ঢাকা বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

সবুজ অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ

নুসরাত সুলতানা
সবুজ অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ

পরিবেশের ক্ষতি না করে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানুষের জীবনমান বৃদ্ধি করার ব্যবস্থাই হলো সবুজ অর্থনীতি। কার্বন নিঃসরণ ও অন্যান্য দূষণ কমিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি হ্রাস করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন ও ন্যায্যতা তৈরির মত বিষয়গুলো অর্জন করার লক্ষ্যে সবুজ অর্থনীতির সূচনা। শিল্পায়ন পরবর্তী সময়ে কৃষিকাজ থেকে ক্রমান্বয়ে শিল্প আর সেবাখাত নির্ভর অর্থনীতি গড়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের জিডিপিতে সেবা খাতের অবদান সবচেয়ে বেশি, যা প্রায় ৫১.৪৪ শতাংশ, শিল্প খাতের অবদান প্রায় ৩৭.৩৭ শতাংশ, কৃষি খাতের অবদান প্রায় ১১.১৯ শতাংশ। ১৯৯৫ সালে কৃষিখাতে এ হার ছিল প্রায় ২৫ শতাংশ এবল শিল্প খাতে এ পরিমাণ ছিল মাত্র ২৩.৩ শতাংশ। শিল্প আর সেবাখাতে অবদান বৃদ্ধি প্রশংসনীয় হলেও অপরিকল্পিত শিল্পায়ন আমাদের জীবন ও অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেলছে। পরিবেশ সংরক্ষণের তোয়াক্কা না করে শিল্প আর নগর গঠনে মনোযোগী আর অধিক মুনাফা অর্জনের লক্ষ্য আমাদের দীর্ঘমেয়াদি যে ক্ষতি করছে তা হয়তো অনেকের অজানা। সাম্প্রতিক সময়ে তাই দেখা যাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ বিপর্যয়, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উৎপাদন কমে যাওয়া, কর্মসংস্থান হ্রাসসহ নানামুখী সমস্যা।

২০২২ সালের জুনে প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বাংলাদেশের উন্নয়ন বিষয়ে 'ক্রিয়েটিং আ গ্রিন অ্যান্ড সাসটেইনেবল গ্রোথ পাথ ফর বাংলাদেশ' শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এ প্রতিবেদন অনুসারে, পরিবেশের অবনমনের কারণে প্রতি বছর বাংলাদেশ ৬৫০ কোটি ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এ পরিমাণ বাংলাদেশের বার্ষিক জিডিপির ৩.৪ শতাংশ। প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ আছে, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ২৮ শতাংশ সংঘটিত হয় পানি এবং বায়ুদূষণের কারণে। এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেক্সের (ইপিআই) বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, সর্বাধিক দূষিত ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬২তম। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিস (আইএফআরসি) প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ডিজেস্টারস রিপোর্ট-২০১৮ অনুসারে, প্রাকৃতিক বিপর্যয় দিয়ে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম। ১৯৮০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বাংলাদেশ প্রায় ৪২৯টি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে আছে ভূমিকম্প, বন্যা, ভূমিধস, টর্নেডো, ট্রপিক্যাল সাইক্লোন, জলবায়ু পরিবর্তন, ভূমিক্ষয় ইত্যাদি। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

সবুজ অর্থনীতির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১১ সালে গ্রিন ব্যাংকিং পলিসি গাইডলাইন প্রবর্তন করে যার মাধ্যমে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে ঋণ প্রদান ও বিনিয়োগ করার প্রতি নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং এটি আমাদের আর্থিক খাতে টেকসই অর্থায়নের ক্ষেত্রে মাইলফলক হিসেবে কাজ করে। এই গাইডলাইনের মাধ্যমে প্রত্যেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে গ্রিন ব্যাংকিং ইউনিট গঠন ও পরিবেশগত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বাধ্যতামূলক করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে ২০১৭ সালে সামাজিক বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড সোশ্যাল রিস্ক ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইনস জারি করা হয়।

২০১৮ সালে সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স পলিসি প্রবর্তন করা হয়, যেখানে পরিবেশের পাশাপাশি সামাজিক ও সুশাসন বিষয়গুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এটি গ্রিন ব্যাংকিংয়ের ধারণাকে আরও বিস্তৃত করে। ২০২০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স ট্যাক্সোনোমি প্রকাশ করে যেখানে টেকসই অর্থায়ন ও সবুজ অর্থায়নের দুটি আলাদা ক্যাটাগরি নির্ধারণ করা হয় এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বিনিয়োগ করতে বলা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক সবুজ অর্থায়নের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ ও টেকসই অর্থায়নের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছে।

সবুজ অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অনেক সিদ্ধান্ত গৃহীত হলেও উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে প্রতিনিয়ত নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এর প্রধান সমস্যাগুলো-প্রযুক্তির ঘাটতি ও দক্ষতা কম, উন্নত দেশগুলোর মতো আপগ্রেডেড পরিবেশ প্রযুক্তি কম, পরিবেশ আইন কঠোরতা কম, অনেক সময় পরিবেশ আইন সঠিকভাবে প্রয়োগ হয় না, জনসচেতনতা কম। বিশেষ করে গ্রামের মানুষ এখনও অধিকাংশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিউশন সম্পর্কে জানতে কম আগ্রহী। এছাড়াও আর্থিক সীমাবদ্ধতা, নবায়নযোগ্য শক্তি ও নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগে খরচ বেশি তো আছেই।

এসব সীমাবদ্ধতার মাঝেও কিছু সম্ভাবনা দেখা যায়। গত বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ব্যাংকগুলোর মোট সবুজ অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা। এর আগের বছরের একই সময় যার পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে অর্থায়ন ১ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা বা ৭৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেড়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের 'সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স' বিভাগের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

বাংলাদেশে সৌরশক্তি ও বায়ু শক্তির সম্ভাবনা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেমন— ২০২৪ সালের শেষ পর্যন্ত সৌর প্রকল্পের সক্ষমতা প্রায় ১.৫ এড ছুঁই ছুঁই করছে। সরকারি তথ্য মতে, গ্রামীণ সৌর হোম সিস্টেমে ৪০ লাখ এর বেশি পরিবার সম্পৃক্ত। কৃষিতে বাংলাদেশে জৈব সার, ড্রিপ সেচ ও টেকসই চাষাবাদ পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করছে। যেমন— ২০২৪ সালে প্রায় ১.৭ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে জৈব চাষাবাদ হচ্ছে— ২০১২ সালের তুলনায় প্রায় ২.৫ গুণ বৃদ্ধি। বাংলাদেশি পোশাক খাত দ্রুতই পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির দিকে যাচ্ছে।

সবুজ অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অব্যহত রাখার জন্য আরও যেসব পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে— ট্যাক্স প্রণোদনা সবুজ উদ্যোগ নেওয়া, শিল্প ও ব্যবসায় কর ছাড় দিয়ে উৎসাহিত করা। অফিস শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎতের ব্যবহার কমাতে প্রাকৃতিক আলোর ব্যবহার বাড়ানো, টেকসই নগর পরিকল্পনা রাস্তা, পানি, গ্যাস— এসব স্থাপনায় সবুজ প্রযুক্তির একীভূত ব্যবহার। গবেষণা ও উন্নয়ন দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে পরিবেশবান্ধব গবেষণায় তহবিল বৃদ্ধি। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা-জলবায়ু তহবিল ও প্রযুক্তি বিনিময়ের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী সহায়তা গ্রহণ।

প্রকৃতপক্ষে, পরিবেশকে বাদ দিয়ে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য সুন্দর পৃথিবী আর সমৃদ্ধ অর্থনীতি নিশ্চিত করতে হলে এখনই সময় সবুজ অর্থনীতি বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে সম্ভাবনার দার উন্মুক্ত করা।

লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত