প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
প্রতি বছর ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়। ২০০৩ সাল থেকে আন্তর্জাতিক আত্মহত্যা প্রতিরোধ সংস্থা (IASP) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) যৌথ উদ্যোগে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এর মূল লক্ষ্য হলো আত্মহত্যা সম্পর্কে সমাজে সচেতনতা তৈরি, আত্মহত্যা প্রতিরোধের কার্যকর উপায় খুঁজে বের করা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা।
আত্মহত্যা বর্তমান বিশ্বের একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ৭ লাখের বেশি মানুষ আত্মহত্যার কারণে মারা যান। ১৫-২৯ বছর বয়সী তরুণদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ আত্মহত্যা। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেও আত্মহত্যা একটি উদ্বেগজনক সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য সমস্যা।
আত্মহত্যার কারণগুলো : আত্মহত্যার পেছনে সাধারণত একক কোনো কারণ কাজ করে না; বরং বিভিন্ন সামাজিক, মানসিক, পারিবারিক ও অর্থনৈতিক কারণ পরস্পরের সঙ্গে জড়িত থাকে। প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা : বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার ডিসঅর্ডারসহ বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
চাপ ও হতাশা : পরীক্ষায় ব্যর্থতা, বেকারত্ব, দারিদ্র্য, পেশাগত চাপ, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কিংবা জীবনের নানা প্রতিকূলতা মানুষকে তীব্র হতাশার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
পারিবারিককলহ ও সম্পর্কের ভাঙন : দাম্পত্য কলহ, পারিবারিক অশান্তি, সম্পর্কের অবনতি বা বিচ্ছেদ এবং প্রেমের সম্পর্কের সংকট আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সামাজিক অবহেলা ও একাকিত : সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, অবহেলা, বন্ধুহীনতা এবং দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্ব মানুষের মানসিক সুস্থতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
মাদকাসক্তি : মাদক গ্রহণ বিচার-বিবেচনা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ব্যাহত করতে পারে এবং আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
শারীরিক অসুস্থতা : দীর্ঘস্থায়ী বা গুরুতর শারীরিক অসুস্থতা, যেমন ক্যান্সার, কিডনি রোগ বা পক্ষাঘাত, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে এবং আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সামাজিক কলঙ্ক : ব্যর্থতা, যৌন হয়রানি, নির্যাতনের শিকার হওয়া, যৌন অভিমুখ বা পরিচয় নিয়ে উপহাস কিংবা সামাজিকভাবে অপমানিত হওয়ার অভিজ্ঞতা অনেকের মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থনৈতিক সমস্যা : দারিদ্র্য, ঋণের বোঝা, বেকারত্ব বা তীব্র আর্থিক সংকট থেকে তৈরি হতাশা আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সাইবার বুলিং ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপ : ডিজিটাল যুগে অনলাইন হয়রানি, ট্রল, হুমকি, অপমান এবং সাইবার বুলিং বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
তাৎক্ষণিক আবেগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা : তীব্র রাগ, অপমান, দুঃখ বা হতাশার মুহূর্তে আবেগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা আত্মঘাতী আচরণের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আত্মহত্যার প্রকারভেদ :
আত্মহত্যাকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে শ্রেণিবদ্ধ করা যায়। তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্য গবেষণায় আত্মহত্যাকে এভাবে নির্দিষ্ট কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করার চেয়ে আত্মহত্যার ঝুঁকি, উদ্দেশ্য, মানসিক অবস্থা ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
উদ্দেশ্য ও সামাজিক প্রেক্ষাপটভিত্তিক আত্মহত্যা : সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খেইম আত্মহত্যাকে সামাজিক সংহতি ও নিয়ন্ত্রণের মাত্রার ভিত্তিতে কয়েকটি শ্রেণিতে ব্যাখ্যা করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে আত্মকেন্দ্রিক বা ইগোয়িস্টিক আত্মহত্যা, পরার্থবাদী বা অ্যালট্রুইস্টিক আত্মহত্যা, নিয়ন্ত্রণহীনতা বা অ্যানমিক পরিস্থিতিজনিত আত্মহত্যা এবং অতিরিক্ত সামাজিক নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত ফ্যাটালিস্টিক আত্মহত্যা। তবে এসব ধারণা ঐতিহাসিক সমাজবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা; এগুলোকে ব্যক্তির আত্মহত্যার সরাসরি কারণ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
মানসিক অবস্থাভিত্তিক আত্মঘাতী আচরণ : আত্মঘাতী আচরণ হঠাৎ আবেগপ্রসূত হতে পারে, আবার দীর্ঘদিনের মানসিক সংকট ও পরিকল্পনার সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে। আত্মহত্যার চেষ্টা এবং আত্মহত্যাজনিত মৃত্যু একই বিষয় নয়; আত্মহত্যার চেষ্টা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরও পরবর্তী সময়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও সহায়তা প্রয়োজন।
বয়সভিত্তিক আত্মহত্যা : শিশু ও কিশোর, তরুণ, প্রাপ্তবয়স্ক এবং বয়স্কদের মধ্যে আত্মহত্যার ঝুঁকি ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারণ ভিন্ন হতে পারে। তাই বয়সভেদে প্রতিরোধমূলক কৌশলও আলাদা হওয়া প্রয়োজন।
সামাজিক পরিস্থিতিভিত্তিক আত্মহত্যা : দাম্পত্যকলহ, অর্থনৈতিক সংকট, সম্পর্কের ভাঙন, শিক্ষাজনিত চাপ, পরীক্ষার ফলাফল, পেশাগত চাপ, চাকরি হারানো কিংবা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মতো বিভিন্ন পরিস্থিতি আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
পদ্ধতিভিত্তিক আত্মহত্যার শ্রেণিবিন্যাস প্রচারের ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি। আত্মহত্যার পদ্ধতির বিস্তারিত বিবরণ জনসচেতনতা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় নয় এবং এ ধরনের তথ্য প্রকাশ অনিচ্ছাকৃতভাবে ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই আত্মহত্যা প্রতিরোধবিষয়ক লেখায় পদ্ধতির পরিবর্তে ঝুঁকির কারণ, সতর্কসংকেত ও প্রতিরোধের উপায়কে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
আত্মহত্যা প্রতিরোধে করণীয়—
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা : বিষণ্ণতা, উদ্বেগ বা অন্যান্য মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য সহজলভ্য ও মানসম্মত কাউন্সেলিং, মনোরোগ চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
সচেতনতা বৃদ্ধি : স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আত্মহত্যা প্রতিরোধ এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে দায়িত্বশীল ও তথ্যভিত্তিক প্রচারণা চালানো প্রয়োজন।
পারিবারিক সহযোগিতা : পরিবারকে হতে হবে সহানুভূতিশীল ও সহায়ক। মানসিক সংকটে থাকা ব্যক্তির কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তাকে বিচার না করা এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা আত্মহত্যার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
আবেগ নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা তৈরি : রাগ, হতাশা, দুঃখ ও মানসিক চাপ মোকাবিলার স্বাস্থ্যকর কৌশল শেখানো প্রয়োজন। শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্কদেরও মানসিক স্থিতিস্থাপকতা ও সমস্যা মোকাবিলার দক্ষতা বাড়াতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধি : পরিবার, বন্ধু, আত্মীয়স্বজন ও সহকর্মীদের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রাখা একাকিত্ব কমাতে এবং মানসিক সমর্থন বাড়াতে সহায়তা করে।
মাদক থেকে দূরে থাকা : মাদকাসক্তি মানসিক স্বাস্থ্য ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই মাদক প্রতিরোধ ও চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো জরুরি।
ঝুঁকিপূর্ণ উপকরণ ও পরিস্থিতিতে প্রবেশাধিকার কমানো : আত্মহত্যায় ব্যবহৃত হতে পারে এমন বিপজ্জনক উপকরণের সহজলভ্যতা নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা আত্মহত্যা প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল।
যুবসমাজকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া : ক্যারিয়ার গাইডেন্স, শিক্ষার্থীদের মানসিক সহায়তা, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় সহায়তা তরুণদের মানসিক চাপ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন : আত্মহত্যা প্রতিরোধে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত নীতি, সহজলভ্য হেল্পলাইন, জরুরি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং মনোসামাজিক সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ : ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে জীবনের মূল্য, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ ও সংকট মোকাবিলার ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা যেতে পারে। তবে মানসিক সংকটে থাকা ব্যক্তিকে দোষারোপ বা অপরাধবোধে না ফেলে সহানুভূতি ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি।
আত্মহত্যা প্রতিরোধে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক চিত্র—
বাংলাদেশে আত্মহত্যা একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সমস্যা। সরকারি এসডিজি ট্র্যাকার-এর ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুহার প্রতি লাখে ৮.৭৭। পুরুষের ক্ষেত্রে এ হার ৯.৩৯ এবং নারীর ক্ষেত্রে ৮.১৮। বয়সভিত্তিক হিসাবে ১৫-২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে মৃত্যুহার প্রতি লাখে ১৮.৮৮, যা অন্যান্য বয়সের তুলনায় উদ্বেগজনকভাবে বেশি। ০-১৪ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে এ হার ৩.০৫।
শিক্ষার্থীদের মধ্যেও পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। আঁচল ফাউন্ডেশনের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৪০৩টি আত্মহত্যার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২৪৯ জন নারী ও ১৫৪ জন পুরুষ। বয়সভিত্তিক হিসাবে ১-১২ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ৪৪ জন, ১৩-১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ২৬৮ জন এবং ২০-২৫ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ৯১ জন ছিল। ১৩-১৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ১৯০ জন নারী ও ৭৮ জন পুরুষ এবং ২০-২৫ বছর বয়সীদের মধ্যে ৫১ জন পুরুষ ও ৪০ জন নারী ছিল।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্তর বিবেচনায়, ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে স্কুলপর্যায়ে। এ পর্যায়ে ১৯০ জন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৩৯ জন মেয়ে ও ৫১ জন ছেলে। অন্যদিকে, ২০২৬ সালে এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশের পর আগস্ট মাসে শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর কয়েকটি ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে অন্তত ১০ জন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর তথ্য উঠে এসেছে, যাদের মধ্যে ৭ জন মেয়ে ও ৩ জন ছেলে।
পরিশেষে বলতে চাই, আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব, যদি আমরা সবাই সচেতন হই, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করি এবং সংকটে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়াই। প্রতিটি জীবনই অমূল্য। বর্তমান সমাজে মানসিক চাপ, পারিবারিক সমস্যা, একাকিত্ব, অর্থনৈতিক সংকট ও হতাশা অনেকের জীবনকে বিপর্যস্ত করতে পারে। তবে সচেতনতা, সহমর্মিতা, সামাজিক সমর্থন এবং যথাযথ মানসিক স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে এসব প্রতিকূলতা মোকাবিলা করা সম্ভব।
লেখক : কলাম লেখক ও গবেষক