশ প্রাসঙ্গিক— একটি কার্যকর ফাঁদ তৈরি করতে হলে শিকারের স্বভাব ও দুর্বলতাকে গভীরভাবে বুঝতে হয়।
ফাঁদ কখনও জোর করে না, বরং শিকারকে এমনভাবে প্রলুব্ধ করে যে সে নিজের ইচ্ছাতেই ফাঁদের দিকে এগিয়ে যায়। অ্যালগরিদমও ঠিক একইভাবে আমাদের স্বভাব ও আবেগ বুঝে নিয়ে আমাদের পছন্দকে প্রভাবিত করে। একজন সমাজবিজ্ঞানীর ভাষায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম হলো এমন এক বন্ধুর মতো, যে খুব ভালো করেই জানে আপনি কী পছন্দ করেন, কিন্তু সে এটা বোঝে না যে আসলে কোনটা আপনার জন্য ভালো। অদৃশ্য এই ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসার প্রথম উপায় হলো সচেতনতা। স্ক্রিনে যা দেখছি, তার সবকিছুই স্বাভাবিকভাবে আমাদের সামনে আসছে না— এটুকু বুঝতে হবে। তথ্যের উৎস যাচাই করা, ভিন্নমতের লেখা পড়া এবং একাধিক উৎস থেকে তথ্য জেনে কোনো সিদ্ধান্তে আসা জরুরি। তবে শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতাই এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়; রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদেরও নাগরিকদের 'ডিজিটাল সাক্ষরতা' বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিজের মনোযোগের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনা। প্রযুক্তি আমাদের জন্য তৈরি হয়েছে, আমরা প্রযুক্তির জন্য নই। অ্যালগরিদমের এই যুগে প্রযুক্তি থেকে পিছিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ বা প্রয়োজন নেই; বরং প্রয়োজন একে গভীরভাবে বোঝা এবং সচেতনভাবে ব্যবহার করা। কারণ, ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা হয়তো শুধু মতপ্রকাশের স্বাধীনতাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং নিজের মনোযোগ ও সিদ্ধান্তের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার স্বাধীনতাও সমধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। অ্যালগরিদম আমাদের পথ দেখাতে পারে ঠিকই, কিন্তু কোন পথে হাঁটব— সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারটুকু যেন আমাদের নিজেদের হাতেই থাকে।
লেখক : শিক্ষার্থী, সরকারি শাহ্ সুলতান কলেজ